বৃষ্টিস্নাত দিন, রিক্সার জন্য ভার্সিটির ক্লাস শেষে পোর্চের নিচে দাঁড়িয়ে আছে জয়ন্ত। চারপাশে ভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের ভীড়। হঠাৎ করে বৃষ্টি আসায় বেরোতে পারছে না কেউ। নিচের তলায় লবি থেকে পোর্চ পর্যন্ত দুতিনজনের ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গল্প, আলাপ-আলোচনা করছে ছেলেমেয়েরা। জয়ন্তের কদিন ধরেই মনটা ভাল নেই নাহলে আড্ডা তারও পছন্দের। শীত শেষে গরম পড়তে শুরু করেছে। রাতে হোষ্টেল রুমে ভ্যাপসা গরম অনুভূত হয়। ক’দিন ধরে তাই ঘুমটা ভাল হচ্ছেনা। ভাবছিল একটা টেবিল ফ্যান কিনে নিবে আজকেই। কিন্তু বৃষ্টিটা এসে পরিকল্পনাটা নষ্ট করে দিল। পকেটে হাত দিয়ে মনে পড়ল সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছে, হাতটা সরিয়ে নিল পকেট থেকে। হঠাৎ করে পাশে এসে দাঁড়াল এক ব্যাচ সিনিয়র তানিশা আপু। বলে উঠলেন, “আমার সাথে গাড়িতে আয়, তোকে হলে নামিয়ে দেব”।

আপুকে সবাই একটু এড়িয়ে চলে তার অদ্ভুত পোশাকপরিচ্ছদ আর আচার-আচরণের জন্য। তিনি সবসময় কালো রঙের লিপস্টিক, কালো রঙের আইশ্যাডো আর কালো রঙের জামা ব্যবহার করেন। আপু দেখতে অনেক সুন্দর হলেও একটা রুক্ষতার চাদর যেন সবসময় আপুকে ঘিরে থাকে। এছাড়া তিনি খুব একা থাকতে পছন্দ করেন, প্রয়োজন ছাড়া ক্লাসে কারও সাথে কথা বলেন না। আপুর সাথে জয়ন্তর পরিচয়টা সে হিসেবে একটু অদ্ভুতই বলা যায়। আপু নিজে থেকেই লাইব্রেরিতে তার সাথে পরিচিত হয়েছিল। এরপর দেখা হলেই কুশলাদি জিজ্ঞাসা করে, কেন কে জানে? আপু আবার তাড়া লাগায়, কী কোথায় হারিয়ে গেলি? উঠে আয় গাড়িতে। জয়ন্ত আর কিছু না বলে চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসে।  কিন্তু গাড়িটা হলের দিকে না যেয়ে শাহবাগের দিকে এগোতে থাকে। আপুর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে জয়ন্ত। বলে, “আপু হল তো উল্টো দিকে”। আপু বলে উঠেন, “ওহ্ ড্রাইভার চাচাকে তো বলা হয়নি তোকে হলে নামিয়ে দিতে। আচ্ছা এসেই যখন পড়েছি এখন বাসায় চল্, আমার সাথে দুপুরের খাবারটা খেয়ে যা”। মুখে না না করেও এ প্রস্তাব এড়াতে পারল না জয়ন্ত। আপুর সাথে ঢুকে পড়তে বাধ্য হল হাতিরপুলের মোড়ের কাছে এক প্রসাদোপম এপার্টমেন্টের তৃতীয় তলায় লিফট দিয়ে উঠতে।

দরজার সামনে এসে কলিংবেল চেপে ধরল তানিশা। একজন বয়স্ক মহিলা দরজা খুললেন, বাড়ির গৃহকর্মী হয়ে থাকবেন বলে মনে হল জয়ন্তর কাছে। তানিশার পেছনে পেছনে ঘরে ঢুকে পড়ল জয়ন্ত। ঢুকেই কেন জানি অস্বস্তি লাগতে শুরু করল ওর। ড্রইংরুমে তানিশা ওকে বসতে বলে ভেতরের কোন একটা রুমে ঢুকে পড়ল। সোফায় বসে চারপাশে তাকিয়ে আরেকটু অবাক হয় জয়ন্ত। সবখানেই কালো রঙের আধিক্য। সোফাসেট থেকে শুরু করে আসবাবপত্র, পর্দার রঙ সবই কালো। একটুপর রুমে ফিরে এলেন তানিশা আপু। দরজা থেকেই তাকে নিয়ে খাবারের জন্য ডাইনিং রুমে ঢুকে গেলেন। চুপচাপ টেবিলের পাশে এসে দাঁড়িয়ে রইল জয়ন্ত। টেবিলে প্রচুর খাবারের সমাহার। আপু তাড়া লাগালেন, “কীরে দাঁড়িয়ে রইলি কেন- যা ঐতো বেসিন, হাত ধুয়ে আয়”। হাত ধুয়ে চুপচাপ খেতে বসল জয়ন্ত। পোলাওয়ের সাথে অনেকগুলো রান্না, সবগুলোতেই মাংস আছে। এই ব্যাপারটা জয়ন্তকে অবাক করল । খেতে খেতে আপুর সাথে টুকটাক আলোচনা হল-আপু জানতে চাইলেন তার বাসায় কে কে আছেন? বাবা-মা কী করেন? জয়ন্ত জানাল সে একমাত্র সন্তান।  বাবা মাধ্যমিকের শিক্ষক, মা গৃহিনী। আপুর কাছে পালটা জানতে চাইল ও তার বাসার সবাই কোথায়? আপু বললেন বাবা-মা, বড় ভাই বিদেশ থাকেন। এখানে সে দূরসম্পর্কের খালার সাথে থাকেন। ছোটবেলায় বাবা-মা আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন, নানীর কাছেই মানুষ সে ও তার ভাই। নানী মারা যাবার পর ভাইয়া একটু চুপচাপ হয়ে যান। আর মূলত বাবা-মার সাথে না থাকায় হীনমন্যতায় ভোগার কারণে ছোটবেলা থেকেই দুই ভাইবোনের প্রকৃতি একাকী থাকা, বন্ধুবান্ধব নেই বেশি এ স্বভাববশত। শুনে একটু দুঃখ হল জয়ন্তর। খাওয়ার পর আপুর সাথে ফের ড্রইংরুমে বসে অনেকক্ষণ আড্ডা দিল জয়ন্ত। আপু অমিশুক হলেও দুজনের পছন্দ বেশ মিলে যায়। দুজনেরই প্রিয় মাঠের খেলা ফুটবল, ঘরে দাবা, অবসরে গান শুনতে, বই পড়তে পছন্দ করে দুজনেই। দুজনেরই প্রিয় খেলোয়ার মেসি, প্রিয় গায়ক অরিজিত সিং, দেশে মিনার, প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ। সব মিলিয়ে আড্ডাটা খুবই উপভোগ করল জয়ন্ত। এদিনের পর থেকেই আপুর সাথে সখ্যতা বেশ গড়ে উঠল জয়ন্তর। মনের মাঝে এটাকে মাঝে মধ্যে প্রেম বলে ভ্রম তৈরি হলেও আদতে আপুর কাছে তা ছিল বিদেশে চলে যাওয়া ভাইয়ের বিকল্প সঙ্গ খোঁজা। আপুর বড় ভাইয়ের শূন্যস্থান পূরণ করছে যেন সে।  ইতোমধ্যে ভার্সিটিতে তাদের ঘিরে বেশ কিছু গুজব রটেছে। আপু বা জয়ন্ত কেউই গুজবে কোনরূপ গুরুত্বদানে নারাজ। তবে মধ্যে ছাত্রনেতা নামধারী কিছু বড় ভাই ধর্ম ও বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ রক্ষার্থে এক সিনিয়র মুসলিম মেয়ের সাথে জুনিয়র হিন্দু ছেলের প্রেমে বাঁধা দান করতে চাইতেন। ধর্ম, শিক্ষা ও জাতি রক্ষায় সদা নিয়োজিত ভাইগুলোকে তানিশা পাত্তা না দিলেও জয়ন্তকে হলে থাকার জন্য এদের সামনা-সামনি সম্মান করতে হয়। আপুর বিদেশে থাকা বড় ভাইয়ের কথা বলে এবং নিঃসঙ্গতার কথা তুলে ধরে জয়ন্ত বরাবরই এ বিধঘুটে ভাইয়েদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছে।

 

এভাবেই চলছিল জয়ন্ত-তানিশার অসম বন্ধুত্ব। কিন্তু হঠাৎ করেই জীবন যেন এক নতুন দিকে মোড় নিল দুজনের। হঠাৎ করেই বিদেশ থেকে তানিশার ভাই ও মামা ফিরে এলেন দেশে। এই মামাই নানীর অবর্তমানে তাদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা আসার পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করল তানিশা। প্রথমদিকে জয়ন্তর সাথে আলাপচারিতা চালিয়ে গেলেও, ধীরে ধীরে তা হ্রাস পেতে শুরু করল। কথা বললেও জয়ন্তর মনে হত তানিশা যেন নিজের মাঝে নেই, ওকে এড়াতে চাচ্ছে, একটু যেন আতঙ্কিতও। চুপচাপ থাকা সে পুরনো মেয়েটি যেন ফিরে আসছে আবার। হঠাৎ করেই পরিচিত এক বড় ভাই, শাহান ভাই, যিনি তানিশার প্রতি বরাবরই দুর্বল, সে জয়ন্তকে জিজ্ঞাস করে বসল তানিশা অসুস্থ কীনা? এক সপ্তাহ ধরে সে ক্লাসে আসছে না। অমিশুক হলেও পড়াশোনায় তানিশা খুব সচেতন, ক্লাসে কখনও এতদিন একটানা অনুপস্থিত থাকেনি সে এর পূর্বে। পরিচিত অপরিচিত কেউই তানিশার কোন খবর বা ফোন নম্বর না বাড়ির ঠিকানা কিছুই দিতে পারেনি। সবভেবে ক্লাসের পরপরই তানিশাকে ফোন দিল জয়ন্ত। কিন্তু মোবাইল বন্ধ থাকায় সংযোগ প্রদান সম্ভব নয় বলে যান্ত্রিক নারীকন্ঠ ভেসে এল। দুইতিনবার চেষ্টা করার পরও একই ফলাফল পেয়ে  জয়ন্ত বিকেলের দিকে তানিশার বাসায় গিয়ে উপস্থিত হয়। দরজা খুলে দিলেন সেই দুরসম্পর্কের খালা। আজ সে খুব ভীতসন্ত্রস্ত। জয়ন্তর সন্দেহ হচ্ছে এ বাসায় কিছু একটা অস্বাভাবিকতা বিরাজ করছে। তার মনের মধ্যে কে জানি বলে উঠছে-ফিরে যা, এখানে বিপদ। মন শক্ত করে জয়ন্ত, তানিশা আপু তার বড় বোনের মত। তার বিপদে কিভাবে পিছিয়ে আসে সে, এরকম কাপুরুষের কাজ সে করতে পারবে না। বিপদ আসলে তাকে মোকাবেলা করাই তার ব্রত হবে। বদখত চেহারার কালো আলখাল্লা পরা এক বিশালদেহী লোক হটাৎ ভিতর থেকে উদয় হলেন। খালা কিছু বলার আগেই তিনি জয়ন্তর আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে দেখে নিয়ে বললেন, কী চাই? তার তাকানোতে গা শিরশির করে উঠল জয়ন্তর। সালাম দিয়ে নিজেকে তানিশা আপুর ভার্সিটির বন্ধু পরিচয় দিয়ে জানাল তানিশা আপুর ভার্সিটিতে গত এক সপ্তাহ অনুপস্থিত থাকার ব্যাপারে খোঁজ নিতে এসেছিল সে। লোকটা বিরক্তমুখে বলল তানিশা অসুস্থ, সুস্থ হলেই আবার ভার্সিটিতে যাওয়া শুরু করবে। আপুর অসুখের কথা শুনে তার সাথে একবার দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে ফেলল জয়ন্ত। লোকটি আরো একটু বিরক্তভাবে ভেতরে আসার জন্য জয়ন্তকে ইশারা করল। জয়ন্ত লোকটার পিছুপিছু তানিশার রুমে ঢুকেই একটা ধাক্কা খেল জয়ন্ত। পুরো ঘরে বোটকা গন্ধ। সদা পরিপাটি বেশে থাকা তানিশা খুব এলোমেলো পোশাকে এক বিষন্ন উদাসীন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে দেয়ালের দিকে। জয়ন্তকে ঘরে ঢুকতে দেখেও তানিশা আপুর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই, জয়ন্তর মনে হল আপু তার চারপাশের কোন কিছুই দেখছে না। জয়ন্ত জোরে বলে উঠল, আপু তুমি কেমন আছে, ডাক্তারের কাছে গেছিলে? আপু তার দিক এক ভাবলেশহীন মুখ নিয়ে তাকিয়ে রইল, চোখের দৃষ্টি আগের মতই উদভ্রান্ত, অজান্তেই শিউরে উঠল যেন একটু। আপুর মুখ দেখে মনে হল চিনতে পারছে না। এ সময় সাথে আসা ভদ্রলোক গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন- তানিশা, কথা বল। একথা শুনেই তানিশা উদভ্রান্ত অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসল। জয়ন্তর সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা শুরু করল। অবাক লাগল জয়ন্তর, এতদিন ভার্সিটিতে না যাওয়ার ব্যপারে বা অসুখের ব্যাপারে জানতে চাইলেও দায়সারা উত্তর দিতে থাকল তানিশা। এছাড়াও জয়ন্তর কাছে তানিশার কথাগুলো কেমন জানি খাপছাড়া লাগতে থাকে, বেশ সামঞ্জস্যহীন। যাই হোক আরো কিছুক্ষণ কথা বলে জয়ন্ত বেড়িয়ে আসে তানিশাদের বাসা থেকে। বেরিয়ে আসার সময় হটাৎ কোথা থেকে খালা এসে জয়ন্তর হাতে একটা ডায়েরি গুজে দেয়। দরজা বন্ধ করতে করতে বলে তানিশার খুব বিপদ, তুমি যেভাবেই হোক ওকে সাহায্য কর। এই ডায়েরি পড়লে ওর বিপদ সম্পর্কে জানতে পারবে।

আমি তানিশা, ভার্সিটিতে পড়া এক মেয়ে। ছোটবেলাতেই বাবা মা থেকেও অনাথ অবস্থায় বড় হয়েছি নানীর কাছে। সুখেই ছিলাম যতদিন না বিদেশ থেকে দূরসম্পর্কের বাবলু মামা এসে হাজির হলেন। প্রথম থেকেই তাকে পছন্দ হত না আমার। খুব মিষ্টি ভাষায় কথা বললেও তার মধ্যে অশুভ কোন কিছুর আভাস পেতাম যেন। আসার কিছুদিন পরই নানীকে কীভাবে জানি বশ করে ফেললেন তিনি। তার পরামর্শে বদলে যেতে লাগল বাড়ির পরিবেশ। তার পরামর্শে সবকিছু কালো রঙে পরিবর্তন করতে শুরু করলেন নানী। বাবলু মামার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হল ভাইয়ার। বাপমা ছাড়া বোনকে ব্যতীত যে ভাই কিছু বুঝত না সে হটাৎ আমায় অগ্রাহ্য করা শুরু করল। প্রতিদিন বিকালে মামার সাথে নিজের ঘর বন্ধ করে কীসব দীক্ষাগ্রহণ শুরু করল যার কিছুই আমার জ্ঞাত হল না। ভাইয়া যেন সম্পূর্ণ বাবলু মামার ভাবশিষ্যে পরিণত হল। নানীকেও তো নিজের করায়ত্ত করে ফেলেছিলেনই তিনি। এরপর এল সেই কালোরাত, আমার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন। নানীর কাছে আমাদের দুই ভাইবোনের অভিভাবকত্ব চেয়ে বসলেন মামা, সাথে ভাইয়াকে আমেরিকায় তার কাছে নিয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু নানী কিছুতেই এই প্রস্তাবে রাজি হলেন না। আমরা দু ভাইবোন তার চোখের মনি। সারাদিনই এই নিয়ে নানী আর মামার চাপা তর্ক চলল। সেদিন রাতের বেলা আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল, ঘুম আসছিল না। হটাৎ পাশে নানীর রুমে হুটোপুটির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম মনে হচ্ছিল। সাহস করে বিছানা ছেড়ে নানীর রুমে চলে গেলাম, ভেজানো দরজা আলতো করে ঠেলতেই খুলে গেল। দেখলাম এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ালাম। নানীর সামনে বসে আছেন মামা। হাতে একটা কঙ্কালের খুলি, আরেক হাত দিয়ে সামনে রাখা এক ট্রফির মত পাত্রের জ্বলন্ত আগুনে মশলার মত কী যেন ছুড়ে মারছেন তিনি। নানী সামনে মোমের মূর্তির মত একটা চেয়ারে বসা, দুইজনের মাঝে একটি টেবিল। এ ভয়াবহ দৃশ্য দেখে কোন মতে পাশের দেয়াল ধরে মেঝেতে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া থেকে নিজেকে সামলালাম। নানী যেন কোন এক অজানা দৈব শক্তির বশে সামনের টেবিলে রাখা একগাদা কাগজে একের পর এক স্বাক্ষর করে চলেছেন। মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করলেও গলা থেকে বেরিয়ে আসা চিৎকারটাকে আটাকাতে পারলাম না। নানী যেন এক ঘোর ভেঙ্গে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন আমার চিৎকার শুনে। তিনি মামার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। এর মধ্যে বাবলু মামা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন আমাকে । মামাকে দেখে ভয়ে শিউরে উঠলাম আমি। তার চোখ দুটো আগুনের মত জ্বলছে, মুখটা মনে হচ্ছে মিশরের মমিদের মত ফ্যাকাশে রক্তশুন্য। হটাৎ তার কন্ঠ শুনতে পেলাম- আমার সাধনার পরিপূর্ণতার জন্য তোমরা দুই ভাইবোন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তোমাদের একসাথে থাকা চলবে ন। আমার উপাস্য ‘আমেন রাও’ ভালোবাসাকে সবচেয়ে ঘৃণা করেন। ভালোবাসা, মায়া-মমতা মানুষকে দুর্বল করে, শক্তির পূজারীদের কাছে দুর্বলতার কোন স্থান নেই। আজ থেকে তুমি আমার কথামত চলতে শুর করবে, আমার বা আজকে দেখা কোন কিছু বাহিরের কাউকে বললে তোমার ভাইকে আমি মেরে ফেলব। এ কথা শুনেই নানী এক ভয়াবহ আর্তচিৎকার করে ছটফট করে চেয়ার থেকে মেঝেতে ঢলে পড়লেন। আমি দৌঁড়ে তার কাছে যেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম, এর মধ্যে খালা এসেও নানীর পায়ের কাছে ঝাপিয়ে পড়লেন। নানীকে জড়িয়ে ধরেই বুঝতে পারলাম এ দেহে কোন প্রাণ নেই। তবু নিয়মরক্ষায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম তাকে। পরের এক মাসের মধ্যে জীবনটা পুরো বদলে গেল আমার। আমাদের অভিভাবকত্ব প্বেয়ে গেলেন বাবলু মামা। নানীর সই করা কাগজে নাকি এই নির্দেশই ছিল। ভাইয়াকে নিয়ে আমেরিকা চলে গেলেন বাবলু মামা। যাওয়ার আগে গোপনীয়তার ব্যাপারে আবার সাবধান করে গেলেন আমায়। এর পাশে নির্দেশ দিলেন কালো জামা, গহনা, সাজ সরঞ্জাম ব্যবহার করতে। একাই নিজের ভবিতব্যকে মেনে নিয়েছিলাম। এরমধ্যে জয়ন্ত নামের এক জুনিয়র ছেলের সাথে পরিচয় হল, আগ বাড়িয়ে আমিই পরিচয় করলাম। কারণ ওর কথাবার্তা, চেহারা, আচরণ সবই অবিকল ভাইয়ার মত। ধীরে ধীরে সখ্যতা গড়ে উঠল ওর সাথে। ভাবছিলাম ওকে খুলে বলব সবকিছু। এ সময় বিদেশ থেকে ফিরে এল মামা ও ভাইয়া, পুরনো বিভীষিকা যেন ফিরে এল। আমার এই অভাগা কপালের সাথে আর ছোট ছেলেটিকে জড়াতে মন চাইল না। ইশ্বর আমায় মুক্তি দাও- হ্য এই বিপদ থেকে নয় পৃথিবী থেকে। আমি আর নিতে পারছি না।

ডায়েরি পড়া শেষ করেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল জয়ন্ত, আপুকে সাহায্য করতে হবে। প্রথমেই ফোন বের করে তানিশার উপর ক্রাশ খাওয়া সিনিয়র শাহান ভাইকে ফোন দিল জয়ন্ত। ভাই বেশ বুদ্ধিমান, মাত্র ৫ মিনিট কথা বলতেই বুঝে ফেললেন তানিশা বিপদে আছে, জানালেন তার এক মামা পুলিশের ডিআইজি। তৎক্ষনাত তাকে ফোন দিয়ে এ সমস্যার কথা জানালেন, তার মামা পুলিশের একটি ছোট দলকে তানিশার বাসায় যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। শাহান পুলিশের সাথে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল, প্রথমে নারাজ হলেও পরে ভাগ্নের আবদারে তিনি রাজি হলেন। শাহান ইতোমধ্যে জয়ন্তকে তানিশার বাসায় চলে যেতে বলল। জয়ন্ত দ্রুত চলে গেল তানিশাদের বাসায়, তখনও পুলিশকে নিয়ে শাহান সেখানে পৌঁছায়নি। বাসায় যেয়ে বেল টিপে টিপে কাওকে পেল না জয়ন্ত, নিচে রিসেপশনে এসে সে কথা বলতেই তারা জানাল তানিশা, তার ভাই আর তার মামা বেশ কিছুক্ষণ আগে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেছে, ড্রাইভারকে নেয় নি। গাড়ির নাম্বার সিসিটিভি ফুটেজ থেকে দেখে শাহান ভাইকে খবর দিল জয়ন্ত, প্রথমে রিসেপশনের লোকটি গড়িমসি করলেও শাহানের পাশে থাকা উপপরিদর্শকের ফোনের ধমকে সে কাজটি করে দিল। ইতোমধ্যে শাহানের মামাকে এ তথইয় দেওয়ায় জানা গেল ট্রাফিক পুলিশের সেন্ট্রাল ডাটাবেজে একটু আগে গাজীপুর চৌরাস্তার সিগ্ন্যালে গাড়িটি নির্দিষ্ট গতিসীমা অতিক্রম করে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেছে। এ কথা শাহান শুনতে পেল তানিশাদের বাড়ির নিচে এসেই। জয়ন্তর সাথে তানিশাদের বাড়ির নিচে এসে দেখা করে এ তথ্য জয়ন্তকে দিল শাহান। এ কথা শুনেই জয়ন্তর মনে পড়ল গাজীপুরের নুহাশ পল্লীর একটু আগে তানিশাদের একটি বাগান বাড়ি আছে। তানিশার সাথে একবার সেখানে গিয়েছিলও সে। শাহান ভাইকে সে কথা বলতেই পুলিশের গাড়িতে চড়ে নুহাশপল্লীর দিকে যাত্রা করল তারা। জ্যামের কারণে প্রায় ৩ ঘন্টা পর তানিশাদের বাগানবাড়িতে যেতে পারল তারা। প্রাচীরের বাহির থেকেই সেখানে এক বিশাল আগুনের আভা দেখতে পারল তারা। গেটে কেউ ছিল না, বারবার ধাক্কা দিয়েও কেউ খুলতে এল না গেট। ঘড়িতে তখন বাজে রাত ১০ টার মত। সঙ্গে থাকা পুলিশের সদস্যরা- ৪ জনের একটি ছোট দল যাতে একজন উপপরিদর্শক ও বাকি ৩ জন কন্সটেবল। তার সঙ্গে থাকা শাবল ও সাথে থাকা বন্দুকের গুলির মাধ্যমে গেটের ছিটকানিটি ভাঙ্গতে সক্ষম হয়। তারা সবাই দৌঁড়ে ভেতরে যেয়ে এক অদ্ভুত দৃশ্যের সম্মুখীন হয়। কালো রঙের পোশাক পরা তানিশাকে একটি ল্যাম্পপোস্টের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার চারপাশে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুনেরে লেলিহান শিখা। আগুনের সামনেই বসে আছেন মামা। পাশে জয়ন্তর ভাই মিশরীয় মমিদের মত একটা আলখাল্লা পরে আছেন। মামা বিড়বিড় করছেন আর মশলার মত কিছু একটা আগুনে ছুড়ে মারছেন। জয়ন্ত কান পেতে শুনতে পেল মামা বলছেন, আমেন রাও, সময় এসেছে প্রস্তুত হও, ঠিক ১২ টার সময় নিজের বোনকে খুন করে তানিশার ভাই আমেন রাওয়ের এরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি করবে যার মাধ্যমে জেগে উঠবে আমেন রাও, আর বোনের রক্ত পান করে আমেন রাওকে পূর্বের ন্যায় শক্তিশালী করে তুলবে তানিশার ভাই। পৃথিবীর বুকে আমেন রাওয়ের নিষ্ঠুরের রাজত্ব আবার শুরু হবে, ধংস হবে দুর্বলরা, লুণ্ঠন, হত্যা ও অত্যাচারের এক নতুন বিভীষিকার পুনরাগমন হবে পৃথিবীর বুকে। দুজন কন্সটেবল এবার কর্মতৎপরতা দেখিয়ে বাবলু মামার দিকে বন্দুক নিয়ে এগিয়ে গেল। কিন্তু তার চারপাশে ঘেরা একটি লাল দাগের কাছে যেতেই একটি অস্ফূট শব্দ করে দুজনেই অজ্ঞান হয়ে পড়ল। তাড়াতাড়ি করে সামনে এগিয়ে যেয়ে দুইজনের নার্ভ চেক করে উপপরিদর্শক বললেন, বেচে আছে ওরা। মামা ঘুরে তাকালেন জয়ন্ত, শাহান ও পুলিশে জাগ্রত দুই সদস্যের দিকে। বলে উঠলেন এই চক্রবূহ্য ভেদ করা এত সহজ নয়। সত্যিকারের নির্ভীক পুরুষই শুধু পারবে এই আমেন রাওয়ের শক্তিবূহ্য ভেদ করতে। কিন্তু তোমাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ভয়, স্নেহ, মায়া-মমতা যা তোমাদের প্রকৃত শক্তিকে দুর্বল করে। এ কথা শুনে এক কন্সটেবল হাতের বন্দুক তুলে গুলি করে বসল মামার দিকে। অদ্ভুতভাবে বূহ্যের কাছে যেয়ে যেন অদৃশ্য আয়নায় বাঁধা পেল গুলিটি। ফিরে এসে আঘাত করল তার কাঁধে। যন্ত্রণায় কাতরে উঠে কাঁধ চেপে ধরল সে। পুলিশের উপ পরিদর্শক তার কাছে ছুটে গেলেন, পকেটের রুমাল দিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরে কন্সটেবলকে নির্দেশ দিলেন এইভাবে রক্তপাত আটকে রাখতে। এরপর চিন্তিত মুখে শাহানকে বললেন ডিআইজি স্যারকে ফোন করে আরো ফোর্স পাঠাতে বলুন দইয়া করে। শাহান ভয়ার্ত মুখে বলল তাতে কী লাভ? মামার কাছে তো কেউই যেতেই পারছি না। হটাৎ জয়ন্ত আসছি বলে গেটের দিকে দৌড় দিল বাকি দুজনের বিস্ময়াভূত চোখের সামনে। ১ মিনিটের মধ্যেই ফিরে এল সে হাতে সেই গেট ভাঙা শাবল। এই শাবল দিয়ে চক্রবূহ্যের বাহিরে অজ্ঞান হওয়া কন্সটেবলদের পাশে থেকে গর্ত খুড়তে শুরু করল সে। প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লাগিয়ে মাটির উপর একটি স্তর রেখে মানুষ ঢুকার মত একটি গর্ত খুড়তে সক্ষম হল যার দুইমুখ চক্রবূহ্যের দু পাশে। এরপর সব সাহস একত্র করে সেই গর্তের মধ্যে ঢুকে অপর পাশে বেড়িয়ে এল সে। এর মধ্যে ঘড়িতে প্রায় ১১.৪৫ বেজে গেছে, ১২টা বাজার আর বেশি দেরি নেই। গর্ত দিয়ে বূহ্যের ভেতর ঢুকার সাথে সাথেই চিৎকার করে ঊঠলেন মামা। বললেন-সাবধান ছেলে। এই অনাত্মীয় মেয়ের জন্য নিজের মূল্যবান প্রাণটা উৎসর্গ করিস না, ঘরের ছেলে ঘরে মায়ের কোলে ফিরে যা। এসব কথায় কান না দিয়ে সাথে করে আনা শাবলটা নিয়ে মামার গলা লক্ষ করে তা চালাতে চাইল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর জয়ন্ত কিন্তু ব্যর্থ হল সে। হটাৎ তার পথ আগলে উপস্থিত হয়েছে তানিশার ভাই। জয়ন্ত তানিশার ভাইকে লক্ষ্য করে বলে উঠল, কেমন ভাই আপনি, নিজের নানীর হত্যাকারীকে বাঁচাতে চাচ্ছেন অথচ নিজের নিষ্পাপ বোনকে হত্যা করতে চাচ্ছেন, সরে দাঁড়ান, শয়তানটাকে না আটকাতে পারলে তানিশাপুকে মেরে ফেলবে। তার কথায় কোন ভ্রূক্ষেপ না করে এ পাগল উলটা তার গলা টিপে ধরে, প্রাণপন চেষ্টা করেও তার আক্রমণ থেকে ছুটে আসতে পারে না জয়ন্ত। এতক্ষণ নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করা শাহান আর উপপরিদর্শক ঐ গর্ত দিয়ে বূহ্যের ভেতর ঢুকে পড়ে। পুলিশের উপপরিদর্শক হাতের পিস্তল উলটা করে এক বাড়ি দিয়ে বসে তানিশার ভাইয়ের মাথায়। জয়ন্তর গলা ছেড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে তানিশার ভাই। ইতোমধ্যে শাহান শাবলটি হাতে নিয়ে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে দড়াম করে একটি বাড়ি লাগিয়ে দেয় বাবলু মামা শয়তানটির কানের নিচে। আর একই সাথে আমেন রাও হতে চাওয়া তানিশার ভাইকে উলটা করে শুইয়ে তার হাতে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে দেন পুলিশের উপ পরিদর্শক। শাহান বলে উঠে, আত্মসমপর্ণ করুন, আপনার খেলা শেষ, তানিশাকে ছেড়ে দিন, আপনার আমান রাও বন্দী। বাবলু মামা তাকিয়ে অবস্থা পর্যালোচনা করলেন, এরমধ্যে জয়ন্ত ক্রমাগত তাকে শাবল দিয়ে পিটিয়ে চলেছে, সাময়িক ব্যথা থেকে মুক্তি পেলেও আঘাতের ছাপ বসে চাচ্ছে তার শরীরে। উঠে দাঁড়িয়ে শাবলটি জয়ন্তর হাতে থেকে খেলনার মত কেড়ে নিলেন তিনি, তারপর ছুড়ে দিলেন দূরে। আমান রাওকে রুখবে তোমরা অর্বাচীনরা, এত সহজ, তার অট্টহাসিতে যেন কেঁপে উঠল পুরো এলাকা। আমেন রাও ফিরবেই বলে আকাশের দিকে হাত তুলে হাতের সবগুলো মশল্লা ছূড়ে দিলেন তানিশার চারপাশে জ্বলা আগুনের দিকে। আগুনটি দপ করে বিশালাকার ধারন করে দপ করে নিভে গেল, চারপাশের মাটি কেঁপে উঠল ভীষণভাবে, এই দুই ঝটকা সামলাতে সবাই আগুনের দিকে তাকিয়ে মাথা ঢেকে বসে পড়ে। সবাই আবার স্বাভাবিক হয়ে চারপাশে তাকিয়ে বাবলু মামার কোন চিহ্ন খুঁজে পেল না। হটাৎ আকাশ থেকে একটা গুরুগম্ভীর কণ্ঠ বলে উঠল আমেন রাও আজকে ফিরতে না পারলেও অদূরেই ফিরে আসবে, এটাই ভবিতব্য। এ কথা শুনেই দৌঁড়ে তানিশার কাছে যেয়ে তার বাঁধন খুলে দিল জয়ন্ত। নাকের কাছে হাত নিয়ে বুঝতে পারল শ্বাস প্রশ্বাস চলছে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল- আসুক, আমরা আবারো তাকে রুখে দিব।

সত্যের জয় হবেই।

 পাঠকদের জন্য সুখবর!

অনলাইনে ডিজিটাল বাংলা  কমিক্স পড়ুন
ফ্রি-তে!

সদস্য রেজিস্ট্রেশন
close-link