(স্বপ্ন ) 

       রুমে একটা চুরুট জ্বলছে, কিন্তু চুরুটের মালিককে দেখা যাচ্ছে না। চুরুটের ধোঁয়াগুলো কুয়াশার মত অদ্ভুত এক রহস্যময় অন্ধকার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মনে হচ্ছে পৃথিবী থেমে গেছে, এর অভিকর্ষজ ত্বরণ শুন্য হয়ে সব মহাকাশে ভাসছে। কিন্তু আমি কোথায়? নিজেকে কোন আলাদা সত্ত্বা মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে কোন অশরীরীর অস্তিত্বের অংশবিশেষ। এটা কি আমার নিয়তি নাকি স্রেফ কল্পনা। এ যেন এক ভয়ংকর বিষণ্ণ অনুভূতি। অনেক দূরে একটা নিঃসঙ্গ নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে নক্ষত্রটি অভিশপ্ত, দারুণ ক্রোধে জ্বলছে। চুরুটটা নিভে গেছে অনেক আগে, কোথা থেকে যেন মোলায়েম আযানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ আশপাশের পরিবেশ স্বাভাবিক হতে শুরু করল। প্রথমবারের মত স্মরণে আসলো সেই পরিচিত রুম কিন্তু কোথায় যেন একটা গড়মিল। সহসাই বুঝতে পারলাম আমি খাটের শক্ত কাঠের উপর শুয়ে আছি অথচ সেখানে তোশক, চাদর বা বালিশ কিছু নেই। কোন যুক্তি দাঁড় করানোর আগেই শরীরের পেছনে তীব্র ব্যাথা জেঁকে বসল। অনেক কষ্টে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে এগোলাম। বেসিন খুলে আয়নার দিকে তাকাতেই চেহারায় গভীর ঘুমের একটা অভিব্যক্তি চোখে পড়ল। ফ্রেশ হয়ে বের হতেই ফোনটা বাজতে শুরু করল। কাছে গিয়ে টেবিল থেকে ফোনটা তুললাম, সকাল ৬ টার অ্যালার্ম। গায়ে একটা শার্ট আর ফর্মাল প্যান্ট জড়িয়ে অফিসের ব্যাগটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম।  বুয়াটার তিনদিন যাবৎ খোঁজ নেই, ফোনও বন্ধ। এ পরিস্থিতিতে আমার মত ব্যাচেলারের ডুকরে কান্না ছাড়া উপায় নেই। অফিসের নিচে টঙ থেকে নাস্তা সেরে নিলাম। অফিসে ঢুকতেই রফিক ভাই বলে উঠল, “কি খবর রাফায়েতউইকেন্ড কি শুধু ঘুমিয়েই কাটালে?” খানিকটা হেসে জবাব দিলাম কি করব ভাই আপনার মত বউ-বাচ্চা আছে নাকি যে ঘুরতে বের হবো। “এহ, ইয়ে টেবিলের উপর কিছু প্রোজেক্ট রাখা আছে, একটু দেখে পাঠিয়ে দিও। দুপুরের আগে একটা মিটিং আছে আবার বসের সাথে। নিজের ডেস্কের দিকে এগিয়ে গেলাম, পল্টনে একটা বই প্রকাশনীতে ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড এক্সিকিউটি পদে আছি। এই সংকটাপূর্ণ শহরে চাকরি পাওয়া সোজা কথা নয়; চলে যাচ্ছে বেশ। দিনটা বেশ ব্যস্ততায় কাটে এখানে, বাইরের পৃথিবীর খোঁজ থাকে না। রওনক দা হঠাৎ বলে উঠলো কি রাফায়েত বের হবেন না? তখনই খেয়াল হল অফিস আওয়ার শেষ। বাধ্য পাখির মত বাসায় ফেরার পালা। সারাদিনে সবচেয়ে দুঃসাধ্য কাজ হচ্ছে ৫ টার পর বাস ধরে বাসায় ফেরা। কিছুদিন ধরে ঘুম যেন আমার বেড়েই চলছে, বলতে পারি না কবে যে চিরনিদ্রায় চলে যাবো। কথাটা মনে করে আনমনেই একটা হাসির রেখা চেহারায় বয়ে গেল, সাথে খানিকটা বিষণ্ণতা। বিছানায় হালকা মাথা ছোঁয়াতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।  

(স্বপ্ন ২) 

      দ্রুত চারপাশ ঘন অন্ধকারে রুপ নিলসেইসাথে একটা নিঃসঙ্গ অনুভূতি গ্রাস করল আমাকে। জেগে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। হঠাৎ দূরে একটা অস্পষ্ট অবয়ব দেখা গেল, অনেক চেষ্টার পর একটা আবছা মত চেহারা চোখে পড়ল। একটা সাদা চটের বস্তা যদি মানুষের মুখের শেইপে কাটা হয় তেমন, এর বেশি আর কিছু দেখা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাপারটা অদ্ভুত, ঘুমের মধ্যে সম্পূর্ণ জাগ্রত আমি। অবয়বটার যত কাছে যাচ্ছি মরীচিকার মত সেটা তত দূরে সরে যাচ্ছে, কেন যেন মনে হচ্ছে মুখোশের নিচে কোন রক্তমাংসের মুখ নেই, থাকলেও তাতে  পৈশাচিক হাসি ব্যতীত অন্য কিছু নেই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অবয়বটা একটা দরজার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে দরজার কাছে গিয়ে নবটা ধরতেই শীতল একটা স্রোত স্পাইন দিয়ে সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল। দরজাটা আস্তে আস্তে খুললাম। না কিছুই নেই, শুধু খুনি অন্ধকার আর তাবৎ শুন্যতা। কেবলই মনে হতে লাগলো কোন পাহারের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি। নিজেকে বড় ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে। হটাৎ ঝড় বাতাসের তীব্র ধাক্কায় হাত থেকে দরজার নবটা ছুটে গেল, আর আমি অন্ধ গহ্বরে পরতে শুরু করলাম, সময়ের প্রসারণ হয়ে যেন কোন লুপে আটকে গেছি, অনন্তকাল ধরে পড়ছি আর পড়ছি। আকস্মিক কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভাঙল, ঘরে তীব্র শীত অনুভুত হচ্ছে। শার্টটা জড়িয়ে দরজা খুললাম, বুয়া!!! বুয়া আমাকে দেখে ভুত দেখার মত চমকে উঠে বলল, “ভাইজান, আপনার চেহারা সুরতের এই লাহান কেন? কিছু হইসে?” হঠাৎ আমার মাথায় রাগ উঠে বসলো, এই কয়দিন না আসার জন্যে ব্যাপক বকা-ঝকা করলাম, বুয়ার কৈফতের আর শেষ হয় না। কিন্তু ছুটির দিনের কথা চিন্তা করে মনটা ভাল হয়ে গেল। আবার একই সাথে খারাপ লাগা একটা অনুভূতি। বুয়া কথায় কথায় বলতে শুরু করল, “কাইল রাইতে যেই বাদলা হইল, বৈশাখ মাসে বোধ হয় না এমন আর অইব।” কী? গতকাল ঝড় হয়েছিল? কিছুই টের পেলাম না। দুঃস্বপ্নের কথা আবার মনে পড়ে গেল। বুয়া রান্না-বান্না, ঘর ঠিকঠাক করে চলে গেল। গোসল খাওয়া সেরে ফোনটা হাতে নিলাম। ফেইসবুকে আজাইরা স্ক্রল করছি হঠাৎ গতরাতের ঘটনা মনে পড়ল। আমি সাধারণত ফেইবুকে খুব একটা পোস্ট করি না কিছু। ভাবলাম একটা কিছু লিখি। কি লিখব ভাবছিএমতাবস্থায় একটা উক্তি মাথায় এলোঃ “সব মানুষই মুখোশের দাস, মুখোশের স্তর বা জটিলতার উপর তার ব্যক্তিত্ব নির্ভর করে।”  মধ্যাহ্ন শেষ প্রায়। একটা উপন্যাস নিয়ে বিছানায় গেলাম।  

(স্বপ্ন )  

       কিছুক্ষণ বাদেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। আজ ঘুমের মধ্যে নিজেকে আর জাগ্রত না মৃত মনে হচ্ছে। শত ইচ্ছাতেও চোখের পাতা দুটো আর খুলতে পারলাম না। এ যেন এক অসহায় অনুভূতি। অন্ধত্ব যেন আমার ভাগ্যের পরিহাস। কেউ যেন আমাকে উপহাস করে হাসছে, আবার কেউ যেন করুণা দেখিয়ে বিলাপ করে কাঁদছে, কিংবা কেউ নিজের নিয়তির নির্মম শিকার হয়ে তারস্বরে চিৎকার করছে। মিশ্র অনুভূতির কোন পথ ধরে যেন হেঁটে চলা বিভ্রান্ত পথিক আমি। আবার অনেকটা অপারেশন টেবিলে শুয়ে থাকা মুমূর্ষু রোগীর মত যার চারপাশে নরম চেহারার খুনি মানসিকতাসম্পন্ন ডাক্তারদের ভিড়। কিছু অস্পষ্ট কথা মিশ্রিত চিৎকার অনেকটা অপেরারার মত নিচুস্বর থেকে একবার উচুস্বরে বাজছে আবার তার বিপরীত হচ্ছে। কতক্ষণ এ যন্ত্রণার মধ্যে আছি জানি না, সম্বিৎ ফিরে পেলাম ফোনের শব্দে। ঘর্মাক্ত হাত দিয়ে ফোনটা উঠালাম। মা ফোন দিয়েছে। ফোনটা এক মুহূর্তের জন্যে ধরতে ইচ্ছা হল না। কিন্তু ধরলাম। মা প্রায়ই খোঁজ নিতে ফোন দেয়। আমার পরিবারের সবাই ঢাকাতেই থাকে কিন্তু ব্যক্তিগত একটা ঝামেলার রেশ ধরে তাদের সাথে দেখা করা হয় না। ঝামেলাটা ছেলেমানুষি, ক্যারিয়ার নিয়ে মতের অমিল। ব্যস একা মেসে ওঠা, নিজের রাস্তা নিজে মাপা। মাঝে মাঝে মনে হয় কীসের এত কমপ্লিকেশন, প্রকৃতিতে কোথাও হারিয়ে যাই নতুবা হঠাৎ মরে যাই কিংবা ব্যক্তিত্বটাই পাল্টে ফেলতে পারতাম। ফোনটা ধরে অনেকটা বিরক্তির স্বরেই বললাম, “কী?” মা অনেকটা কান্নার স্বরে বলল, “একটা খারাপ স্বপ্ন দেখলাম তরে নিয়া, তুই ঠিক আছিস?” আমার নির্বিকার জবাব, “হ্যাঁ, সব ঠিক।” ফোনটা রাখতে গিয়ে কি মনে করে জিজ্ঞেস করলাম, “বাসার সবাই ঠিক-ঠাক?”। মা বলল, “সবাই আল্লাহ্‌র রহমতে ভালো। নিজের খেয়াল রাখিস।” ফোন রেখে দিলাম। ঘড়িতে রাত ২ টা। হাত-মুখ ধুয়ে এক কাপ চা বানালাম, চায়ে দুধ চিনি বেশি খাওয়া আমার নতুন অভ্যাস; এতে ঘুম ভাল হয়। মাস ছয়েক আগে অতিরিক্ত ক্যাফেইনে ঘুম না আসার দরুণ ডাক্তার কাছে গেলে এই পরামর্শ দেন তিনি। চা শেষ করে কম্পিউটারে বসলাম একটা  আর্টিকেল লিখতে। ক্রিমিনাল সাইকোলজি নিয়ে একটা আর্টিকেল, আমার বন্ধুর অনলাইন ম্যাগাজিনের জন্যে।  

(স্বপ্ন ) 

      লিখতে লিখতে একটা হালকা তন্দ্রামত চলে এল। মনে হচ্ছে কম্পিউটারের আলোটা আস্তে আস্তে দূরে স্বরে যাচ্ছে। নিজেকে কাঠের চেয়ারে শক্ত করে বাধা মনে হল। নিজের অস্তিত্বকে চেয়ারের অস্তিত্ব থেকে আলাদা করতে পারলাম না, নিজেকে কেবলইই একটা চেয়ার মনে হল। কম্পিউটারের আলোটা একটা চুরুটের আলোয় রুপ নিল। চুরুটের পেছনে একটা অবয়ব, খুব অস্পষ্ট। কি ওটা খুব পরিচিত লাগছে। কোথায় দেখেছি। হ্যাঁ, রাস্তায় দেখেছি। আরে এটা তো একটা কুকুরের মস্তক। এ কেমন বিকৃত স্বপ্ন!!! সব ধুলোয় মিশে গেল। ঘুম ভেঙ্গে গেছে, ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে অফিসের জন্যে রেডি হয়ে নিলাম। ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে গরম করতে করতে ওভেনের কাঁচে চোখ আটকে গেল। এ কী! এটা আমারই তো চেহারা কিন্তু এত বিকৃত কেন?  দৌড়িয়ে আয়নার কাছে গেলাম, বিধ্বস্ত চেহারা, চোখদুটো লাল এবং ফুলে আছে। অকর্মা ঘুমকে গালি দিতে লাগলাম। অফিসে আজ প্রচণ্ড ব্যস্ততা।  রফিক ভাই আমাকে দেখে বললেন তুমি ঠিক আছ রাফায়েত? এ কী অবস্থা!!!  ভাবলাম তোমাকে প্রিন্টিং প্রেসে পাঠাই, এখানে সবাই প্রচুর বিজি। আরে ভাই কী বলেন আমি একদম ঠিক, অতিরিক্ত ঘুম আরকি। আমি যাচ্ছি। আর হ্যাঁ, রাফায়েত শোন, প্রিন্টিং প্রেসের ঝামেলা চুকিয়ে বিলটা জমা দিয়ে চলে যেও, আজকে আর কাজ নেইগেস্ট আসবে বাইরে থেকে। আচ্ছা ভাই বললাম ঠিকই কিন্তু বাসায় গিয়ে কী করবো আবার সেই  দুঃস্বপ্ন। বিল জমা দেয়া শেষ করে বাইরে বের হলাম। বিকাল ৪.২৫। হঠাৎ আমার সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধু যাকারিয়ার কথা মনে হল, কী ভেবে ওকে ফোন দিলাম।  

 “কীরে দোস্ত, কী খবর? চেম্বারে নাকি?” 

-“না দোস্ত আজকে বাসায়।” 

 “বাসায়?” 

 “হ্যাঁ, জিলকে গতকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।”  

আঙ্কেল-আন্টি দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পর জিলই যাকারিয়ার একমাত্র সঙ্গী। প্রথমদিকে জিলকে পোষ মানাতে অনেক কষ্ট হয়েছে। পরে যাকারিয়াকে ছাড়া থাকতেই চাইত না। 

আই এম সরি, দোস্ত।” 

যাকারিয়া আমাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বলল, তুই বাসায় চলে আয়।”  

চাইছিলাম এটাই। সোজা বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। ব্যাপক আড্ডা হল। এক সময় আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তুই স্বপ্নের ব্যাখা বিশ্বাস করিস?” 

তুই তো জানিস প্যারানরমাল সবকিছুর সায়েন্টিফিক কোন ব্যাখা হয় আছে বা এখন আবিষ্কার হয়নি। তাই বলে কোন জিনিসের আমি অযৌক্তিক ব্যাখা দাঁড় করাতে পারি না। হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?” 

আমি যাকারিয়াকে গত কয়েকদিনের কথা খুলে বললাম। 

 “শোন রাফায়েত, স্বপ্ন হল হ্যালুসিনেশন যেটা ঘুমের বিভিন্ন স্টেজে হয়ে থাকে। স্বপ্নের দৈর্ঘ্য কয়েক সেকেন্ড থেকে ২০-৩০ মিনিট পর্যন্ত হতে পারে। স্বপ্ন দেহের মেটাবোলিজম, ব্লাড প্রেসারব্রেইন ফাংশনেও ভুমিকা রাখে। স্বপ্ন নিয়ন্ত্রিত হয় ব্রেইনের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী পোরশন থেকে। সিগমান্ড ফ্রেউড নামে এক সাইকোলজিস্ট বলেন একজন মানুষ অবচেতন মনে যে অপূর্ণ বাসনা প্রত্যাশা করেন তার পূর্ণটাই হচ্ছে স্বপ্ন অর্থাৎ অপূর্ণ আবেগ-অনুভুতি। আবার আমাদের বাস্তব ঘটনাও এতে প্রভাব ফেলতে পারে। দুশ্চিন্তা, দুর্ঘটনা, অপ্রাপ্তিদুঃসহ অতীত, একাকীত্ব, ভয় ইত্যাদি ডিস্টার্বিং ড্রিম বা নাইটমেয়ার তৈরি করে। স্বাস্থ্যকর খাবার, ব্যায়াম, ধূমপান ত্যাগ, পর্যাপ্ত ঘুম- এ কয়েকটা কাজ ঠিক মত কর।” 

ওকে আর জিজ্ঞেস করার ইচ্ছেই হলো না স্বপ্নটার সম্বন্ধে। বিদায় জানিয়ে বাসায় চলে এলাম। মেজাজ খারাপ করে দিয়েছে যাকারিয়া। রুমের লাইট অফ করে দিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। ইন্টারনেটে সার্চ দিলাম, “মিনিং অফ ড্রিম”। তেমন কিছু পেলাম না। আমার এক বন্ধু বলত মেজাজ খারাপ হলে ঘুমিয়ে পড়তে। বেশিক্ষণ লাগলো না কাজটা করতে। তারপরই মনে হল ক্ষমাহীন ভুল করে ফেলেছি। 

(স্বপ্ন ) 

      আজকে আর চারদিকে অন্ধকার নেই শুধু সাদা আর সাদা। চোখ ধাঁধিয়ে গেল। কিন্তু সেই শুন্যতা ঠিক একই রকম। বুঝে উঠতে পারলাম না ব্যাকগ্রাউন্ডটা হঠাৎ পরিবর্তন হল কেন!!! আস্তে আস্তে চোখ সয়ে এল। মৃদু একটা গলার স্বর শুনতে পেলাম। একটু মনোযোগ দিতেই স্পষ্ট হল শব্দটা, কেউ কোমল স্বরে আমার নাম ধরে ডাকছে। উপেক্ষা করার মত স্বর না এটা, অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে এগিয়ে গেলাম। এটাই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল। শব্দটা আসছে একটা রুম থেকে কিন্তু সবই সাদা রুমের কোন চিহ্ন নেই, তবুও এগিয়ে গেলাম। তারপর যা দেখলাম একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। আমারই আরেকটা প্রতিকৃতি শুয়ে আছে মেঝেতে, তার পাঁচ কোণে ৫টি সাদা  হুড তোলা অবয়ব। আর নিতে পারলাম না, হয়ত স্বপ্নের মাঝেই জ্ঞ্যান হারালাম। যখন উঠলাম সকাল হয়ে গেছে। রাতের ঘটনা মনে করতেই শরীরটা কেঁপে উঠল, শরীরটা খারাপ লাগছে। রফিক ভাইকে ফোন দিয়ে সিক লিভ চাইলাম। রফিক ভাই আমার গলার স্বর শুনেই আর কিছু বললেন না। খুব কষ্টে ওয়াশরুমে গেলাম, আয়নায় তাকাতে নিজেকেই নিজের ভয় হল। চোখ দুটো মনে হয় কোটর থেকে বের হয়ে আসবে, ত্বকে কোন বর্ণ নেই। এ যেন আমি না, অন্য কেউ। বুয়াকে দরজা না খুলেই বিদায় করে দিলাম। ঠিকমত চিন্তা করতে পারছি না। যুক্তি খেলছে না কোন। একদিনে এতটা বদলানো কী সম্ভব। সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। যাকারিয়ার রেফারেন্সে একটা মেডিসিনের ডাক্তারের কাছে রাত আটটায় সিরিয়াল দিলাম। সারাদিন ক্যাফেইনের উপর থাকলাম। ছয়টায় বাস ধরে মহাখালি আসলাম। অবশেষে আমার ডাক আসলো। ডাক্তারের রুমে বসে সমস্যা বলতে গিয়ে মুখ আটকে গেল, কী বলব। তিনিই বলা শুরু করলেন, আনহেলথি ডাইজেশনডিহাইড্রেশনইনসোমনিয়াসিভিয়ার জেনারালাইজড এনজাইটি। আপানার বয়স তো বেশি না, এত দুশ্চিন্তা করবেন না আর নিয়মানুবর্তী হন একটু।” প্রেসক্রিপশনে কিছু ঘুমের ঔষধ, এন্টি-এনজাইটি পিল, স্যালাইন এসব দেখতে পেলাম। ডাক্তার আমার স্বপ্ন আর ঘুমের কথা বিশ্বাসই করলেন না, শুধু অবজ্ঞার চোখে তাকালেন আমার দিকে। 

এন্টি-এনজাইটি পিল কিনে বাসার চলে আসলাম, কফি বানালাম ফ্লাক্স ভর্তি। আমি যেন এক দেশে ঘুম আরেক দেশে। ব্যাপারটা এতটা সহজ হয়নি অনেক চরাই-উতরাই পেরিয়ে মডাফিনিল নামে একটা মেডিসিন ম্যানেজ করতে হয়েছে যেটা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া পাওয়া দুষ্প্রাপ্য। এটা একাধারে ৪০ ঘণ্টা ঘুম উধাও করে দেয় অন্যদিকে মুড সুইং করে। কিন্তু এতে শারীরিক অবস্থা ক্রমশই খারাপ হতে থাকল।  

২ দিন পরের ঘটনা!!!! রফিক ভাই আমাকে জোর করে অফিস থেকে বের করে দিয়ে সিএনজি করে দিলেন আর বললেন সুস্থ হয়ে তারপর অফিসে আসতে তিনি সামলে নিবেন, আমার কোন কথাই শুনলেন না। আমারও এই দুইদিনে দুঃস্বপ্নগুলো একদম সাধারণ মনে হতে লাগলো। তাই ডিনারটা সন্ধ্যায় সেরেই পরিচিত বিছানায় গড়িয়ে দিলাম ক্লান্ত শরীরটাকে।  

(শেষ স্বপ্ন ও রুপান্তর) 

          হঠাৎ চোখ খুলে গেল কিন্তু ঘুম ভাঙল কিনা তা আজীবন আমার কাছে রহস্য হয়ে থাকবে। একটা করিডোরের এক প্রান্তে আমি অন্যপ্রান্তে একটা মৃদু আলোর রেখা কোন একটা রুমের মতো, অথচ মনে হচ্ছে দুইপ্রান্তের মাঝে এক সুদীর্ঘ জলরাশি সমান দুরত্ব।  কিন্তু মনের কোথায় যেন আত্মবিশ্বাসী মনোভাব, আমাকে শেষ প্রান্তে যেতেই হবে। প্রচণ্ড ক্লান্তির মাঝে এক পা  দু পা করে শিশুর মত হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে থাকলাম। নিশ্চুপ, নিরব, নিথর এক পরিবেশ। কেন যেন মনে হল করিডোরের কংক্রিটের দেয়ালগুলো জীবিত, তারা যেন প্রত্যক্ষদর্শী, সুবোধ স্রোতার মতো সব শুনতে পাচ্ছে। হামাগুড়ি দেয়ার ফলে মুখ দিয়ে গোঙানির শব্দ হচ্ছে যা দেয়ালগুলোতে বিকটভাবে প্রতিফলিত হতে শুরু করল। শান্তিময় আবহাওয়ার কেমন তীব্র যন্ত্রণার মতো সংকোচন-প্রসারণ হতে শুরু করল। শরীরের সব শক্তি দিয়ে এগোতে লাগলাম, মনে হচ্ছে ফুসফুস বায়ুশূন্য এক চুপসানো বেলুনে পরিণত হয়েছে। নিচ থেকে দরজাটার পাল্লা ধরে ঠেলা দিলাম। একি এটা তো আমার রুম। চেয়ারে ঘুমন্ত একটা শরীর, একটু খেয়াল করতেই চোখের পাতা পরা বন্ধ হয়ে গেল আমার। এ, একি!!! এটা তো আমি। বিস্ময়ের ধাক্কাটা কেটে যেতেই অমানুষিক একটা ভয় গ্রাস করল আমাকে। আমরা ভয়ের এলিমেন্ট হিসেবে সবসময় অবাস্তব জিনিস কল্পনা করি, কিন্তু সেখানে পরিচিত কিছু যদি এসে পড়ে তাহলে ভয়ের পরিমাণ হয় সীমাহীন। এ মুহূর্তে ঠিক তেমনি একটা আভাস আমার মনের কোনে উঁকি দিচ্ছে। পরিস্থিতিটাকে মনে হচ্ছে আয়নার এদিক ওদিক। হিউম্যান ব্রেইন দ্বিধায় পড়ে গেলে ঠিকমত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তখন এর সাক্সেসের পরিমাণ হয় ৫০-৫০। অর্থাৎ ভুল কিংবা সঠিক দুটোই সমান। চেয়ারে ঘুমন্ত আমাকে আমি স্পর্শ করবো কি করবো না সেটা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন যেন ইচ্ছা করছে। সাত পাঁচ না ভেবে আলতো করে হাতটা ছোঁয়ালাম ওটার কপালে। আস্তে আস্তে দেহটাতে প্রাণের স্পন্দন দেখা গেল। শরীর এতটাই ক্লান্ত যে বসে পড়লাম। ঘরের মৃদু আলোতে দেখলাম দেহটা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। ঘরের মধ্যে হাঁটতে শুরু করল। মুখ দিয়ে অনেক কষ্টে শব্দটা বের করলাম, “তুমি কে?” কোন উত্তর নেই। ওকে দেখে মনে হচ্ছে ও যেন আমাকে দেখতেই পারছে না, আমার কথাও শুনতে পারছে না। শুধু কৌতুহলী বালকের মত এদিক-ওদিক  হাঁটছে আর এটা ওটা ছুঁয়ে দেখছে। দেখে মনে হচ্ছে মাত্র জন্ম নেয়া কোন শিশু। কথাটা মাথায় আসতেই ভয়ংকর একটা ভাবনা মস্তিষ্কে খেলে গেল। নতুন চিন্তা কিন্তু পুরান দেহ নিয়ে আমার সামনেই আরেকজন আমারই মতো হেঁটে বেড়াচ্ছে, কী নির্মম  রুপান্তর! মরিয়া হয়ে অন্য আমিকেই আবার ছুঁতে গেলাম, কি আশ্চর্য তাকে ধরা কিংবা ছোঁয়াই যাচ্ছে না। অনেক চেষ্টার পর হাল ছেঁড়ে দিতে বাধ্য হলাম। কান্না পেতে লাগল কেন যেন। নিজেকে এতটা অসহায় আর কখনো মনে হয়নি, আব্বুআম্মু আর রুনুর কথা মনে পড়ে গেল। আজকের স্বপ্নটা এত বড় কেন? আদৌ কি স্বপ্ন, শেষ আছে কি? নাকি স্থায়িত্ব অনন্তকাল। শেষবারের মতো দ্বিত্বীয় আমিকে ছুঁতে গেলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে ও পেছনে ফিরে তাকাল। মুখে এক চিলতে হাসি, অনেক কান্নার পর মানুষ প্রথম হাসলে যে হাসি চেহারায় দেখা যায় সেই হাসি, কোনদিন না ভোলার মতো প্রাপ্তির হাসি। জিজ্ঞেস করতে গেলাম, “কে তুমি?”, তার আগেই রুমের মৃদু আলোটুকু নিভে গেলো সাথে একটুকরো শব্দ “গুড নাইট”।  

(স্বপ্ন ) 

       রুমে একটা চুরুট জ্বলছে, কিন্তু চুরুটের মালিককে দেখা যাচ্ছে না। চুরুটের ধোঁয়াগুলো কুয়াশার মত অদ্ভুত এক রহস্যময় অন্ধকার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মনে হচ্ছে পৃথিবী থেমে গেছে, এর অভিকর্ষজ ত্বরণ শুন্য হয়ে সব মহাকাশে ভাসছে। কিন্তু আমি কোথায়? নিজেকে কোন আলাদা সত্ত্বা মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে কোন অশরীরীর অস্তিত্বের অংশবিশেষ। এটা কি আমার নিয়তি নাকি স্রেফ কল্পনা। এ যেন এক ভয়ংকর বিষণ্ণ অনুভূতি। অনেক দূরে একটা নিঃসঙ্গ নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে নক্ষত্রটি অভিশপ্ত, দারুণ ক্রোধে জ্বলছে। চুরুটটা নিভে গেছে অনেক আগে, কোথা থেকে যেন মোলায়েম আযানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ আশপাশের পরিবেশ স্বাভাবিক হতে শুরু করল। প্রথমবারের মত স্মরণে আসলো সেই পরিচিত রুম কিন্তু কোথায় যেন একটা গড়মিল। সহসাই বুঝতে পারলাম আমি খাটের শক্ত কাঠের উপর শুয়ে আছি অথচ সেখানে তোশক, চাদর বা বালিশ কিছু নেই। কোন যুক্তি দাঁড় করানোর আগেই শরীরের পেছনে তীব্র ব্যাথা জেঁকে বসল। অনেক কষ্টে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে এগোলাম। বেসিন খুলে আয়নার দিকে তাকাতেই চেহারায় গভীর ঘুমের একটা অভিব্যক্তি চোখে পড়ল। ফ্রেশ হয়ে বের হতেই ফোনটা বাজতে শুরু করল। কাছে গিয়ে টেবিল থেকে ফোনটা তুললাম, সকাল ৬ টার অ্যালার্ম। গায়ে একটা শার্ট আর ফর্মাল প্যান্ট জড়িয়ে অফিসের ব্যাগটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম।  বুয়াটার তিনদিন যাবৎ খোঁজ নেই, ফোনও বন্ধ। এ পরিস্থিতিতে আমার মত ব্যাচেলারের ডুকরে কান্না ছাড়া উপায় নেই। অফিসের নিচে টঙ থেকে নাস্তা সেরে নিলাম। অফিসে ঢুকতেই রফিক ভাই বলে উঠল, “কি খবর রাফায়েতউইকেন্ড কি শুধু ঘুমিয়েই কাটালে?” খানিকটা হেসে জবাব দিলাম কি করব ভাই আপনার মত বউ-বাচ্চা আছে নাকি যে ঘুরতে বের হবো। “এহ, ইয়ে টেবিলের উপর কিছু প্রোজেক্ট রাখা আছে, একটু দেখে পাঠিয়ে দিও। দুপুরের আগে একটা মিটিং আছে আবার বসের সাথে। নিজের ডেস্কের দিকে এগিয়ে গেলাম, পল্টনে একটা বই প্রকাশনীতে ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড এক্সিকিউটি পদে আছি। এই সংকটাপূর্ণ শহরে চাকরি পাওয়া সোজা কথা নয়; চলে যাচ্ছে বেশ। দিনটা বেশ ব্যস্ততায় কাটে এখানে, বাইরের পৃথিবীর খোঁজ থাকে না। রওনক দা হঠাৎ বলে উঠলো কি রাফায়েত বের হবেন না? তখনই খেয়াল হল অফিস আওয়ার শেষ। বাধ্য পাখির মত বাসায় ফেরার পালা। সারাদিনে সবচেয়ে দুঃসাধ্য কাজ হচ্ছে ৫ টার পর বাস ধরে বাসায় ফেরা। কিছুদিন ধরে ঘুম যেন আমার বেড়েই চলছে, বলতে পারি না কবে যে চিরনিদ্রায় চলে যাবো। কথাটা মনে করে আনমনেই একটা হাসির রেখা চেহারায় বয়ে গেল, সাথে খানিকটা বিষণ্ণতা। বিছানায় হালকা মাথা ছোঁয়াতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।  

(স্বপ্ন ২) 

      দ্রুত চারপাশ ঘন অন্ধকারে রুপ নিলসেইসাথে একটা নিঃসঙ্গ অনুভূতি গ্রাস করল আমাকে। জেগে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। হঠাৎ দূরে একটা অস্পষ্ট অবয়ব দেখা গেল, অনেক চেষ্টার পর একটা আবছা মত চেহারা চোখে পড়ল। একটা সাদা চটের বস্তা যদি মানুষের মুখের শেইপে কাটা হয় তেমন, এর বেশি আর কিছু দেখা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাপারটা অদ্ভুত, ঘুমের মধ্যে সম্পূর্ণ জাগ্রত আমি। অবয়বটার যত কাছে যাচ্ছি মরীচিকার মত সেটা তত দূরে সরে যাচ্ছে, কেন যেন মনে হচ্ছে মুখোশের নিচে কোন রক্তমাংসের মুখ নেই, থাকলেও তাতে  পৈশাচিক হাসি ব্যতীত অন্য কিছু নেই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অবয়বটা একটা দরজার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে দরজার কাছে গিয়ে নবটা ধরতেই শীতল একটা স্রোত স্পাইন দিয়ে সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল। দরজাটা আস্তে আস্তে খুললাম। না কিছুই নেই, শুধু খুনি অন্ধকার আর তাবৎ শুন্যতা। কেবলই মনে হতে লাগলো কোন পাহারের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি। নিজেকে বড় ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে। হটাৎ ঝড় বাতাসের তীব্র ধাক্কায় হাত থেকে দরজার নবটা ছুটে গেল, আর আমি অন্ধ গহ্বরে পরতে শুরু করলাম, সময়ের প্রসারণ হয়ে যেন কোন লুপে আটকে গেছি, অনন্তকাল ধরে পড়ছি আর পড়ছি। আকস্মিক কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভাঙল, ঘরে তীব্র শীত অনুভুত হচ্ছে। শার্টটা জড়িয়ে দরজা খুললাম, বুয়া!!! বুয়া আমাকে দেখে ভুত দেখার মত চমকে উঠে বলল, “ভাইজান, আপনার চেহারা সুরতের এই লাহান কেন? কিছু হইসে?” হঠাৎ আমার মাথায় রাগ উঠে বসলো, এই কয়দিন না আসার জন্যে ব্যাপক বকা-ঝকা করলাম, বুয়ার কৈফতের আর শেষ হয় না। কিন্তু ছুটির দিনের কথা চিন্তা করে মনটা ভাল হয়ে গেল। আবার একই সাথে খারাপ লাগা একটা অনুভূতি। বুয়া কথায় কথায় বলতে শুরু করল, “কাইল রাইতে যেই বাদলা হইল, বৈশাখ মাসে বোধ হয় না এমন আর অইব।” কী? গতকাল ঝড় হয়েছিল? কিছুই টের পেলাম না। দুঃস্বপ্নের কথা আবার মনে পড়ে গেল। বুয়া রান্না-বান্না, ঘর ঠিকঠাক করে চলে গেল। গোসল খাওয়া সেরে ফোনটা হাতে নিলাম। ফেইসবুকে আজাইরা স্ক্রল করছি হঠাৎ গতরাতের ঘটনা মনে পড়ল। আমি সাধারণত ফেইবুকে খুব একটা পোস্ট করি না কিছু। ভাবলাম একটা কিছু লিখি। কি লিখব ভাবছিএমতাবস্থায় একটা উক্তি মাথায় এলোঃ “সব মানুষই মুখোশের দাস, মুখোশের স্তর বা জটিলতার উপর তার ব্যক্তিত্ব নির্ভর করে।”  মধ্যাহ্ন শেষ প্রায়। একটা উপন্যাস নিয়ে বিছানায় গেলাম।  

(স্বপ্ন )  

       কিছুক্ষণ বাদেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। আজ ঘুমের মধ্যে নিজেকে আর জাগ্রত না মৃত মনে হচ্ছে। শত ইচ্ছাতেও চোখের পাতা দুটো আর খুলতে পারলাম না। এ যেন এক অসহায় অনুভূতি। অন্ধত্ব যেন আমার ভাগ্যের পরিহাস। কেউ যেন আমাকে উপহাস করে হাসছে, আবার কেউ যেন করুণা দেখিয়ে বিলাপ করে কাঁদছে, কিংবা কেউ নিজের নিয়তির নির্মম শিকার হয়ে তারস্বরে চিৎকার করছে। মিশ্র অনুভূতির কোন পথ ধরে যেন হেঁটে চলা বিভ্রান্ত পথিক আমি। আবার অনেকটা অপারেশন টেবিলে শুয়ে থাকা মুমূর্ষু রোগীর মত যার চারপাশে নরম চেহারার খুনি মানসিকতাসম্পন্ন ডাক্তারদের ভিড়। কিছু অস্পষ্ট কথা মিশ্রিত চিৎকার অনেকটা অপেরারার মত নিচুস্বর থেকে একবার উচুস্বরে বাজছে আবার তার বিপরীত হচ্ছে। কতক্ষণ এ যন্ত্রণার মধ্যে আছি জানি না, সম্বিৎ ফিরে পেলাম ফোনের শব্দে। ঘর্মাক্ত হাত দিয়ে ফোনটা উঠালাম। মা ফোন দিয়েছে। ফোনটা এক মুহূর্তের জন্যে ধরতে ইচ্ছা হল না। কিন্তু ধরলাম। মা প্রায়ই খোঁজ নিতে ফোন দেয়। আমার পরিবারের সবাই ঢাকাতেই থাকে কিন্তু ব্যক্তিগত একটা ঝামেলার রেশ ধরে তাদের সাথে দেখা করা হয় না। ঝামেলাটা ছেলেমানুষি, ক্যারিয়ার নিয়ে মতের অমিল। ব্যস একা মেসে ওঠা, নিজের রাস্তা নিজে মাপা। মাঝে মাঝে মনে হয় কীসের এত কমপ্লিকেশন, প্রকৃতিতে কোথাও হারিয়ে যাই নতুবা হঠাৎ মরে যাই কিংবা ব্যক্তিত্বটাই পাল্টে ফেলতে পারতাম। ফোনটা ধরে অনেকটা বিরক্তির স্বরেই বললাম, “কী?” মা অনেকটা কান্নার স্বরে বলল, “একটা খারাপ স্বপ্ন দেখলাম তরে নিয়া, তুই ঠিক আছিস?” আমার নির্বিকার জবাব, “হ্যাঁ, সব ঠিক।” ফোনটা রাখতে গিয়ে কি মনে করে জিজ্ঞেস করলাম, “বাসার সবাই ঠিক-ঠাক?”। মা বলল, “সবাই আল্লাহ্‌র রহমতে ভালো। নিজের খেয়াল রাখিস।” ফোন রেখে দিলাম। ঘড়িতে রাত ২ টা। হাত-মুখ ধুয়ে এক কাপ চা বানালাম, চায়ে দুধ চিনি বেশি খাওয়া আমার নতুন অভ্যাস; এতে ঘুম ভাল হয়। মাস ছয়েক আগে অতিরিক্ত ক্যাফেইনে ঘুম না আসার দরুণ ডাক্তার কাছে গেলে এই পরামর্শ দেন তিনি। চা শেষ করে কম্পিউটারে বসলাম একটা  আর্টিকেল লিখতে। ক্রিমিনাল সাইকোলজি নিয়ে একটা আর্টিকেল, আমার বন্ধুর অনলাইন ম্যাগাজিনের জন্যে।  

(স্বপ্ন ) 

      লিখতে লিখতে একটা হালকা তন্দ্রামত চলে এল। মনে হচ্ছে কম্পিউটারের আলোটা আস্তে আস্তে দূরে স্বরে যাচ্ছে। নিজেকে কাঠের চেয়ারে শক্ত করে বাধা মনে হল। নিজের অস্তিত্বকে চেয়ারের অস্তিত্ব থেকে আলাদা করতে পারলাম না, নিজেকে কেবলইই একটা চেয়ার মনে হল। কম্পিউটারের আলোটা একটা চুরুটের আলোয় রুপ নিল। চুরুটের পেছনে একটা অবয়ব, খুব অস্পষ্ট। কি ওটা খুব পরিচিত লাগছে। কোথায় দেখেছি। হ্যাঁ, রাস্তায় দেখেছি। আরে এটা তো একটা কুকুরের মস্তক। এ কেমন বিকৃত স্বপ্ন!!! সব ধুলোয় মিশে গেল। ঘুম ভেঙ্গে গেছে, ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে অফিসের জন্যে রেডি হয়ে নিলাম। ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে গরম করতে করতে ওভেনের কাঁচে চোখ আটকে গেল। এ কী! এটা আমারই তো চেহারা কিন্তু এত বিকৃত কেন?  দৌড়িয়ে আয়নার কাছে গেলাম, বিধ্বস্ত চেহারা, চোখদুটো লাল এবং ফুলে আছে। অকর্মা ঘুমকে গালি দিতে লাগলাম। অফিসে আজ প্রচণ্ড ব্যস্ততা।  রফিক ভাই আমাকে দেখে বললেন তুমি ঠিক আছ রাফায়েত? এ কী অবস্থা!!!  ভাবলাম তোমাকে প্রিন্টিং প্রেসে পাঠাই, এখানে সবাই প্রচুর বিজি। আরে ভাই কী বলেন আমি একদম ঠিক, অতিরিক্ত ঘুম আরকি। আমি যাচ্ছি। আর হ্যাঁ, রাফায়েত শোন, প্রিন্টিং প্রেসের ঝামেলা চুকিয়ে বিলটা জমা দিয়ে চলে যেও, আজকে আর কাজ নেইগেস্ট আসবে বাইরে থেকে। আচ্ছা ভাই বললাম ঠিকই কিন্তু বাসায় গিয়ে কী করবো আবার সেই  দুঃস্বপ্ন। বিল জমা দেয়া শেষ করে বাইরে বের হলাম। বিকাল ৪.২৫। হঠাৎ আমার সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধু যাকারিয়ার কথা মনে হল, কী ভেবে ওকে ফোন দিলাম।  

 “কীরে দোস্ত, কী খবর? চেম্বারে নাকি?” 

-“না দোস্ত আজকে বাসায়।” 

 “বাসায়?” 

 “হ্যাঁ, জিলকে গতকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।”  

আঙ্কেল-আন্টি দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পর জিলই যাকারিয়ার একমাত্র সঙ্গী। প্রথমদিকে জিলকে পোষ মানাতে অনেক কষ্ট হয়েছে। পরে যাকারিয়াকে ছাড়া থাকতেই চাইত না। 

আই এম সরি, দোস্ত।” 

যাকারিয়া আমাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বলল, তুই বাসায় চলে আয়।”  

চাইছিলাম এটাই। সোজা বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। ব্যাপক আড্ডা হল। এক সময় আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তুই স্বপ্নের ব্যাখা বিশ্বাস করিস?” 

তুই তো জানিস প্যারানরমাল সবকিছুর সায়েন্টিফিক কোন ব্যাখা হয় আছে বা এখন আবিষ্কার হয়নি। তাই বলে কোন জিনিসের আমি অযৌক্তিক ব্যাখা দাঁড় করাতে পারি না। হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?” 

আমি যাকারিয়াকে গত কয়েকদিনের কথা খুলে বললাম। 

 “শোন রাফায়েত, স্বপ্ন হল হ্যালুসিনেশন যেটা ঘুমের বিভিন্ন স্টেজে হয়ে থাকে। স্বপ্নের দৈর্ঘ্য কয়েক সেকেন্ড থেকে ২০-৩০ মিনিট পর্যন্ত হতে পারে। স্বপ্ন দেহের মেটাবোলিজম, ব্লাড প্রেসারব্রেইন ফাংশনেও ভুমিকা রাখে। স্বপ্ন নিয়ন্ত্রিত হয় ব্রেইনের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী পোরশন থেকে। সিগমান্ড ফ্রেউড নামে এক সাইকোলজিস্ট বলেন একজন মানুষ অবচেতন মনে যে অপূর্ণ বাসনা প্রত্যাশা করেন তার পূর্ণটাই হচ্ছে স্বপ্ন অর্থাৎ অপূর্ণ আবেগ-অনুভুতি। আবার আমাদের বাস্তব ঘটনাও এতে প্রভাব ফেলতে পারে। দুশ্চিন্তা, দুর্ঘটনা, অপ্রাপ্তিদুঃসহ অতীত, একাকীত্ব, ভয় ইত্যাদি ডিস্টার্বিং ড্রিম বা নাইটমেয়ার তৈরি করে। স্বাস্থ্যকর খাবার, ব্যায়াম, ধূমপান ত্যাগ, পর্যাপ্ত ঘুম- এ কয়েকটা কাজ ঠিক মত কর।” 

ওকে আর জিজ্ঞেস করার ইচ্ছেই হলো না স্বপ্নটার সম্বন্ধে। বিদায় জানিয়ে বাসায় চলে এলাম। মেজাজ খারাপ করে দিয়েছে যাকারিয়া। রুমের লাইট অফ করে দিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। ইন্টারনেটে সার্চ দিলাম, “মিনিং অফ ড্রিম”। তেমন কিছু পেলাম না। আমার এক বন্ধু বলত মেজাজ খারাপ হলে ঘুমিয়ে পড়তে। বেশিক্ষণ লাগলো না কাজটা করতে। তারপরই মনে হল ক্ষমাহীন ভুল করে ফেলেছি। 

(স্বপ্ন ) 

      আজকে আর চারদিকে অন্ধকার নেই শুধু সাদা আর সাদা। চোখ ধাঁধিয়ে গেল। কিন্তু সেই শুন্যতা ঠিক একই রকম। বুঝে উঠতে পারলাম না ব্যাকগ্রাউন্ডটা হঠাৎ পরিবর্তন হল কেন!!! আস্তে আস্তে চোখ সয়ে এল। মৃদু একটা গলার স্বর শুনতে পেলাম। একটু মনোযোগ দিতেই স্পষ্ট হল শব্দটা, কেউ কোমল স্বরে আমার নাম ধরে ডাকছে। উপেক্ষা করার মত স্বর না এটা, অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে এগিয়ে গেলাম। এটাই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল। শব্দটা আসছে একটা রুম থেকে কিন্তু সবই সাদা রুমের কোন চিহ্ন নেই, তবুও এগিয়ে গেলাম। তারপর যা দেখলাম একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। আমারই আরেকটা প্রতিকৃতি শুয়ে আছে মেঝেতে, তার পাঁচ কোণে ৫টি সাদা  হুড তোলা অবয়ব। আর নিতে পারলাম না, হয়ত স্বপ্নের মাঝেই জ্ঞ্যান হারালাম। যখন উঠলাম সকাল হয়ে গেছে। রাতের ঘটনা মনে করতেই শরীরটা কেঁপে উঠল, শরীরটা খারাপ লাগছে। রফিক ভাইকে ফোন দিয়ে সিক লিভ চাইলাম। রফিক ভাই আমার গলার স্বর শুনেই আর কিছু বললেন না। খুব কষ্টে ওয়াশরুমে গেলাম, আয়নায় তাকাতে নিজেকেই নিজের ভয় হল। চোখ দুটো মনে হয় কোটর থেকে বের হয়ে আসবে, ত্বকে কোন বর্ণ নেই। এ যেন আমি না, অন্য কেউ। বুয়াকে দরজা না খুলেই বিদায় করে দিলাম। ঠিকমত চিন্তা করতে পারছি না। যুক্তি খেলছে না কোন। একদিনে এতটা বদলানো কী সম্ভব। সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। যাকারিয়ার রেফারেন্সে একটা মেডিসিনের ডাক্তারের কাছে রাত আটটায় সিরিয়াল দিলাম। সারাদিন ক্যাফেইনের উপর থাকলাম। ছয়টায় বাস ধরে মহাখালি আসলাম। অবশেষে আমার ডাক আসলো। ডাক্তারের রুমে বসে সমস্যা বলতে গিয়ে মুখ আটকে গেল, কী বলব। তিনিই বলা শুরু করলেন, আনহেলথি ডাইজেশনডিহাইড্রেশনইনসোমনিয়াসিভিয়ার জেনারালাইজড এনজাইটি। আপানার বয়স তো বেশি না, এত দুশ্চিন্তা করবেন না আর নিয়মানুবর্তী হন একটু।” প্রেসক্রিপশনে কিছু ঘুমের ঔষধ, এন্টি-এনজাইটি পিল, স্যালাইন এসব দেখতে পেলাম। ডাক্তার আমার স্বপ্ন আর ঘুমের কথা বিশ্বাসই করলেন না, শুধু অবজ্ঞার চোখে তাকালেন আমার দিকে। 

এন্টি-এনজাইটি পিল কিনে বাসার চলে আসলাম, কফি বানালাম ফ্লাক্স ভর্তি। আমি যেন এক দেশে ঘুম আরেক দেশে। ব্যাপারটা এতটা সহজ হয়নি অনেক চরাই-উতরাই পেরিয়ে মডাফিনিল নামে একটা মেডিসিন ম্যানেজ করতে হয়েছে যেটা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া পাওয়া দুষ্প্রাপ্য। এটা একাধারে ৪০ ঘণ্টা ঘুম উধাও করে দেয় অন্যদিকে মুড সুইং করে। কিন্তু এতে শারীরিক অবস্থা ক্রমশই খারাপ হতে থাকল।  

২ দিন পরের ঘটনা!!!! রফিক ভাই আমাকে জোর করে অফিস থেকে বের করে দিয়ে সিএনজি করে দিলেন আর বললেন সুস্থ হয়ে তারপর অফিসে আসতে তিনি সামলে নিবেন, আমার কোন কথাই শুনলেন না। আমারও এই দুইদিনে দুঃস্বপ্নগুলো একদম সাধারণ মনে হতে লাগলো। তাই ডিনারটা সন্ধ্যায় সেরেই পরিচিত বিছানায় গড়িয়ে দিলাম ক্লান্ত শরীরটাকে।  

(শেষ স্বপ্ন ও রুপান্তর) 

          হঠাৎ চোখ খুলে গেল কিন্তু ঘুম ভাঙল কিনা তা আজীবন আমার কাছে রহস্য হয়ে থাকবে। একটা করিডোরের এক প্রান্তে আমি অন্যপ্রান্তে একটা মৃদু আলোর রেখা কোন একটা রুমের মতো, অথচ মনে হচ্ছে দুইপ্রান্তের মাঝে এক সুদীর্ঘ জলরাশি সমান দুরত্ব।  কিন্তু মনের কোথায় যেন আত্মবিশ্বাসী মনোভাব, আমাকে শেষ প্রান্তে যেতেই হবে। প্রচণ্ড ক্লান্তির মাঝে এক পা  দু পা করে শিশুর মত হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে থাকলাম। নিশ্চুপ, নিরব, নিথর এক পরিবেশ। কেন যেন মনে হল করিডোরের কংক্রিটের দেয়ালগুলো জীবিত, তারা যেন প্রত্যক্ষদর্শী, সুবোধ স্রোতার মতো সব শুনতে পাচ্ছে। হামাগুড়ি দেয়ার ফলে মুখ দিয়ে গোঙানির শব্দ হচ্ছে যা দেয়ালগুলোতে বিকটভাবে প্রতিফলিত হতে শুরু করল। শান্তিময় আবহাওয়ার কেমন তীব্র যন্ত্রণার মতো সংকোচন-প্রসারণ হতে শুরু করল। শরীরের সব শক্তি দিয়ে এগোতে লাগলাম, মনে হচ্ছে ফুসফুস বায়ুশূন্য এক চুপসানো বেলুনে পরিণত হয়েছে। নিচ থেকে দরজাটার পাল্লা ধরে ঠেলা দিলাম। একি এটা তো আমার রুম। চেয়ারে ঘুমন্ত একটা শরীর, একটু খেয়াল করতেই চোখের পাতা পরা বন্ধ হয়ে গেল আমার। এ, একি!!! এটা তো আমি। বিস্ময়ের ধাক্কাটা কেটে যেতেই অমানুষিক একটা ভয় গ্রাস করল আমাকে। আমরা ভয়ের এলিমেন্ট হিসেবে সবসময় অবাস্তব জিনিস কল্পনা করি, কিন্তু সেখানে পরিচিত কিছু যদি এসে পড়ে তাহলে ভয়ের পরিমাণ হয় সীমাহীন। এ মুহূর্তে ঠিক তেমনি একটা আভাস আমার মনের কোনে উঁকি দিচ্ছে। পরিস্থিতিটাকে মনে হচ্ছে আয়নার এদিক ওদিক। হিউম্যান ব্রেইন দ্বিধায় পড়ে গেলে ঠিকমত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তখন এর সাক্সেসের পরিমাণ হয় ৫০-৫০। অর্থাৎ ভুল কিংবা সঠিক দুটোই সমান। চেয়ারে ঘুমন্ত আমাকে আমি স্পর্শ করবো কি করবো না সেটা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন যেন ইচ্ছা করছে। সাত পাঁচ না ভেবে আলতো করে হাতটা ছোঁয়ালাম ওটার কপালে। আস্তে আস্তে দেহটাতে প্রাণের স্পন্দন দেখা গেল। শরীর এতটাই ক্লান্ত যে বসে পড়লাম। ঘরের মৃদু আলোতে দেখলাম দেহটা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। ঘরের মধ্যে হাঁটতে শুরু করল। মুখ দিয়ে অনেক কষ্টে শব্দটা বের করলাম, “তুমি কে?” কোন উত্তর নেই। ওকে দেখে মনে হচ্ছে ও যেন আমাকে দেখতেই পারছে না, আমার কথাও শুনতে পারছে না। শুধু কৌতুহলী বালকের মত এদিক-ওদিক  হাঁটছে আর এটা ওটা ছুঁয়ে দেখছে। দেখে মনে হচ্ছে মাত্র জন্ম নেয়া কোন শিশু। কথাটা মাথায় আসতেই ভয়ংকর একটা ভাবনা মস্তিষ্কে খেলে গেল। নতুন চিন্তা কিন্তু পুরান দেহ নিয়ে আমার সামনেই আরেকজন আমারই মতো হেঁটে বেড়াচ্ছে, কী নির্মম  রুপান্তর! মরিয়া হয়ে অন্য আমিকেই আবার ছুঁতে গেলাম, কি আশ্চর্য তাকে ধরা কিংবা ছোঁয়াই যাচ্ছে না। অনেক চেষ্টার পর হাল ছেঁড়ে দিতে বাধ্য হলাম। কান্না পেতে লাগল কেন যেন। নিজেকে এতটা অসহায় আর কখনো মনে হয়নি, আব্বুআম্মু আর রুনুর কথা মনে পড়ে গেল। আজকের স্বপ্নটা এত বড় কেন? আদৌ কি স্বপ্ন, শেষ আছে কি? নাকি স্থায়িত্ব অনন্তকাল। শেষবারের মতো দ্বিত্বীয় আমিকে ছুঁতে গেলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে ও পেছনে ফিরে তাকাল। মুখে এক চিলতে হাসি, অনেক কান্নার পর মানুষ প্রথম হাসলে যে হাসি চেহারায় দেখা যায় সেই হাসি, কোনদিন না ভোলার মতো প্রাপ্তির হাসি। জিজ্ঞেস করতে গেলাম, “কে তুমি?”, তার আগেই রুমের মৃদু আলোটুকু নিভে গেলো সাথে একটুকরো শব্দ “গুড নাইট”।  

 পাঠকদের জন্য সুখবর!

অনলাইনে ডিজিটাল বাংলা  কমিক্স পড়ুন
ফ্রি-তে!

সদস্য রেজিস্ট্রেশন
close-link