প্রথম দেখায় বাসাটাকে যতটা খারাপ লাগছিল এখন আর ততটা লাগছে না, ঘুম ভেঙে জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখে শুভমিতার এটাই মনে হল। বিছানায় শশাঙ্ক ঘুমিয়ে আছে। শুভমিতা এবার শশাঙ্কের দিকে ফিরে তাকাল। ঘুমালে ওকে একদম ছোট বাবুর মত লাগে। কি সুন্দর হাত পা মুড়ে ঘুমিয়ে আছে। শুভমিতা শশাঙ্কের পাশে বসে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

 

৫ বছরের ভালবাসার পর গত মাসেই বিয়ে হয়েছে শশাঙ্ক আর শুভমিতার। যদিও দুই পরিবার খুব একটা খুশিমনে মেনে নেয় নি কিন্তু ওরা দুজনে ছিল ঘর বাঁধার সংকল্পে দৃঢ়। তাই শুভ কাজটা গত মাসেই হয়ে যায় ভালমত। শশাঙ্ক অবশ্য আগেই একটা চাকরি পেয়ে গেছিল। ফরেস্ট রেঞ্জার। সুন্দরবনের পাকুড়লতা নামের একটা এলাকায় পোস্টিং হয়ে যায়। শশাঙ্ক মজা করে বলেছিল, সবাই তো সুন্দরবনে হানিমুনে যায় আর আমরা যাব থাকতে! হানিমুন তো অলটাইম অন! তো সেই সুন্দরবনে ওরা গতকাল এসে পৌঁছায় এবং রাত ১১টার দিকে এই রেঞ্জার’স কোয়ার্টারে এসে নামে। কোয়ার্টার মানে শুধু একটাই ডুপ্লেক্স বাড়ি। স্ব স্ব এলাকার রেঞ্জারদের থাকার জন্য এ ধরণের সিঙ্গেল কোয়ার্টারের ব্যবস্থা। প্রথম দেখায় শুভমিতার মনে হয়, এ কোথায় এসে পড়লাম! বনের কিছুটা ভেতরে হওয়ায় চারিদিকে গাছ আর গাছ। থেকে থেকে রাতের পশুপাখির ডাক তো আছেই। মোটের ওপর একটা ভুতুড়ে পরিবেশ। তবে সকালের আলোয় রীতিমত দুর্দান্ত লাগছে সবকিছু। এসময় শশাঙ্কের ঘুম ভেঙে যায়,

 

– কিগো এত সকালে উঠে গেছ যে!

– ঘুম ভেঙে গেল। সূর্যের আলো তো একেবারে চোখেমুখে এসে লাগল।

– হম আমি একটু কুঁড়ে মানুষ তো তাই সূর্য মামা এই ভাগ্নেকে আর তুলতে পারে নি!

– হয়েছে মজা করা! এখন উঠে ফ্রেশ হয়ে নাও। নাস্তা করতে হবে তো।

– চলো না আরেকটু ঘুমিয়ে থাকি প্লিজ।

– এই না! দেখো সকাল হয়ে গেছে এখন আর আবদার করো না।

এই বলে শুভমিতা শশাঙ্কের দুষ্টুমি থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যায় নাস্তার জোগাড়ে। শশাঙ্ক চেঁচিয়ে বলে যে নাস্তা কোয়ার্টারের বাবুর্চিই বানিয়ে চলে গেছে হয়তো। শুভমিতা দেখে টেবিলে সত্যিই ঢাকনা দেয়া পরোটা আর ভাজি রাখা আছে। এরপর শশাঙ্ক ফ্রেশ হয়ে আসলে একসাথে খাবার খেয়ে নেয় দুজনে। শশাঙ্ক কাজে বেরিয়ে পড়ে একটু পরেই। কি নাকি গাছ কাটা নিয়ে ঝামেলা তাই ফোন পেয়ে দ্রুতই চলে যায়। শুভমিতাকে সব দরজা আটকে সাবধানে ভালভাবে থাকতে বলে যায়। শশাঙ্ক চলে গেলে শুভমিতা দরজা আটকে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। শশাঙ্ককে হাত নেড়ে বাই জানিয়ে রকিং চেয়ারে সমরেশের ‘কালবেলা’ নিয়ে বসে।

 

বই পড়তে পড়তে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিল শুভমিতার মনে নেই। ঘুম ভাঙল একটা আওয়াজ শুনে। ঠুকঠাক শব্দ আসছে ডাইনিং রুমের ওখান থেকেই। নতুন বাসনকোসন কেনা হয়নি তবে পুরনো কিছু হয়তো আছে। ইঁদুর বা বিড়ালই হয়তো হবে। শুভমিতা বইটা চেয়ারে রেখে সেদিকে এগিয়ে যায়। বাসার আশেপাশে চারিদিকে জঙ্গল তাই দিনের বেলাতেও সারা বাসাই কেমন জানি অন্ধকার হয়ে আছে। লাইটের সুইচ টিপে দেখল কাজ করে না। কোনটাই করছে না। কারেন্ট নেই হয়তো, যাই হোক ডাইনিং রুমটা সামনেই। কিন্তু সেখানে যেতেই আওয়াজটা মিলিয়ে গেল। অবাক লাগে শুভমিতার। শব্দের উৎস জানতে রান্নাঘরে ঢুকতেই বড় একটা বিড়াল শুভমিতার সামনে দিয়ে দৌড়ে পার হয়ে গেল। হঠাৎ দেখায় একটু বেশ ভয় পেয়ে যায় সে। বিড়ালটা ধবধবে সাদা আর বেশ ভালো স্বাস্থ্য। শুধু লেজটা অর্ধেক কাটা। শুভমিতার ভয়ের বদলে তখন একটু একটু হাসিই পেতে থাকে। একেবারে হরর মুভির মত ভাবতে শুরু করেছিল ও। সেখানে ভূতের বদলে দেখা দিলেন বিড়াল মশাই! তাও কালো বিড়াল হলে ভূতুড়ে ব্যাপারটা জমত আর সেখানে ইনি তো রীতিমত ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’র ক্যাট মডেল!! যাহোক এরপর শুভমিতা নিজের ঘরে গিয়ে ঘর গুছিয়ে স্নান করতে গিয়ে দেখে জলও নেই। কেমন লাগে মেজাজটা? ধুর ছাই- এই বলে শুভমিতা বিছানায় গা এলিয়ে দিতে না দিতেই কলিংবেলের শব্দ। দরজা খুলে দেখে শশাঙ্ক এসে পড়েছে। আজকে নাকি একটু আগেই কাজ শেষ হয়েছে আর শুভমিতাকে প্রথমদিন একা রেখে যাওয়াতে একটু চিন্তাও হচ্ছিল। শশাঙ্ক ফ্রেশ হয়ে আসলে দুজনে ডাইনিং টেবিলে বসে দুপুরের খাবার খাওয়া শুরু করে। রান্না সকালেই বাবুর্চি করে দিয়ে গেছে, সেই এসে খাবার বেড়ে দিয়ে একটু দূরে বসে আছে। শশাঙ্ক খেতে খেতে বলতে থাকল-

– তো কেমন লাগছে নতুন সংসার আর বাসা?

– সংসার তো সবে শুরু, আরও কিছুদিন যাক। তবে বাসাটা ভালোই। বারান্দায় খুব সুন্দর লাগে বাসার সামনেটা। তবে কারেন্ট আর জলের খুব সমস্যা বোধহয়, না?

– তাতো হওয়ার কথা না। এইতো আমি স্নান করে এলাম আর কারেন্টও তো আছে!

– কিন্তু তুমি আসার আগে কারেন্ট, জল কিছুই ছিল না। এই দেখো না আমি স্নান না করেই খাচ্ছি।

– এমন তো হতেই পারে না গো। এই কোয়ার্টারের আলাদা জেনারেটর, পানির ডিপ পাম্প আছে। বনের ভেতর বাসা তো এগুলা না থাকলে চলে? বড় সমস্যা না হলে কারেন্ট যাওয়ার কথা না। আর আজকে তো কারেন্টের অফিস থেকেও কিছু বলে নি। কি বল মকবুল?

মকবুল হল বুড়ো বাবুর্চির নাম। কম কথা বলে। কিছুটা গলা খাকারি দিয়ে নিচু গলায় সে বলে,

– দিদি মিথ্যা কয় নাই, স্যার।

– মানে? আরে তোমাকেও কি ভীমরতিতে পেল নাকি! তুমি তো আরও পুরানো লোক।

– পুরানো লোক বইলাই কইতাছি স্যার। উনি ভুল কয় নাই।

 

শশাঙ্ক ব্যাপারটা উড়িয়ে দিলেও শুভমিতার একটু খটকা রয়েই যায়। মকবুল বুড়োর কথায় কেমন যেন কিছু একটা লুকোনো আছে মনে হয়। যাহোক অস্বস্তিকে বাড়তে না দিয়ে স্বাভাবিক কথাবার্তায় খাওয়া শেষ করে শুভমিতা। এরপর একটু জিরিয়ে শশাঙ্ক স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়। একটু দূরেই খুব সুন্দর একটা নদী আছে। গাড়িতে করে সেখানে পৌঁছে দুজনে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের স্পিডবোটে অনেকক্ষণ ঘুরে সন্ধ্যা করেই বাসায় ফেরে। বাসার সামনে গাড়ি থেকে নেমে বারান্দার দিকে তাকাতেই শুভমিতা একটা মেয়েকে দেখতে পেল। লাল শাড়ি পড়া মেয়েটির মুখটা খুব বিষণ্ণ দেখায়। শুভমিতা শশাঙ্ককে বলে-

– এই দেখো বারান্দায় ঐ মেয়েটা কি আমাদের বাসায় কাজ করে নাকি?

– কোথায় মেয়ে?

– আরে ঐ যে বারান্দায় দেখতে পাচ্ছ না? লাল শাড়ি পড়া।

– শুভা, আবার মজা করছ, না? কোথায় মেয়ে? ও আচ্ছা তুমি বুঝি সেই চালাকিটা করছ যে আমাকে একটা মেয়ে দেখিয়ে দেখবে যে আমি তাকাই কিনা? তাকালে আমার ওপর রাগ করবে যে আমি অন্য মেয়ের দিকে তাকাই! কাম অন ইয়ার!

শুভমিতা বুঝতে পারে, যেকোনো কারণেই হোক মেয়েটাকে একমাত্র সেই দেখতে পেয়েছে। অবশ্য সে নিজেও ভুল দেখতে পারে। কিন্তু এতটা কাছে থেকে? শশাঙ্কের তাড়ায় ভাবনা ভেঙে তার সাথে বাসায় ঢোকে শুভমিতা। কিন্তু খটকা থেকেই যায়…

রাতের খাবার রান্না করতে মকবুল চলে এসেছে। তবে শুভমিতার ইচ্ছে হয় নিজেই রান্না করার। তাই সে মকবুলকে আনাজ এগিয়ে দিতে বলে তরকারি ঠিকঠাক করতে করতে গল্প করে,

– আপনি এখানে কতদিন ধরে আছেন মকবুল ভাই?

– এই ধরেন ২০ বছরের উপরে তো হইবই।

– ও। বাসায় কে কে আছে আপনার?

– মা মরা একটা মাইয়াই আছে খালি আমার।

– কোথায় বাসা আপনাদের?

– এইতো সামনের জঙ্গলটা পার হইলেই আমাগো বাসা।

– আচ্ছা। ভালো কথা, এখানে বিড়ালের একটু উপদ্রব আছে, না?

প্রশ্নটা শুনে মকবুল একটু ইতস্তত করে। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলে,

– কেন দিদি? এ…একথা জিজ্ঞেস করলেন কেন?

– আজকে সকালে একটা সাদা বিড়াল…

– লেজটা কাটা?

– হ্যাঁ হ্যাঁ! পোষে নাকি কেউ?

– এখন আর কেউ পোষে না।

– আগে পুষত তাহলে কেউ, না? কে? আজকে বাসায় ঢোকার সময় বারান্দায় লাল শাড়ি পড়া একটা মেয়েকে দেখলাম। চেনেন নাকি? কে জানে তারই পোষা কিনা।

– ইয়ে…দিদি, আমি একটু স্যারের রুম থেকে আসি। যদি তার কিছু লাগে।

স্পষ্ট কথাটাকে এড়িয়ে গেল, মনে মনে ভাবল শুভমিতা। আসলে সমস্যাটা কি এই বুড়োর কে জানে। খালি চেপে চেপে কথা বলে। ভাবতে ভাবতে রান্নাঘরে পা বাড়ায় শুভমিতা। ভাত চাপিয়ে দিয়ে জানালা দিয়ে একটু দূরে তাকাতেই আবারো দেখতে পেল। সেই মেয়েটাই। অন্ধকার হলেও চিনতে ভুল হবার কথা না। জঙ্গলের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। আলুথালু বেশে আঁচল ছেড়ে দিয়ে কোথায় যাচ্ছে মেয়েটা? এই অন্ধকারে জঙ্গলে কত বিপদ হতে পারে। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে তাকাতেই দেখে কোথাও মেয়েটা নেই। না নেই কোথাও। একটা গরম বাতাসের হলকা এসে লাগে শুভমিতার গায়ে। পেছনে ফিরতেই হঠাৎ দেখে শশাঙ্ক সামনে দাঁড়িয়ে,

– আরে শুভা, এই ঠাণ্ডায় বারান্দায় কি করছ?

– কিছু না…গলাটা খুব শুকিয়ে আসে শুভমিতার।

– শরীর খারাপ নাকি গো? দেখি তো। একী? তোমার গায়ে তো অনেক জ্বর।

– না তেমন কিছু……

 

বলতে বলতেই শশাঙ্কর গায়ে ঢলে পড়ে শুভমিতা। তাড়াতাড়ি শুভমিতাকে কোলে তুলে বিছানায় নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেয়। থার্মোমিটারটাই কেনা হয় নি। নিজের ওপর রাগ উঠে শশাঙ্কর। মকবুলকে তাড়াতাড়ি একটু জলপট্টির ব্যবস্থা করতে বলে তাড়াতাড়ি উপজেলার ডাক্তারকে ফোন করে। ভাগ্য ভালো ছিল ডাক্তার কাছেই এক জায়গায় রোগী দেখতে এসেছিলেন। ডাক্তার এসে চেকআপ করে কিছু ওষুধ দিয়ে চলে যায়। তেমন কিছুই না, স্বাভাবিক একটু জ্বর আর স্ট্রেস। শুভমিতার জ্ঞান ফিরলে হালকা কিছুটা খাবার আর ডাক্তারের দিয়ে যাওয়া ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয় শশাঙ্ক। কালই বাকি ওষুধগুলো কিনতে হবে। শুভমিতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে একসময় সেও ঘুমিয়ে পড়ে।

মাঝরাতে হঠাৎ শুভমিতার ঘুম ভেঙে যায় জলের তেষ্টায়। মাথাটা একটু দুর্বল লাগছে। ঘড়িতে চেয়ে দেখে আড়াইটা বাজে। পাশে শশাঙ্ক অঘোরে ঘুমাচ্ছে। বেডসাইড টেবিলে জলের জগটা নেই। ঝামেলায় শশাঙ্ক ভুলে গেছে হয়তো। থাক ওকে আর না ডাকি, অনেক ধকল গেছে ওর ওপর দিয়ে, এই ভেবে কষ্ট করে হলেও শরীর টেনে মেঝেতে পা রাখে শুভমিতা। ডাইনিং রুমে পা রাখতেই একটা চাপা কান্নার শব্দ শুনতে পায়। স্টোররুমের ওদিকটা থেকেই আসছে। দেখতে যাওয়া কি উচিৎ হবে? কিন্তু কেউ তো বিপদেও পড়তে পারে যদিও সে সম্ভাবনা থাকার কথা না। কৌতূহলের কাছে ভয় বরাবরের মতই পরাস্ত। ধীরে ধীরে শব্দটার উৎসের দিকে এগুতে থাকে শুভমিতা। এবারে শব্দটা স্পষ্ট হয়ে আসছে। হ্যাঁ, একটা মেয়েরই কান্নার শব্দ। সাথে কে যেন বেশ জোরে জোরে ধমকাচ্ছে রাগী পুরুষালী গলায়। স্টোররুমের দরজাটা বন্ধ। কোন ভুল নেই শব্দটা ভেতর থেকেই আসছে। দরজার হাতলে হাত রেখে দ্বিধায় পড়ে গেল। ভেতরে কি হতে পারে? আরে যাই হোক ঐতো বেডরুমে তো শশাঙ্ক আছেই। কি আর হবে! কৌতূহল দ্বিতীয়বার জয়ী হওয়ায় আস্তে করে দরজাটা খুলে ভেতরে তাকিয়ে যা দেখতে পেল তা দেখা হয়তো উচিৎ ছিল না শুভমিতার-

 

কালো বদরাগী একটা লোক সেই লাল শাড়ির মেয়েটাকে প্রচণ্ড ধমকাচ্ছে। মেয়েটা সম্ভবত লোকটার স্ত্রী। ভয়ে কুঁকড়ে গেছে একেবারে। মৃদু প্রতিবাদ করতেই পাষণ্ডটা মেয়েটাকে হাতের বেল্ট দিয়ে খুব জোরে একটা আঘাত করল। ব্যাথায় চিৎকার করে উঠল অসহায় মেয়েটা। এরপর মারতেই থাকল, মারতেই থাকল। দানবটার ক্রুদ্ধ গর্জন আর আঘাতে মেয়েটার আর্ত চিৎকার ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। এরপর মেয়েটা দৌড়ে পালাবার চেষ্টা করায় লোকটা মেয়েটাকে ধরে খাটে ছুড়ে ফেলল আর মেয়েটার ওপর চড়ে বসে গলা টিপে ধরল। মেয়েটা প্রাণপণ কাতরাতে থাকল কিন্তু পাষণ্ডটা থামছেই না। শুভমিতাও ঘটনার আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেছে। ওদিকে মেয়েটার শ্বাস বন্ধ হতে হতে এমন সময় হঠাৎ বিছানার পাশে একটা ফুলদানী হাতে পেয়ে সবটুকু শক্তি দিয়ে আঘাত করে লোকটার মাথায়। ব্যাথায় বিছানা থেকে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে লোকটা। আর মেয়েটা উঠে ভাঙা ফুলদানী দিয়েই একের পর এক আঘাত করে চলে পশুটার মাথায় যতক্ষণ না মাথাটা থেতলে যায়। একসময় মেয়েটা থেমে যায়। সেই আলুথালু বেশেই আঁচল ছড়িয়ে দৌড়ে দেয়ালের সাথে মিশে কোথায় যে চলে যায়। শুভমিতার সারা গা জমে গেছে। ফিরে আসবে এমন সময় দেখল থেতলানো মাথা নিয়েই সেই পাষণ্ডটা উঠে দাঁড়িয়েছে। তারই দিকে মুখ করে। ভয়ের একটা শীতল ধারা বয়ে যায় শুভমিতার সারা গায়ে। লোকটা ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। দুই হাত গলা টিপে ধরার ভঙ্গিতে। শুভমিতা বুঝতে পারে পালানো উচিৎ এই বিভীষিকা থেকে, কিন্তু স্নায়ুগুলো সব ভোঁতা হয়ে গেছে ওর। ওর ভেতর থেকে কেউ বলছে, শুভমিতা, পালাও। অনেক বড় বিপদ তোমার। কিন্তু সে নড়তে বা চিৎকারও করতে পারছে না। দানবটা এখন ওর একেবারে কাছে। দুর্গন্ধ পাচ্ছে ঐ পচাগলা মুখ থেকে বেরিয়ে আসা নিঃশ্বাসে। এতটাই কাছে বিভীষিকা। খুব কষ্টে পেছন ফিরতেই পেছন থেকে ঐ দানব ওর ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। ঠিক একইভাবে গলা টিপে ধরে। কিন্তু শুভমিতার আশেপাশে আত্মরক্ষার জন্য কিছুই নেই। চিৎকারের বদলে গলা দিয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ বের হচ্ছে। বুঝতে পারছে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি সে। শুধু থেতলে যাওয়া, রক্ত-মাংস একাকার হওয়া একটা বীভৎস মুখ ওর ওপর। শশাঙ্ককে খুব মনে পড়ল ওর। এরপর আর কিছুই মনে নেই……

 

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে শুয়ে আছে শুভমিতা। প্রচণ্ড শক থেকে কোমায় চলে গেছে সে। ২৪ ঘণ্টাই ডাক্তারদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সেই রাতের পরদিন সকালে শশাঙ্ক স্ত্রীকে পুরনো স্টোররুমের সামনের মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে আবিস্কার করে। কোনোভাবেই জ্ঞান না ফেরায় হাসপাতালেই নিয়ে আসতে হয়। ডাক্তাররা বলেছে ম্যাসিভ শক পেয়েছে শুভমিতা। কিন্তু শশাঙ্ক ভেবে পায় না এমনটা কীভাবে হল। বেডে নিশ্চল শুয়ে থাকা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে খুব কষ্ট হতে থাকে তার। এমন সময় কাঁধে কার যেন ছোঁয়া…

– স্যার, দিদি কেমন আছেন?

– ও, মকবুল…ভালো নেই। এখনো কোন সাড়া নেই। এভাবে কতদিন থাকতে হবে কে জানে।

– আমি খুবই দুঃখিত স্যার। এইটা আমার ভুলের জন্যই হইছে।

– তা কেন হবে। এক্সিডেন্ট তো  এক্সিডেন্টই।

– না স্যার। এক্সিডেন্ট না। এরকম ঘটনা আগেও হইছে। আমারই উচিৎ আছিল দিদিরে সব বুঝায়ে কওয়া। কই নাই ভাবছি যে আপনেরা নতুন আইছেন। ভয় পাইতে পারেন…

– কী বলছ যা-তা? কী বলতে তুমি?

 

এরপর মকবুল একটানা বলে যায় আর শশাঙ্ক স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সব শুনে যায়। অনেক বছর আগে এই রেস্ট হাউজে এক রেঞ্জার এসেছিল। তখন এই মকবুলই বাবুর্চি ছিল। একদিন মকবুল অসুস্থ থাকায় তার মেয়ে ময়না তার সাথে আসে রান্নায় সাহায্য করার জন্য। মেয়েটিকে দেখে রেঞ্জারের নাকি পছন্দ হয়ে যায় এবং বিয়ের প্রস্তাবও দিয়ে বসে মকবুলকে। এত ভালো প্রস্তাবে রাজি না হয়ে পারে না সে। সামর্থ্যের সবটুকু দিয়েই মেয়েকে বিয়ে দেয়। কিন্তু বিয়ের পর সেই রেঞ্জারের আসল চেহারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আসলে নারীমাংসলোভী একটা হায়েনা। বিয়ের রাত থেকেই ফুলের মত কোমল ময়নার শরীর আর মনকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে থাকে লোকটা। এমনকি বিয়ের মাত্র তৃতীয় দিনেই নাকি গায়ে হাতও তোলে। মকবুল প্রতিবাদ করলে তাকেও ছোটলোক বলে অপমান করে। এক রাতে নাকি সেই পাষণ্ড লোকটা তার বাবার নামে গালমন্দ করছিল। ক্ষীণ প্রতিবাদ করায় ময়নাকে অমানুষিক নির্যাতন করে সে। আর পরের ঘটনা হুবহু মিলে যায় যা শুভমিতা দেখেছিল। যদিও সেকথা শুভমিতা বলে যেতে পারে নি। তার আগেই চলে গেছে সে কোমায়। অনেকক্ষণ একটানা বলে এবার কেঁদেই ফেলে বুড়ো মকবুল। বোঝাই যায় কী বড় কষ্টই না চাপা দিয়ে রাখে মানুষটা।

– জানেন স্যার? মেয়েটা আমার কুথায় যে হাওয়ায় মিলাই গেল কেউ জানে না। কিন্তু অনেকে তারে এখনো দেখতে পায়। যেমন দিদি দেখেছিল। খুব সুন্দর আছিল মেয়েটা আমার জানেন? খুব ভালো মন। বনের পশুরেও ভালবাসত মানুষের মত। এর লেগাই নানান পশুর রুপেও মাইয়াটা আমার ঘুইরা বেড়ায়। বাপ হয়ে আর দেখতে পারি না স্যার…

 

সান্ত্বনা দেবার ভাষা খুঁজে পায় না শশাঙ্ক। বুঝতে পারছে প্রিয়জন হারানোর বেদনা কতটা তীব্র হতে পারে। কথা শেষ করে মকবুল চলে যায় রেস্ট হাউজে। রান্না বাকি আছে তার। যদিও শশাঙ্ক বলে সে খাবে না, তবুও মকবুল জোর করেই বলে খেয়ে আসার জন্য। শশাঙ্ক দুঃখী মানুষটার অনুরোধ ফেলতে পারে না। মকবুল চলে যেতে না যেতেই বড়বাবুর কল আসে শশাঙ্কর নাম্বারে…

– হ্যালো, স্যার?

– হ্যাঁ শশাঙ্ক, কী খবর তোমার মিসেসের? এখন কেমন আছে?

– একইরকম আছে স্যার। কোমায় যেমনটা হয়।

– আই এম রিয়েলি সরি। তুমি এখানে আসার পরপরেই তোমার সাথে এমনটা হল। কী হয়েছিল?

– না স্যার আপনার তো এখানে কিছু করার নেই। আর কী হয়েছিল সেটা তো ওই বলতে পারবে।

– আই সি। তবে তোমাদের রান্নাবান্নার ব্যবস্থাটা করে দিতে না পারার জন্য আমাকে সরি বলতেই হবে।

– কেন স্যার, মকবুল?

– হ্যাঁ মকবুলের কথা জেনেছ নাকি? খুব ভালো বাবুর্চি ছিল জানো। ও থাকলে তো চিন্তাই ছিল না। তবু আমি আজই একজনকে পাঠিয়ে দিব।

শশাঙ্কর কেমন ঘোরের মত লাগে। সে শুধু প্রশ্ন করে,

– ‘ছিল’ মানে স্যার?

– হ্যাঁ ছিলই তো। একমাত্র মেয়েটা তো আগের স্বামীটাকে খুন করে নিরুদ্দেশ হবার পর বুড়ো গলায় দড়ি দিল। তোমার আগের রেঞ্জারই ছিল সেই স্বামী আর খুব পাষণ্ড ছিল নাকি। খুব প্যাথেটিক ব্যাপারটা, না?

উত্তর দেবার মত ভাষা জানা নেই শশাঙ্কর। ও জানে ও এখন রেস্ট হাউজে গেলে দেখবে মকবুল ভাত তরকারি সাজিয়ে অপেক্ষা করছে। আর একটা লাল শাড়ির আঁচল দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা বাড়িটাতে…..চাপা কষ্টের ছায়ামূর্তি……………

 পাঠকদের জন্য সুখবর!

অনলাইনে ডিজিটাল বাংলা  কমিক্স পড়ুন
ফ্রি-তে!

সদস্য রেজিস্ট্রেশন
close-link