ইয়ামার আজমী (ইভান) 

১. 

নতুন রোগীকে নিজের চেম্বারে পাঠানোর আগে একবার তার রুমটা চেক করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন মনোরোগবিশেষজ্ঞ জাহিদুল হক। 

আজ এসাইলামে নতুন যে রোগীটি এসেছেতার হিস্ট্রিটা বড্ড আঁধার। একে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিলতবে তার আগে তাকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা যায় কিনা তা-ই দেখার জন্য একে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। রোগী অন্যসবার সাথে ডাইনিং রুমে আছে। তাই এই ফাঁকে তার সেলটা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন জাহিদ সাহেব। রোগীর ঘরটা দেখে বেশ চমকে গেলেন তিনি। শুধু তিনি নাযে কেউই চমকে যাবে। রোগীর সেলের দেয়ালে কয়েকদিন আগেই রং করা হয়েছিলতাই দেয়ালের পেইন্টটা নরম হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। রোগী সম্ভবত নিজের নখ দিয়ে আঁচড়ে আঁচড়ে দেয়ালে এসব অদ্ভুতঅন্তরে কাঁপন ধরানো চিহ্ন এঁকেছে। দেয়ালে কোথাও একটা পেন্টাগ্র‍্যাম আঁকাকোথাও উল্টো করা ক্রুশ চিহ্নকোথাও ছাগলের মাথা – এসব আঁকা। মাঝখানে বড় করে লেখা একটা কথা। 

ও আমাকে ছাড়বে না 

ঘরে যেন ব্ল্যাক ম্যাজিক করা হয়েছে। 

এই রোগীর অবস্থা বেশ সিরিয়াস। খামোখাই ওকে এখানে আনা হয়নি। 

অবশ্য এই অ্যাসাইলামে আসার পরে রোগী তেমন কোনরকম ভায়োলেন্স দেখায় নি। তবে রুটিন হিসেবে আগে তাই এর স্টেটমেন্ট নেয়া দরকার। একটা নিঃশ্বাস ফেলে সেলের সামনে দাঁড়ানো রক্ষীদুজনকে জাহিদ সাহেব নির্দেশ দিলেনরোগীকে তার চেম্বারে পাঠানোর জন্য। 

 

২. 

রোগীর নাম লোকমান। হাসপাতালে দেয়া নামধামের লিস্টে বলা হয়েছেতার বয়স ২৪। ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ে। রোগীর পরিচয় বলতে এটুকুই কাজে আসবে। 

আগে বলে রাখা কথা অনুযায়ীরক্ষীদুজন খানিক বাদে শক্ত হাতে লোকমানকে ধরে এনে জাহিদ সাহেবের চেম্বারে নিয়ে এল। ডাক্তারের সামনের চেয়ারে তাকে বসিয়ে খানিকটা পেছনে সরল তারা। লোকমানের চেহারা অত্যন্ত বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। চোখের নিচে পুরু কালির স্তরঘুমের সমস্যার চিহ্ন। খানিকক্ষণ কেউ কোনো কথা বললেন নারুমের ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করল তাই। জাহিদ সাহেব প্রথমে লোকমানকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। লোকমানও বেশ বিব্রত ভঙ্গিতে তার চেয়ারে বসে আছেযেন খুবই লজ্জিতআবার খুবই ভীত। দৃষ্টি নিজের হাতের আঙুলের দিকেযেন কোন শিক্ষক অপরাধ-করা ছাত্রকে তার সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন কৈফিয়তের আশায়। লোকমানের মাথার চুল এ কদিনেই বেশ উসকোখুসকো হয়ে উঠেছে। গুমোট নীরবতা ভাঙলেন ডাক্তার নিজেই। 

– তো লোকমান? 

লোকমান অস্বস্তি নিয়ে নড়েচড়ে বসল। ডাক্তার কথা আগাতে থাকলেন। 

– দেখোতোমাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে যে কারণেতা খুবই গুরুতর। তুমি যে হলে থাকতে সেখানে তোমার সাথে আরো চারজন ছিল। তোমারই চার বন্ধু। তামীমরঞ্জুজয়ন্ত আর হামিদ – এই নামের চারজন। তোমরা বেশ ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিলে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে এদের কারো মিস্টিরিয়াস ডেথকারো মার্ডার হয়েছে। কেউ পয়জনিংকাউকে মাল্টিপল স্ট্যাবিংকাউকে ইলেক্ট্রোকিউট করে মেরে ফেলা হয়েছে। একজন মারা গেছে কার্ডিয়াক এরেস্টেতার মৃত্যুও অস্বাভাবিক বলে সন্দেহ করছে অনেকে। এদের ওপরে কারো কোনো আক্রোশ ছিল নাতাই অন্যকোন সাসপেক্টও নেই। এ কেসে একমাত্র সাসপেক্ট তুমি। এদের সবার সাথে তোমার ওঠাবসা ছিল৷ তুমিই একমাত্র যে সারভাইভ করেছবেঁচে আছ। সাসপিশানটা তাই হয়েছে। চারজনের মৃত্যু তোমার হাতে হয়েছে – এই সবার মত। সিরিয়াল কিলারের ছাপ লেগে গেছে তোমার ওপরে। বুঝতে পারছ কি বলছি আমি? 

লোকমান কোন কথা বলল না। সে স্থির হয়েই রইল। জাহিদ সাহেব বলতে লাগলেন। 

– কিন্তু শুরুতেই তোমাকে পুলিশ কাস্টোডিতে নেয়নি। তোমার মেন্টাল স্ট্যাবিলিটির ইস্যু বিবেচনা করে তারা তোমাকে আগে এই হসপিটালে এনেছে। কাজেই তোমাকে সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আমাদের ওপরে। তাই সবার আগেতোমার স্টেটমেন্টটা দরকার আমার। তুমি আমাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব খুলে বলবে। 

লোকমান অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল জাহিদ সাহেবের দিকে। চেঁচিয়ে উঠলসে। 

– আমি ওদেরকে মারিনিকতবার বলতে হবে আমাকে এ কথা? 

– তাহলে তুমি ওদের মারোনি বলছতাহলে কে মেরেছে? 

– সে কথা তো কতবার বলেছি। কেউ আমাকে বিশ্বাস করেছে? 

– আমাকে বল। কে মেরেছে? 

– কে আর মারবেসেই ডার্ক এন্টিটি। 

– হোয়াটডার্ক এন্টিটিমানে কিআচ্ছাদাঁড়াও। আমি তোমার সব কথা শুনবরেগে যেও না। দেখতুমি আমাকে গোড়া থেকে সবটা খুলে না বললে আমি বুঝব কিভাবেআর তোমাকে কিভাবেই বা হেল্প করব? 

একটু শান্ত হয় লোকমান। নিচু স্বরে বলল, 

– পানি খাব। 

নিজের পানির গ্লাসটা ওর দিকে এগিয়ে দিলেন তিনি। একনিঃশ্বাসে 

পুরোটা শেষ করল সে। মুখ মুছে নিশ্চুপ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপরে বলল, “আমি একা কথা বলতে চাই 

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন জাহিদ। মাথা নেড়ে রক্ষীদুজনকে বেরিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন তিনি। প্রথমে ইতস্তত করল তারা। পরে বেরিয়ে গেল। 

– আচ্ছাএখন আমাকে বল। 

খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলতে থাকে জাহিদ। 

৩. 

ঘটনা শুরু হয়েছে বেশ কয়েক সপ্তাহ আগেএক বৃহস্পতিবারে। আমাদের মাঝে তামীমের বই পড়ার নেশাটা বড্ড বেশি। ভার্সিটির পড়া বাদ দিয়ে বাকিটা সময়ে নীলক্ষেতে পড়ে থাকে। হরেক রকম বই পড়েসব ধরণেরই সাবজেক্ট। কোন নির্দিষ্ট বাছবিচার করে পড়ে না। একদিন নীলক্ষেতে সে একটা পুরোনো বই খুঁজে পেল। বইটা অসম্ভব পুরোনোকালো চামড়ায় বাঁধানো। চামড়ার কাভারটা বয়সের কারণে নরম হয়ে গেছে। ভেতরের পাতাও নরম ও বাদামী হয়ে গিয়েছে। বইটা ব্ল্যাক ম্যাজিক ও স্যাটান ওঅরশিপের নানান রিচুয়ালে ভর্তি। বইটা নিয়ে চলে এল সেআমাকে দেখাল। তো সেই বৃহস্পতিবারে সে ঠিক করে ফেললবইটা থেকে লব্ধ জ্ঞান (!) সে একটু পরীক্ষা করে দেখবে। কীভাবেএকটা ছোটখাট রিচুয়াল আয়োজন করে। জিনিসটাকে আমরা দুজনে প্রথমদিকে মজা হিসেবেই নিয়েছি। জয়ন্ত আর হামিদকে দলে টানতে বেশি কষ্ট হয়নি। কিন্তু রঞ্জুটা ছিল বরাবরই ভীতু স্বভাবেরসে কিছুতেই রাজি হলো না। বলল ওসব পাপের কাজ সে করবে না। সে সময়ে এত এক্সাইটেড ছিলাম আমরাপ্রায় অনেকটাই ধমকেই রঞ্জুকে নিমরাজি হতে বাধ্য করলাম। সে অবশেষে রাজি হলো। 

সে রাতে বেশ বৃষ্টি হচ্ছিল। তামীম একটা সাদা চক দিয়ে হলের মেঝেতে একটা পেন্টাগ্র‍্যাম আঁকেতারপর পেন্টাগ্র‍্যামের চারপাশে একটা বৃত্ত দিয়ে ঘিরে দিয়ে কিছু হিব্রু ভাষার অক্ষর লিখে দিল। কাজ শেষ হলে সে আমাদের বলল, 

– এবারে যেটা বলি শোন। তোরা চারজন বৃত্তের চারদিক ঘিরে বসবি। পেন্টাগ্র‍্যামের পাঁচটা মাথায় জ্বালানো থাকবে পাঁচটা মোমবাতি। তোরা চারটা ঘিরে বসে নিজেদের এক হাত দিয়ে অন্যজনের এক হাত ধরে একটা চক্র করবি। আমি বসব পেন্টাগ্র‍্যামের ঠিক মাঝখানটায়কারণ আমিই হব মিডিয়াম। 

– আচ্ছামিডিয়াম কী? 

– মানে হচ্ছে কোন আত্মা যদি ভর করে সে আমার দেহে ভর করে যোগাযোগ করবে। তবে সমস্যা নেই পেন্টাগ্র‍্যামের চারপাশে আমি এমন কিছু মন্ত্র লিখে দিয়েছিপেন্টাগ্র‍্যামের বাইরে এই সত্তার কোন ক্ষমতা থাকবে না। 

রঞ্জুটা বলল, “ভাই বাদ দে না এসব। কী দরকার?” তাকে যথারীতি আরেক দফা ধমকে ঠান্ডা করা হলো। 

যাইহোকএরপরে সবাই নিজ নিজ জায়গায় বসে গেলাম আমরা। তারপরে তামীম আগেভাগে যেভাবে বলে দিয়েছিলসেভাবে একটা চক্র করা হলো। এরপরে আমি চোখ বন্ধ করে মন্ত্র জপতে শুরু করি। 

– হে বিদেহী আত্মাতুমি যদি এখানে থাকোতবে মোদের দেখা দাও। আমরা তোমার কথা শুনতে চাই। হে বিদেহী আত্মা। 

ঘরটা নিশ্চুপ। বাইরে ঝোড়ো বাতাসের আওয়াজহালকা বৃষ্টির ঝাঁট জানালার কাঁচে আঘাত করছে। আমি আবার সেই কথাগুলোর রিপিট করলাম। এরপরে তামীমের দেয়া একটা হিব্রু মন্ত্রের বাংলা উচ্চারণটা আগে থেকে মুখস্থ করে রেখেছিলামসেটা পড়তে শুরু করি। 

כישוף חסר משמעות 

মন্ত্রের অর্থ জানা নেইতামীম বলেছিল এটা পড়তে হবে। তাই পড়া। পড়ে যেতে থাকলাম । তবু কোন শব্দ নেই। ঘরে শুধু একটা বোটকা গন্ধ। একপর্যায়ে চোখ খুললাম। এই রিচুয়ালটা বোগাসকাজ করবে না – ধরেই নিয়েছি। তখনই আমার মনে হলো আমার হৃৎপিণ্ডটা থেমে গেছে। 

পেন্টাগ্র্যামের ভেতরে তামীমকে দেখে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। 

তামীমের মাথা নিচুথুতনিটা বুকের সাথে স্পর্শ করে আছে। সে ঐঅবস্থায় চোখ খুলে আমারই দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের শ্বেতমন্ডলটা জ্বলন্ত কয়লার রঙ ধারণ করেছেমণিটা গোল নেইলম্বাটে হয়ে গেছে। মুখ একটু হাঁ করা তারতাতে স্পষ্ট দেখলাম আমিদুটো শ্বদন্ত। মুখ থেকে তার হিংস্র বাঘের গর্জনের মত ঘড়ঘড়ে শব্দ হচ্ছে। হাত ছেড়ে চক্র ভেঙে দিয়ে ছিটকে সরে গেলাম আমি। দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে চিৎকার করতে থাকলাম, “হায় খোদা! খোদা! 

সবাই চোখ খুলে ফেলেছে। তামীমকে দেখে সবাই দূরে সরে গেল। তামীম 

হিংস্রভাবে নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে অদ্ভুত সব শব্দ করছে। ওর ছায়া দেখে আমি থমকে গেলাম। মোমবাতির নাচতে থাকা শিখার আলোতে ওর ছায়াটা হতবিহ্বল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তামীমের ছায়াটা মানুষের ছিল না। একটা অদ্ভুত জন্তুর ছায়া দেখতে পেলাম আমি। জন্তুর মাথাটা মানুষের মত নয়যেন একটা লোমশ ছাগলের মত। ছায়ার মাথা থেকে বেরিয়ে এসেছে বিরাটাকৃতির দুটো শিং। লম্বারোমশ হাতের আঙুলে বড়ধারালো নখ। জন্তু (-র ছায়া) টা গর্জন করে চলছে যেন। এই ছায়াটা আমি চিনি। ব্ল্যাক ম্যাজিকের সেই বইটায় এর ছবি আমি দেখেছি। ব্যাফোমেটের অবয়ব এটা। 

কত নামেই এর পরিচয়। লুসিফারবেলজিবাবইফরীত……… 

হায় খোদা! কি হতে যাচ্ছে আমাদের? 

৪. 

লোকমান আরেক গ্লাস পানি খেল। ডাক্তার সাহেব ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। 

– তুমি বলছ তোমাদের ব্ল্যাক ম্যাজিকে একটা বিদেহী আত্মা নয়বরং কোন অশুভ সত্ত্বার উদ্ভব হয়েছিল? 

লোকমান হ্যাঁ-সূচকভাবে মাথা নাড়ল। 

– আচ্ছাএরপর কি হলো বলো। 

লোকমান আবার শুরু করল। 

*** 

কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। 

তামীমের এই অবস্থা হবে আমরা আগেভাগে বুঝতে পারিনি। ব্যাফোমেট ধরণের কিছু যে চলে আসতে পারে আমরা বুঝিনি। তখন আচমকাই ঘটনাটা ঘটল। তামীম একটা ক্ষুধার্তহিংস্র বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমরা আরো দূরে সরে গেলাম। তবে তামীমের সাথে এর পরে যা ঘটলো তা চমকে দেবার মতো। সে আচমকা পেন্টাগ্রামের কিনারায় এসে যেন একটা অদৃশ্য দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেল। কিছুতেই পেন্টাগ্র্যামের বাইরে সে আসতে পারল না। তখনই মনে পড়ল যে তামীম বলেছিলসে পেন্টাগ্র্যামের বাইরে কী যেন একটা মন্ত্র লিখে দিয়েছিলযাতে করে কোন আত্মা পেন্টাগ্র্যামের বাইরে কোন ক্ষতিসাধন করতে পারবে না। 

তখনই নিজেদের নিরাপদ মনে হলো। রঞ্জু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, 

– আগেই বলেছিলামএই কাজ করিস না। এখন দেখ। তামীমটা ওরকম কেন করছে? 

– কী করবি এখন? (চোখ বড় করে বলল জয়ন্ত) 

– ভাইজানালাটা খুলে দে তাড়াতাড়ি। ঘরের বাতাস বদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। (হামিদের গলা) 

দৌড়ে গিয়ে জানালাটা খুলে দেয় রঞ্জু। বাইরে থেকে আসা বাতাসের ঝাপটায় পেন্টাগ্র্যামের ওপরে জ্বলতে থাকা মোমবাতিগুলো নিভে গেল। তখনই তামীম আরেকদফা চিৎকার শুরু করে। বিজাতীয়দুর্বোধ্য এক ভাষায় কী বলে চলেছে সে। গলার কণ্ঠও বদলে গেছে। তামীমের গলার রগগুলোকে চামড়ার ওপরে ফুটে উঠতে দেখলাম আমি। এক পর্যায়ে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিল সে। 

তখুনি দেখতে পেলাম ছায়াটা আচমকা সরে যেতে শুরু করেছে। একপর্যায়ে সেটা উধাও হয়ে গেল। 

তামীমের কপাল ঘেমে গেছেচোখ তার বুজে আসতে শুরু করেছে। টলতে টলতে পেন্টাগ্র্যামের বাইরে এসে পড়ল সে। আমরা চিৎকার দিয়ে সরে গেলাম। তামীম বলল, 

– আমি…আমি ঠিক হয়ে গেছি। তো…তোরা তাড়াতাড়ি পেন্টাগ্র্যামটা মুছে দে। নয়ত আবার ঝামেলা হবে। 

রঞ্জু একটা বিছানার চাদর এনে চকের দাগ মুছে দিল মেঝে থেকে। 

তামীমকে ধরে একটা বিছানায় বসিয়ে দিলাম। 

– ভাইকী হলো এসব? 

– জানি না। (তামীম ধীরে ধীরে বলল) সম্ভবত রিচুয়ালে কোন গণ্ডগোল করে ফেলেছি আমরা। কোন সাধারণ আত্মা আসেনিএসেছে একটা ডার্ক এন্টিটি। 

– মা…মা…মানেজ্বীন টাইপের কিছু? 

তামীম শুধু মাথা নাড়ে। 

– কিন্তু যদি এটা আমাদের ক্ষতি করে? 

– এই এন্টিটি পেন্টাগ্র্যামের বাইরে ক্ষমতা রাখে নাসেরকম ব্যবস্থাই করেছি। একে আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে হলে একটা পেন্টাগ্র্যাম তৈরি করে দিতে হবে। আমরা পেন্টাগ্র্যামটা ইতোমধ্যেই মুছে দিয়েছি। 

– কিন্তু আমরা যে এ কাজটা করলামতুই জানিস কতটা আতংকের মধ্যে আমাদের যেতে হয়েছে? 

পরের কয়েকদিন নিশ্চুপে-নির্বিঘ্নে কাটল। 

কোনরকম অস্বাভাবিক কিছু নজরে আসেনি আমাদের। ইনসিডেন্টটা আস্তে 

আস্তে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলাম আমরা। কিন্তু ভাগ্য সহায় হলো না। প্রায় এক সপ্তাহ 

পরে ঘটনাটা ঘটল। খাওয়াদাওয়া শেষ করে হলে ফিরছিলাম আমরা। জয়ন্তটা আমাদের সাথে যায়নিসে ঘরেই ছিল। তার ক্ষুধা ছিল নাপ্লাস কিছু জরুরি কাজ সারার ছিল তার। হলে ফিরে যখন ঘরে ঢুকলামআমরা চারজনে থমকে গেলাম। পরমুহূর্তেই বমির ধাক্কা এসে উঠল গলার কাছে। জয়ন্ত…নানাজয়ন্তের লাশ বিছানায় পড়ে আছে। ওর সমস্ত শরীর রক্তে ভেজাঅসংখ্যবার ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে ওকে। তারপরে ছুরিটা ওর গলায় গেঁথে দেয়া হয়েছে। চোখদুটো যেন কোটর ছেড়ে ছিটকে বেরিয়ে আসবে ওর। বিছানার মাথার কাছটায় দেয়ালে বড় করে আঁকা একটা উলটো ক্রুশতার নিচে কালো রঙ স্প্রে করে লেখা, 

SACRIFICE FOR OUR LORD 

রঞ্জু অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। তামীম তোতলাতে থাকে। 

এটা কী করে সম্ভবকোনো পেন্টাগ্র্যাম……” আচমকা সে জয়ন্তের বিছানার কাছে দৌড়ে গেল। আশপাশে হন্তদন্ত হয়ে কী যেন খুঁজতে লাগল সে। একপর্যায়ে চাদর উঠিয়ে বিছানার নিচে তাকালো সে। তার হাতদুটো কাঁপতে থাকে। ভেতরে এসে লাশটাকে উপেক্ষা করে আমরাও উঁকি দেইতারপরে চমকে পেছনে সরে আসি। 

বিছানার নিচে বড় করে একটা পেন্টাগ্র্যাম আঁকা। 

*** 

দুদিনের মাথায় হামিদ আর রঞ্জুও মারা গেল। 

জয়ন্তের মৃত্যু নিয়ে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল আমাদের। একপর্যায়ে ছাড়া পেলাম যখন প্রমাণ করতে পারলাম যে জয়ন্তের মৃত্যুতে আমাদের হাত ছিল না। যেসময়ে সে মারা যায়আমরা খেতে গিয়েছিলাম। খবরের কাগজেও এ বিষয়টা এসেছিল। অনেক কষ্টে ঝামেলা যাওয়ার পরে যখন এলামতখনই এরা দুজন মারা গেল। সেদিন সকালে হামিদ খাওয়া শেষ হলে বলল ওর ভালো লাগছিল না। আমিরঞ্জু আর তামীম একটু উদ্বিগ্ন হলাম। কারণটা বোঝাই যায়। হামিদ বলল, 

– নাতেমন কিছু নয়। আসলে জয়ন্তের ইয়েটার পর……থেকেই এমন লাগছে। খেতে বিশেষ রুচি নেই। আমি গিয়ে বরং শুয়ে থাকি। 

হামিদ চলে গেল। আমরাও খাওয়া শেষে ক্লাসে যাবতাই রেডি হতে হলে ফিরে গেলাম। জয়ন্তের মৃত্যুর পরে আমরা অন্য হলে শিফট হয়েছিসেখানেই গেলাম। হামিদ ওর বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে ছিল। রঞ্জু জিজ্ঞাসা করলো, 

– এই হামিদঠিক আছিস তো? 

হামিদ জবাব দেয় না। রঞ্জু আবার জিজ্ঞাসা করল। হামিদ নড়লও না। এবারে গিয়ে ওকে ঠেলা দিল সে। পরমুহূর্তেই সে মুখে হাত দিয়ে পিছিয়ে এল। 

– মাই গড। 

হামিদের মুখে ফেনা জমে গেছেচোখ উলটে গেছে। বিষক্রিয়ার লক্ষণ। তামীম বলল, “হায় খোদা! আবার?” সে ভাল করে আশপাশ দেখলতন্নতন্ন করে খুঁজল। তবে এবারে কোন পেন্টাগ্র্যাম পাওয়া গেল না। জলদি হামিদের পালস দেখল তামীম। তারপরে সে বলল, “জলদিএম্বুলেন্স। ওকে হসপিটালাইজ করা লাগবে   

*** 

হামিদকে এম্বুলেন্সে তুলে দেয়া হলোসেদিন আমাদেরও আর যাওয়া হলো না ক্লাসে। এম্বুলেন্সে ওর সাথে রঞ্জুটাও চলে গেল। ডাক্তার বলেছিলেনহামিদের ফুড পয়জনিং হয়েছেতবে ডাক্তাররা ওকে ঠিক করতে পেরেছেন। 

সন্ধ্যা নাগাত ওদের দেখতে গেলাম আমরা। পথে তামীমকে ধরলাম আমি। 

– এগুলি কী হচ্ছে ভাইতুই যদি সেদিন এসব না করতি 

– হামিদের ফুড পয়জনিং হয়েছেযেহেতু পেন্টাগ্র্যাম পাইনিকাজেই ওর ভয় নেই। কিন্তু জয়ন্তের বিষয়টা…? কে করল এই কাজপেন্টাগ্র্যাম এঁকে সেই এন্টিটিকে সুযোগ করে দেয়ার কাজটা কে করল? 

হাসপাতালে আসার পরে ডাক্তারের সাথে দেখা করলাম। ডাক্তার হাসিখুশি মানুষআমাদের দেখে হেসে বললেন, 

– রাইট টাইমে নিয়ে এসেছিলেন ওকে। আমরা ওকে সারিয়ে তুলতে পেরেছি। আপনাদের বন্ধু রঞ্জু সবসময়ে ওনার সাথেই ছিলেনজ্ঞান ফেরার পরে খেয়াল রেখেছেন তিনি। চলুনদেখা করবেন। 

ডাক্তার পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন। লম্বা করিডোর পেরিয়ে একটা ঘরের সামনে এলাম। দরজা খুলে ভেতরে গেলাম আমরা। তারপরে আরেকটা ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে হলো আমাদের। 

ঘরের পর্দা টেনে দেয়া। দেয়ালে বড় করে সেই আগের মতোই কালো রঙ স্প্রে করে লেখা 

 

FOR OUR LORD, THE DARK ONE 

 

হামিদ ওর বিছানায় চোখ খোলা অবস্থায়ই নিথর হয়ে পড়ে আছেকোন নড়চড় নেই। শরীরটা পুরো নীল হয়ে গেছে ওর। মুখ থেকে সেই আগের মত ফেনা ঝরছে। “ও মাই গড”, ডাক্তার সাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন। 

হামিদের বিছানার নিচে আঁকা একটা পেন্টাগ্র্যাম পাওয়া গেল। 

মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল তামীম। “কী হচ্ছে এসব?” 

 

রঞ্জুটা কোথায় গেল?” কাঁপতে কাঁপতে বললাম আমি। “তাই তোও কোথায় গেল?” রঞ্জুর খোঁজ শুরু হলো। বাথরুমের ভেতরে পাওয়া গেল ওর লাশটাও। বাথরুমের মেঝে পানিতে টইটম্বুরতার মাঝে পড়ে আছে সে। ওর নাকের ফুটোর মধ্যে দুটো খোলা তার ভরে দেয়া হয়েছে। তারের অপর মাথা কারেন্টের সাথে যুক্ত। ইলেক্ট্রোকিউট করে মেরে ফেলেছে ওকেও। চোখদুটো গলে গেছে ওর। “ ও মাই গড 

দেয়ালের সাথে বিধ্বস্ত ভঙ্গিতে হেলান দিলেন ডাক্তার।   

 

*** 

একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল লোকমান। “এই হচ্ছে কাহিনিডাক্তার সাহেব। সেদিন তামীমও হাসপাতাল থেকে রাতের আঁধারে বেরিয়ে চলে গেলআমি আর ওর খোঁজ পাইনি। অনেকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছিওর পাত্তা মেলেনি। সেও মারা গেছে?” 

জাহিদ সাহেব মাথা নাড়লেন, “হুম 

নিশ্চুপ হয়ে রইলেন দুজনে। “আমার মনে হচ্ছে এবারে আমি বুঝতে পারছি আসলে কী হয়েছে 

লোকমান মাথা নাড়ল, “কেউই বুঝবে নাডাক্তার সাহেব। আমারো ঐ একই পরিণতিই হবেস্যার। লুসিফার-ব্যাফোমেট-বেলজিবাব-ইফরিত-এযাযিল সে রাতে যেই এসে থাকুকসে আমাকে ছাড়বে না। আমাদের রিচুয়াল ওকে জাগিয়ে তুলেছে। আমাকে না মেরে শান্তি নেই ওর। আমাকে এরেস্ট করুনলাভ নেই 

– উহুঁলাস্ট স্যাক্রিফাইসটা এখনো বাকি রয়ে গেছে যে। এরেস্টে কি আসে যায়? 

ঝটকা দিয়ে মাথা তুলল লোকমান, “মানেলাস্ট স্যাক্রিফাইস?” 

জাহিদ সাহেব মুচকি মুচকি হেসে চলেছেন, “ঘরের মেঝেটা দেখেছ?” 

– না তো। কিন্তু এ মেঝে তো লাল কারপেট দিয়ে ঢেকে দেয়া। 

– এক্স্যাক্টলি। এবারে যাও। গিয়ে কোণা থেকে টেনে কারপেটটা তুলে ফেল তো। 

–  মা…মা…মানেকি বলতে চাচ্ছেন? 

– যা বলছি তাই কর। কথা বাড়িও না। হাতে সময় বেশি নেই। 

লোকমান উঠে উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে কারপেটটা তুলে ফেলল। তুলেই লাফিয়ে সরে গেল সেমেরুদণ্ড বেয়ে শীতল একটা স্রোত নেমে গেল। কারপেটের নিচে পুরো রুমের মেঝে কভার করে একটা বিরাটাকৃতির পেন্টাগ্র্যাম আঁকালোকমান সরতেও পারবে না। কারণ পেন্টাগ্র্যাম পুরো মেঝে জুড়ে এঁকে দেয়া। 

আচমকা ঘরের বাতি নিভে গেল। 

ও মাই গডকী হচ্ছে এসব?” লোকমানের আর্তচিৎকার। 

আজ পূর্ণিমার রাত। শেষ স্যাক্রিফাইসটার মাধ্যমে আজ আঁধারপ্রভুমহাত্মা বিকাশ নেবেন। এরপরে আর প্রয়োজন হবে না পেন্টাগ্র্যামের। মহাত্মা ফিরে আসবেন আমাদের মাঝেস্বরূপে। আমরা তার পূজারীরা এতবছর তার প্রতীক্ষায় ছিলামআজ হাজার বছরের প্রফেসি পূর্ণ করে তিনি আসবেন 

লোকমান তাকালো জাহিদ সাহেবের দিকে। কিন্তু জাহিদ সাহেব আগের মত নেই। ঠিক সেইদিনের মতথুতনি বুক স্পর্শ করে আছে। চোখ জ্বলছে অঙ্গারের মত। মুখে সেই শ্বদন্ত। ঘরে ছড়িয়ে আছে সেই বোটকা গন্ধ। জানালা গলে আসা চাঁদের আলোয় জাহিদ সাহেবের ছায়া দেখে অন্তরাত্মা কেঁপে গেল লোকমানের। 

সেই হিংস্রছাগমস্তক অবয়বহাতে তীক্ষ্ণ নখহিংস্র গর্জন। লুসিফারের ছায়া। 

 

রাতের নীরবতা ভেঙে গেল লোকমানের মরণ আর্তনাদে। 

 

 পাঠকদের জন্য সুখবর!

অনলাইনে ডিজিটাল বাংলা  কমিক্স পড়ুন
ফ্রি-তে!

সদস্য রেজিস্ট্রেশন
close-link