গ্রামটা সুনসান৷ কাকপক্ষীও যেন ডাক ভুলে গেছে৷ চলতি সময়টাই যেন এমন৷ যেকোন বেলাতে এখানে ছমছমে নিরবতা বিরাজমান৷ হাতেগোনা লোকসংখ্যা,দিনের বেলা কিছুটা আনাগোনা দেখা যায় তাদের৷ কিন্তু সন্ধ্যা নামার পর যে যার ঘরের খিল এঁটে দেয়৷ গ্রামবাসীদের স্বভাব অদ্ভুত আর রহস্যময়৷ লোকেমুখে নানান কথা শুনে অন্য গ্রাম থেকেও কেউ আর আসেনা এখানে৷

তবে নদীর পারের জীবনধারা কালভেদে সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে যায়৷ নদীর নাম নিবাসী৷ গ্রামের নামখানা বোধহয় নদীর নামানুসারে পরবাসী রাখা হয়েছিল৷ কাগজে-কলমে এই গ্রাম অস্তিত্বহীন হলেও নির্দিষ্ট এক সময়ে শহর থেকে জনাকয়েক লোকজন আসে এখানটায়৷ তীরে বসবাসরত লোকজনের আয়ের প্রধান উৎস বলতে গেলে ঐ অতিকৌতুহলী লোকদের ঘিরে৷ ভয় পেতে যারা ভালোবাসে,তাদের কাছে ভয় বিক্রি করা কঠিন কিছু নয়৷ পরবাসী গ্রামের দুই অধিবাসী ঠিক সেই কাজটিই করে৷

এই সময়টা ব্যবসার জন্য আকাল৷ তীর থেকে কিছু দূরে,উৎসুক আগতদের জন্য যে দুটো থাকার মাঁচা আছে তাও এখন লোকশূন্য৷ বাঁশ আর টিন দিয়ে দুতলা করে বানানো হয়েছে মাঁচাদুটো৷ তার মধ্যে একটা দানেশ মিয়ার,আরেকটা কুতুব বখশের৷ এই দুই লোকই গ্রামের পুরনো অধিবাসী৷ সেই সাথে পরস্পরের চিরশত্রু৷

বৈশাখের নীরব এক দুপুরে বিড়ি ফুঁকছেন দানেশ মিয়া,হাতে চায়ের কাপ৷ মাঁচার নিচতলায় সুদৃশ্য অফিসঘর বানিয়েছে লোকটা৷ মাঝেমাঝে বাশের ফাঁকে বাতাসের মিহি শব্দে ভরে যাচ্ছে সেই নড়বড়ে ঘর৷ টানা দ্বিতীয়বারের মতো হতাশায় নাক-মুখ কুচঁকে উঠল লোকটা৷ হাতে টাকা-পয়সা না থাকলে এমন মেজাজ স্বাভাবিক৷

‘এই বছর মনে হয় কাস্টমার আইবো না,’হতাশ দৃষ্টিতে জানালায় উঁকি দিল দানেশ মিয়া৷ তীর দেখা যায় ওখান থেকে৷ প্রতিবছর বৈশাখের শুরুতে হারু মাঝির সাথে কেউ না কেউ হাজির হয় এই গ্রামে৷ তারপর দানেশ কিংবা কুতুব বখশের মাচায় গিয়ে উঠে৷ অথচ এখন পর্যন্ত বাহিরের কারো আগমন ঘটেনি৷

‘শহরের মানুষগুলা কত আজিব৷ তাই না,হাবু?’কাষ্ঠ হাসি হাসলেল দানেশ মিয়া ৷ ‘খালি ভূত দেখার লাইগা পরবাসীতে ছুইটা আসে৷’

মাথা নাড়লো হাবু৷ ছেলেটা বছর বিশেকের হবে৷ দানেশ মিয়ার মাঁচায় আসে মাঝেমাঝে৷ কখনো বা ফাই-ফরমাশ খেটে দেয়৷ আজ চা নিয়ে এসেছে তার জন্য। দানেশ মিয়ার মনে অবশ্য অন্য উদ্দেশ্য৷ বাম কনুইহীন প্রতিবন্ধী ছেলেটাকে ভিতরে দেখলে যে কারো মনে নির্ঘাৎ ভয়ের অনুভূতি হবে৷

‘ক্যান,চাচা? ওদের ঐহানে কী ভয় জিনিসটাই নাই?’আস্তে করে জিজ্ঞেস করল হাবু৷

‘জানি না৷ হয়তো ভয় আছে কিন্তু ভূত নাই৷ নয়তো ভূত আছে কিন্তু আমাগো মতো…’চুপ মেরে গেলেন দানেশ মিয়া৷ বাইরের লোকেরা কেবল একটামাত্র কারণে এই গ্রামে আসে৷ মাঁচায় রাত্রিযাপন ঐ একটা উদ্দেশ্যেই৷ ভূত দেখতে আসে তারা৷ অবশ্য ওসব ভুতূড়ে বিষয় এই গ্রামের অধিবাসীদের কাছে নতুন কিছু নয়৷

টেবিলের পাশ থেকে পুরনো একটা খাতা টেনে নিলেন তিনি৷ গম্ভীর মুখে সেটা খুললেন৷ প্রথম পৃষ্ঠাতে পরপর চৌদ্দজনের নাম লেখা৷ হাবুর চোখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি৷

‘এই হানের ছ’জন গেরামের বাইরে যায়তে পারে নাই,’বলল দানেশ মিয়া, ‘ভূত দেখার লগে লগে তাগো দম শ্যাষ৷ কি জানি,নিশির বদলে কুফজিলের খপ্পরে পড়ছিল কিনা৷’

শেষ নামটা শোনার সাথে সাথে হাবুর চোখ ধক করে জ্বলে উঠল৷ ‘কুফজিলরে ডাকা তো সহজ কম্মো নয়,দানেশ চাচা৷ কতুব বখশ তো তাই বলিছে৷’

‘হারামজাদা ভণ্ড৷ গেল বছর ভণ্ডামি কইরে মাইনষেরে ভয় দেখায়সে,’দানেশ মিয়া খেঁকিয়ে উঠল৷ ‘কুফজিলরে ডাকার মতো সাহস শালার থাকলেই তো! পারবো আমার মতো নিবরাসকে ডাইকা আনতে? মন্ত্র লাগে মন্ত্র! নিবরাস সবার  ডাকে সাড়া দেয় না৷’

হাবু প্রশ্ন করল আবার৷ শুনে দানেশ মিয়া মনে মনে গালি দিলেন নিজেকে৷ নিবরাসের প্রেতাত্মাকে বারবার ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও অতীতকে সহজে ভুলতে পারেন না৷

‘ক্যামনে চাচা? তাইলে তারেই নিয়া আসেন৷  নিশির ভয় এহন মাইনষের কাছে গা সওয়া৷’

দানেশ মিয়া কি যেন ভাবছেন৷ ভয়মেশানো চোখে একবার আলমিরার দিকে তাকালেন৷ দু বছর আগে কৌতুহলের বশে গ্রামের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আত্মাটাকে নিজের ঘরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন৷ আর তারপর দানেশ মিয়ার ফুটফুটে ছোট ছেলেটা…

দানেশ মিয়া আর কিছু ভাবতে পারলেন না৷ হতবিহ্বল হয়ে হাবুর নিয়ে আসা চায়ের কাপটার দিকে নজর গেল তার৷চোখজোড়া জড়িয়ে আসছে,ঝিমঝিম করছে মাথা৷ জ্ঞান হারানোর আগে শেষবারের মতো হাবুর চোখের দিকে তাকালেন৷ ছেলেটার উদ্দেশ্য বুঝে ফেললেন৷ কিন্তু সাবধান করা আর হলো না তার৷

***

সন্ধ্যা নেমে গেছে। দ্রুত হাঁটছে হাবু। পিছনে ফিরে তাকালো আরেকবার। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আর কোনদিন জেগে উঠার সম্ভাবনা নেই দানেশ মিয়ার। চায়ের সাথে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল আজ। কুতুব বখশের ক্ষেত্রেও তাই। ভূত আর প্রেতাত্মা কীভাবে বশে আনতে হয়,সেটা জানতে মরিয়া ছিল হাবু। কুতুব বখশ গোঁয়ার প্রকৃতির লোক। শেষপর্যন্ত মুখ খোলেনি। কিন্তু যা চেয়েছিল,দানেশ মিয়া নিজের অজান্তে তা দিয়ে দিয়েছে।

শক্ত করে ডায়েরিখানা বগলদাবা করে রেখেছে হাবু। আসার সময় দানেশ মিয়ার আলমিরা থেকে নিয়ে এসেছে ওটা। এই জিনিসটাই তার ভাগ্যের চাকা খুলে দেবে। দানেশ মিয়াদের ব্যবসা চিরদিনের জন্য শেষ। ভূত দেখানোর পালা এবার তারই হাতে। বদলে বশ করতে হবে আরো ভয়ঙ্কর কিছু। নিশিকে এখন যে আর কেউ ভয় পায় না।

যত বেশি ভয়,তত বেশি টাকা!

বাড়ির সামনে চলে এল হাবু৷ তীর থেকে খুব বেশি দূরে নয় টিনের ঘরটা৷ টিমটিমে হারিকেনের আলোয় উঠোনে বসে আছে ছোট ভাই৷ ভিতর থেকে অসুস্থ মায়ের কাতরানি শোনা যাচ্ছে৷ দরকারী কয়েকটা জিনিস নিয়ে আবার বেড়িয়ে পড়ল সে৷ কি মনে করে ভাইকেও সাথে নিল৷ রওনা দিল দানেশ মিয়ার মাঁচার উদ্দেশ্যে৷

রাত আরো বাড়তেই তোড়জোড় শুরু হলো৷ নিবরাসকে ডাকার জন্য প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট আসনের৷ মাথার খুলি,মোমবাতি এসব চক্রাকারে সাজিয়ে,হাবু আসন পেতে বসল৷ কেন জানি কোনো ভয় হচ্ছে না তার৷ নিবরাসকে একবার বশ করতে পারলেই হবে৷ খেল খতম৷

দেরি না করে দানেশ মিয়ার ডায়েরি থেকে নির্দিষ্ট একটা মন্ত্র খুঁজে বের করল৷ পাতার পাশে নিবরাস লেখা৷ বড় মন্ত্র৷ পড়তে পড়তে আধঘণ্টা লেগে যাবে৷ চোখ

আধবোজা করল হাবু৷ মাথা দুলিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র জপতে শুরু করল৷

 

চারপাশে নদীর ঢেউ বাদেও ঝিঁঝিপোকার ডাক৷ মন্ত্র জপা প্রায় শেষের পথে৷ হাবুর সন্দেহ হলো,নিশি যার ডাকে দেয়নি নিবরাসের মতো ক্ষমতাধর প্রেতাত্মা কখনো কি তার ডাকে সাড়া দেবে?

হঠাৎ থেমে গেল সব শব্দ৷ কেবল নদী থেকে পরিচিত একটা শব্দ ভেসে আসছে৷ বিরক্ত হয়ে উঠে পড়ল হাবু৷ মাঁচার জানালা দিয়ে অন্ধকারে দেখার চেষ্টা করল৷ আচমকা পেছন থেকে কে যেন শক্ত করে হাবুর গলা চেপে ধরল। হাতদুটো ছোঁয়ার প্রচেষ্টা করতেই কুঁকড়ে গেল সে। কারো হাত ঠেকল না তার হাতে। স্রেফ চেপে ধরার অনুভূতি। সজোরে টেনে নিচ্ছে পেছনে। হাবু কোনোমতে ঘাড় ঘোরালো,দেখতে পেল নিবরাসকে। চিৎকার দিল। নাহ,নিবরাসের ভয়ানক দেহ দেখে নয়। প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠল আরেকবার কারণ কালো এক গহব্বরে তলিয়ে যাচ্ছে সে !

***

‘চিৎকারটা শুনলেন?’নৌকা থেকে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল যুবক৷

হারু মাঝি জবাব দিল না৷ পরবাসী গ্রামের সাথে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক৷ সেই গ্রামের রহস্যময় ব্যাপার-স্যাপার তার গা সওয়া৷ তাই দানেশ মিয়া আর কুতুবের মাঁচা থেকে রাতের বেলা ওসব চিৎকারের শব্দ,তার কাছে নতুন কিছু নয়৷ একবার শুনেই বুঝে যান৷ প্রতিটা চিৎকারের অর্থ যেন তার বিশদভাবে জানা৷ হারু মাঝির মনে কোন সন্দেহ নেই,এইমাত্র যে মানুষটা চিৎকার করল;ভয় পেয়ে মারা গেছে সে৷

নৌকার একমাত্র যাত্রীর বয়স ত্রিশের কোঠায় ৷ দূরের শহর থেকে আসছে৷ হারু মাঝির উপর যারপরনাই বিরক্ত সে৷ সেই যে পলাশপুর থেকে উঠেছে,বুড়ো একটা প্রশ্নেরও জবাব দেয়নি৷ যাই হোক,পরবাসি গ্রামে এটাই তার প্রথম যাত্রা৷ উত্তেজনার আভাস পাচ্ছে ভেতরে ভেতরে৷ ক্যামেরার ব্যাগটাতে আলতো করে চাঁপর দিল৷

তীরে নেমে পড়ল যুবক৷

***

টর্চহাতে হাঁটতে হাঁটতে মাঁচা দুটোর দেখা পাওয়া গেল ৷ গ্রামে বিদ্যুৎ নেই৷ উভয়ের সামনে হারিকেন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে৷ বন্ধুর কাছ থেকে সব শুনে এখানে এসেছে যুবক। তার থেকেই কুতুব আর দানেশ মিয়ার নাম শুনেছে। কিন্তু দুজনের কাউকে চেনেন না। যুবক একটু ভেবে উঁকি মেরে দেখল। প্রথম মাঁচায় দেখতে পেল একজনকে। টেবিলের উপর অদ্ভুতভাবে হাত ছড়িয়ে মাথা উপুর করে রেখেছে। আর অন্যটাতে কিশোর বয়সী একটা ছেলে নির্বিকার বসে আছে৷ সেটাতেই ঢুকে পড়ল যুবক৷ রাত কাটানো যাবে কিনা জিজ্ঞেস করতেই ছাদের দিকে আঙ্গুল তুলে ইশারা করল ছেলেটা৷ জোর করে কিছু বলার চেষ্টা করল৷

যুবক আর দাঁড়ালো না৷ মই বেয়ে উঠে পড়ল উপরের ঘরটাতে৷ ছোট ছেলেটা উত্তেজিত হয়ে অদ্ভুত সব শব্দ বঁকে যাচ্ছে৷ যুবক দরজা বন্ধ করে দিল।

ঘরের একমাত্র খাটিয়ায় হেলান দিয়ে শুয়ে আছে যুবক। রাত গভীর হচ্ছে। অধৈর্য্য হয়ে বারবার ঘড়ি দেখছে সে। কৌতুহলী চোখে আরেকবার মেঝেতে পড়ে থাকা খুলিটার দিকে তাকালো। কেন জানি যুবকের মনে কোনো ভয় কাজ করছে না। তবে ভালোই ভালোই ভূত দেখে এই অদ্ভুতুড়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ-যুবক সেটা খুব ভালোমতো বুঝতে পেরেছে।

যুবকের চিন্তার জাল ছিন্ন হয়ে গেল। জানালার কাছে ধীরে ধীরে জমাট বাঁধছে একটা মনুষ্য অবয়বের। যার বাঁ হাতটা কনুই থেকে পুরোপুরি অদৃশ্য।

***

একরাতে দ্বিতীয়বারের মতো পরবাসী গ্রামের নিরবতা খানখান হয়ে গেল। নৌকার পাটাতনে ছেঁড়া কাথার নিচে শুয়ে ছিল হারুমাঝি। আর্তচিৎকার শুনে চোখ মেলে তাকালেন।

বিড়বিড় করে বললেন,’নাহ,মরে নাই।’

 পাঠকদের জন্য সুখবর!

অনলাইনে ডিজিটাল বাংলা  কমিক্স পড়ুন
ফ্রি-তে!

সদস্য রেজিস্ট্রেশন
close-link