(সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ গল্পটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য)


ভূতের আখড়া নামের কানাগলির শেষ মাথায় বাড়িটা। গলিটা কানা হলেও পুরোপুরি নয়। যাতায়াতের পথ না থাকলেও আছে বদ্ধ পচা জলাশয়, কর্দমাক্ত ঝিল, বিস্তৃত বিল। তবে রিয়েল এস্টেটের শকুনীর চোখ এর উপরেও পড়তে বাকি নেই। ওই পঁচা ডোবাও দখল হয়ে গেছে। ফালি ফালি হয়ে বিক্রি হবে। দশ বিশ বছর পরে দশ বিশ তলা উঠবে।

ভূতের আখড়া নামটাতে একটু খটকা লাগছে? সেটা আবার কোথায়? আছে। এই ঢাকা শহরের আশেপাশেই আছে। শনির আখড়া, ভুতের গলি থাকলে ভুতের আখড়া থাকবে না কেন? বলিহারী সব নামের শহরই তো ঢাকা। গোটা শহরই খুল্লামখুল্লা অথচ নাম ঢাকা। কলাবাগান, কাঠালবাগানে বাগানের নাম নিশানা নেই। হাতির রাস্তায় হাতির দেখা-বোকার স্বর্গে বাস করা। কানাগলির শেষ মাথার বাড়িটা নিজেও কানা। মানুষজন বাস না করলে সে বাড়িকে কানাই বলতে হয়। মানুষই বাড়ির চোখ। বাড়ির প্রাণ। প্রাণহীন বাড়িটা পরিত্যক্ত নয়। ভূতের অপবাদ লাগেনি গায়। প্রাসাদতুল্য বিলাসবহুল বাড়িটা অবিলাসীভাবে তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে আছে মালিকের অভাবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির সরবরাহ এখনও বহাল আছে। বিদেশ প্রবাসী মালিকের অবিশ্বস্ত কেয়ারটেকার মালিকের পাঠানো টাকা থেকে মেরে কেটেও মাস মাস বিল শোধ করে।
বাড়ির বাইরে শ্বেতপাথরের মর্মর ফলকে নাম ছিল ‘অমরাবিলাস’। সেখান থেকে ‘অ’ এবং ‘বি’ উঠে বাড়ির বর্তমান নাম আছে ‘মরা লাস’। মরা লাসের জেলখানার মত উঁচু প্রাচীরের উপরে তারকাটা ও সুতীক্ষ্ণ কাঁচের টুকরোর সারি এত শক্ত ভাবে গাঁথা যে শ্বেতপাথর ভাঙলেও সেটা অক্ষত আছে। কেয়ারটেকারের তদারকির চেয়ে সেটাই বাড়িটা রক্ষায় কাজ দিয়েছে বেশি।

মরা লাশের সামনে দীর্ঘদিন পর ট্রাক থেকে বড় বড় বাক্স পেটরা নামানোতে গলির লোকের তেমন খবর হলো না। যাতায়াতের রাস্তা অন্ধকার। স্ট্রিট বালব চোরেরা আগেই কাজ সেরে রেখেছে। কারণ রাত বারোটার পর পুরো মহল্লা দরজায় খিল আটকে পড়ে থাকে। এই এলাকায় খুন, ছিনতাইয়ের বদনাম আছে। খুন ছিনতাই করে ঝিলের ওদিক দিয়ে পগার পার হয়ে যায়। এ কারণেই রাত বারোটায় এতটাই নিরিবিলি এই এলাকা।

এমন নিরিবিলি এলাকাই খুঁজছিলেন চল্লিশোর্ধ ভাস্কর নোরা আহমেদ। আত্মগোপন করে পাথরের মত হয়ে আপনমনে পাথর গড়বেন তিনি। কাজের সময়ে আল্লার দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক রাখতে পছন্দ করেন না। বিদেশী অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত, আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন ভাস্করের পক্ষে সেটা সবসময় সম্ভব হয়ে উঠে না। অসংখ্য টিভি চ্যানেলের ক্যামেরার কলুষিত চোখ সবর্ত্র তাদের খোরাক খুঁজে বেড়ায় প্লাবিকের সময় নষ্ট করার জন্য। সাংবাদিকরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে তার সাক্ষাৎকারের জন্য। তিনি সাক্ষাৎকার দিতে চান না। তিনি চান কাজ করতে। কাজ শেষে আত্মপ্রকাশ করেন। তার অতি বিশ্বস্ত, সকল কাজের কাজি, তার ব্যক্তিগত লইয়ার, এজেন্ট মি: এবাদুর রহমান তার সব কাজ সারে। বিদেশে ভাস্কর্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা, সেখানকার প্রদর্শনী, গ্রুপিং, লবিং যা করার সে-ই করে। তিনি শুধু কাজের পরের সাফল্যটুকু উপভোগ করেন।

প্রথম হেমন্তের উপভোগ্য হিমেল বাতাস। কোট টাই পরিহিত মি: রহমান ট্রাক থেকে দু’জন কুলীর কাঠের বাক্স নামানোর তদারকি করতে যেয়ে তাদের অবহেলা দেখে ধমক দিলেন, ‘সাবধানে নামাও না কেন? এত তাড়াহুড়ো কিসের তোমাদের? ওই সামান্য বাক্সের ভিতরে কী অসামান্য জিনিস আছে তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না। দাম দিয়ে ওর মূল্য নির্ধারণ হয় না। ওর মূল্য নির্ধারিত হয় সময়ের উপরে। সামান্য পাথরখণ্ডের অসামান্য…’ মি. রহমান থেমে গেলেন। প্রাডো গাড়ি থেকে নেমে আসছেন ম্যাডাম। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। গাড়ির ভেতরে সিগারেটে নাকি ম্যাডামের দমবন্ধ লাগে। কি অদ্ভুত কথা!

মি. রহমান ট্রাকের কাছ থেকে ম্যাডামের দিকে এগিয়ে এলেন। দীর্ঘদিন ঠাণ্ডার দেশে থাকার কারণে ম্যাডামের ঠাণ্ডা কম লাগে মনে হয়। শাদা রঙের উপর কালোয় ‘হাগ মি’ লেখা একটা টিশার্ট। দেখলেই লেখাটার বাস্তবায়নের ইচ্ছে জাগে। ইচ্ছে জাগে জড়িয়ে ধরতে। আর পাতলা একটা ট্রাউজার পরনে। মাথার চুল ববকাট। নতুন চাঁদের আলোয় জ্বলন্ত সিগারেটের আগুনে ম্যাডামের ফর্সা শক্ত মুখের কাঠিন্য কিছুটা সারল্যে এসেছে। হয়তো বাড়িটা খুঁজে দিতে পারার কারণে।

মি: রহমান ম্যাডামের সামনে এসে ঝুঁকে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়ালেন। এত বিখ্যাত একজন ভাস্করের সামনে ঋজু ভঙ্গিতে দাড়ানো যায় না। ম্যাডাম অবশ্য উদ্ধত বুক উচিয়ে পুরুষালী ভঙ্গিতে সিগারেট টেনে চলেছেন। মি: রহমান আসতেই ম্যাডাম বাম হাতে ধরা বেনসনের প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘টেক অন।

‘নো। থ্যাঙ্কস ম্যাম। বেশি রাতে আমি স্মোকিং করি না। ঘুমের সমস্যা হয়। বাকি রাত আর ঘুম হয় না। ম্যাডাম শুকনো হাসি হাসলেন। ‘আমার ঘুমের কোন সমস্যা নেই।’ তিনি বেনসনের প্যাকেট ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে ফেললেন। ‘ঘুম না এলে আমি পাথরের কাছে নিজেকে নিবেদন করি। পাথরের সাথে আমিও পাথর হয়ে যাই।’
‘ম্যাডাম কি একটু অস্থির বোধ করছেন?’
‘অস্থির নয়, উত্তেজনা। স্বপ্নের মত এরকম একটা বাড়ি খুঁজে পাওয়ার উত্তেজনা। অস্থিরতাও আছে কিছুটা। আপনার কেয়ারটেকারের তো ঠিক বারোটার সময়ই এখানে থাকার কথা। গেট খুলে সব বুঝিয়ে দেয়ার কথা। তার এখনো দেখা নেই। বাক্স পেটরা সব লোহার গেটের বাইরে। পুলিশী বা লোকাল মস্তানের ঝামেলায় যেতে চাচ্ছি না।’
‘কোন ঝামেলা নেই ম্যাডাম। পুলিশ আমার হাতেই আছে। এলে ‘স্যার, স্যার’ বলে চলে যাবে। আর মস্তান!’ বলে মি. রহমান কোটের বাম দিকটা উঁচু করে ভেতরে দেখালেন। ম্যাডাম দেখলেন সেখানে একটা পিস্তল গোঁজা আছে।
‘ঠিক আছে। তারপরও আপনি তো জানেনই সময়ের হেরফের হলে আমার কেমন অস্থির লাগে। শুধু মুর্তি গড়ার জন্য আমি সময়ের হিসাব করি না। আর সব আমার সময়ের হিসাবে।’
‘এসে পড়বে ম্যাডাম। নেশাখোর লোক তো। রাতে এদের তালের ঠিক থাকে না।’
‘কেয়ারটেকারকে আপনি সব বুঝিয়ে দিয়েছেন তো? আজ বাড়ি বুঝিয়ে দেয়ার পর সে যেন এই বাড়ির ত্রিসীমানায় আর কখনও ঘোরাঘুরি না করে। বাড়ি ভাড়ার ব্যাপারেও কারোর কাছে মুখ না খোলে। এই তল্লাট ছেড়েই যেন চলে যায়। তার জন্য আপনি উপযুক্ত টাকা দিয়ে দেবেন। আর আমাদের সব চুক্তিই যখন বাড়ির মালিকের সাথে হয়ে গেছে তখন কেয়ারটেকার পোষার কোন দরকার নেই।’
‘তবুও ম্যাডাম, ওর জন্যই বাড়িটা ভাড়ার ব্যাপারে এগুতে পেরেছি। বেচারা গরীব মানুষ। এভাবে পেটে লাত্থি দিলে…’
‘ঠিক আছে, ওর একটা মাসকাবারী আপনার কাছ থেকে নিয়ে যেতে বলবেন। সে যেন কোন মতেই আমার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা না করে। আপনি জানেনই তো আমার কাজের ধরন…’
‘জ্বি ম্যাডাম…’ বলতে যেয়ে মি: রহমানের গলা কেপে গেল। তার পেছনে কে যেন বিড়ালের মত নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে। কোন আততায়ী, শত্রুপক্ষ, সশস্ত্র মস্তান নয় তো? অস্ত্র পেট কোচড়ে থাকা এক কথা, আর তার ব্যবহার আরেক কথা। তিনি আইনী লড়াইয়ে অভ্যস্ত। সশস্ত্র লড়াইয়ে নয়।
তিনি পিছনে তাকাতেই কেয়ারটেকার ডান হাত কপালে ঠেকিয়ে বলল, ‘স্লামালাইকুম স্যার। আসতে একটু দেরী হয়ে গেল স্যার। বন্ধুবান্ধবের পাল্লায়… আপনাদের কোন অসুবিধে হয়নি তো স্যার?
মি: রহমান ধমক দিতে গিয়েও থেমে গেলেন। কেয়ারটেকার মকবুল কিছু গিলে এসেছে। তার গা দিয়ে ভুর ভুর করে গাজার গন্ধ আসছে। চোখও নিশ্চয় লাল। আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে না।
‘গেট খুলে দাও। ওরা বাক্সপেটরা জিনিসপত্রগুলো ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলুক। কাজ শেষ করে গুছিয়ে কুলিদের ট্রাক ছেড়ে দিতে হবে।
‘স্যার? আজ রাতেই এতোসব মালপত্তর খালাস করবেন নাকি?
‘কেন, তোমার কোন অসুবিধে আছে?
‘না স্যার। কিন্তু এতো জিনিস পত্তর।
‘না। সব আজ রাতে করতে হবে না। শুধু খাট, পালংক, আলমারী, ফ্রিজটিভিগুলো গুছিয়ে দিয়ে যাবে। আর সেদিন যে বড় রুমটা দেখিয়েছিলাম ওটাতে এই বড় বড় বাক্সগুলো ঢুকিয়ে রাখতে হবে।
‘স্যার, কি আছে ওই বাক্সগুলোতে?
‘সেটা জানার তোমার কি কোন দরকার আছে?
‘না স্যার…এমনি… জাস্ট কৌতুহল..
‘কৌতুহল কম দেখানো ভাল। কৌতুহলে বিড়াল মরে। যাও, কাজে যাও। যে লাইটের বালবগুলো ছিলো না সেগুলো এনেছো তো?
‘জ্বি স্যার, এনে লাগিয়েছি।
‘তাহলে গোটা বাড়ি এমন ভুতুড়ে অন্ধকার করে রেখেছো কেন?
‘স্যার আপনি যে বলেছিলেন গোপনীয়তা রাখতে…বাড়ি ভাড়ার কথা কেউ যেন না জানে…
ম্যাডাম নোরা দাড়িয়ে দাড়িয়ে তাদের কথা শুনছিলেন। মকবুল টিশার্ট পরা বব চুলের ম্যাডামের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিলো। তবে তার আড়ে আড়ে তাকানোর কারণ ম্যাডামের ধুমপান। ম্যাডাম মকবুলের দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ট্রাউজারের পকেটে হাত দিয়ে সিগারেটের প্যাকেট বের করে এনে একটা স্টিক বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘মি, মকবুল, নাও। তুমি যে ধুমপান করো তোমার তৃষ্ণার্ত চোখ দেখেই সেটা বোঝা যাচ্ছে। গা গরম করে গেট খুলে দাও। ওরা সবাই বাক্স নামিয়ে তোমার জন্যই অপেক্ষা করছে।

মকবুল বিড়ি, সিগারেট, চায় কখনও না করে। কিন্তু একজন মেয়েমানুষের কাছ থেকে সিগারেট নেয়া! তার কাছে এটা ঠিক অপমানকর নয়, অন্য ধরনের অস্বস্তিকর মনে হলো। সে সজোরে দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে ‘না না, ম্যাডাম লাগবে না। আমি খাই না ম্যাডাম।’ ম্যাডাম হাসলেন, আর জোরাজুরি করলেন না। মকবুল যেন ম্যাডামের সিগারেটের হাত থেকে বাঁচতেই তাড়াতাড়ি বিশালাকৃতির লোহার গেটের দিকে গেল।
রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করে দিয়ে লোহার গেটের ক্যাচক্যাচানি শব্দে ভরে গেল চারপাশ।
মি: রহমান ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ম্যাডাম, কি গাড়িতে গিয়ে বসবেন নাকি ভেতরে ঢুকবেন?
‘ভেতরেই ঢুকবো। গাড়ি নিয়ে গ্যারেজে রাখতে হবে তো। গ্যারেজ ঝুলকালি ঝেড়ে পরিষ্কার করা আছে না?
‘করারই তো কথা। তবুও একবার তদারক করা দরকার। গাড়ি আপাতত গেটের ভেতরে ঢুকিয়ে রেখে দেই। সব গুছিয়ে দেখে তারপর গ্যারেজে নেয়া যাবে। আর একরাত গ্যারেজে না রেখে বাইরে রাখলে…
নোরা আহমেদ রহমানের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘না না, দৃশ্যমান কোন কিছু বাইরে রেখে আমি জানান দিতে চাচ্ছি না। এমনকি বাইরের কোন বাতিও আমি আজ রাতের পর থেকে জ্বালব না।
‘ঠিক আছে ম্যাডাম। আমি গাড়ি ভেতরে নিচ্ছি। আপনি ভেতরে গিয়ে..
‘থাক লাগবে না। গাড়ি বাইরেই থাকুক। কিচ্ছু হবে না। ট্রাক আছে। ট্রাকের ড্রাইভার, কুলি…
গেট খোলার সাথে সাথেই কুলিরা কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছে। মকবুল তার স্বমুর্তিতে আর্বিভুত। কুলিদের নিচু গলায় ধমকে ধামকে লোহার গেট থেকে পঁচিশ ত্রিশ গজ ভেতরের বাড়িটার মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে।
নোরা আহমেদ রহমানের সাথে ভেতরে যেতে যেতে বললেন, ‘মকবুল ব্যাটা বেশ কাজের আছে দেখছি। বাড়িটা যেভাবে পরিচ্ছন্ন আর ম্যানেজ করে রেখেছে। ভাড়া দেয়ার ব্যাপারে তো সেই…
‘না ম্যাডাম। এক্ষেত্রে আপনার নামটাই অনেক বেশি কাজ দিয়েছে। বাড়িটার সন্ধান পেয়েই আমি মকবুলের সাথে যোগাযোগ করি। সে জানায় মালিক ভাড়া দেবে না। কিছু টাকা হাত করে তাকে পটালাম। তারপর যোগাযোগ করলাম মালিকের সাথে। তার এক কথা ভাড়া দেয়া হবে না। যেভাবে পড়ে আছে পড়ে থাকুক। তখন আমি আপনার কথা বললাম। বিখ্যাত হওয়ার অনেক সুবিধে ম্যাডাম। মালিকের মন গলল। বিশেষত আপনি নিরিবিলিতে ভার্স্কযের কাজ করবেন শুনে। আপনার ভাষ্কর্যের সাথে সাথে বাড়িটার নাম জড়িয়ে পড়বে। মালিকের নামও। এসব বোঝাতেই বরফ গলে জল…
‘তবে এক্ষেত্রে আমি পুরো কৃতিত্ব আপনাকেই দেব মি: রহমান। আপনি না হলে এই বাড়ি কোন দিনই ভাড়া নেয়া হতো না। শুনেছি মালিক খুব কড়া ধাঁচের লোক। আপনি মালিকের সাথে কতদিনের চুক্তি করেছেন?
‘ছয় মাসের চুক্তির কাগজপত্র করা আছে। বাড়িয়ে এক বছর করা হবে। তারপর আবার নতুন করে…
‘তার দরকার নেই। বাড়িটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আপনি চেষ্টা করবেন বাড়িটা কিনে নিতে।
‘বিক্রি করবে না ম্যাডাম।
‘জানি। যেমন ভাড়া দিতে চাইনি, ভাড়া পাওয়া গেছে। তেমন বিক্রি করবে না কিন্তু বিক্রি হবে। টাকায় হবে। আর সে ব্যবস্থা যে আপনি করবেন সেও জানি।
‘ঠিক আছে। ওটা নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না। আমি ব্যবস্থা করে ফেলব। আগে ছয় মাস যাক।
‘আর শুনুন। এদের কাজ হয়ে গেলে বিদায় করে দেবেন। তারপর যত রাত হোক আমার সবকিছু আপনি গুছিয়ে দিয়ে যাবেন। বিশেষত আমার স্কাল্পচারের হলঘরটা। আর বাক্স থেকে ভার্স্কযগুলো আমরা দুজন মিলেই বের করব। ওদের এতে হাত দিয়ে দেয়া যাবে না। ঘুণাক্ষরেও যেন কেউ কখনও জানতে না পারে আমি এখানে আছি। আর ওই বাক্সগুলোতে আমার মূল্যবান ভাস্কর্য আছে। মালিক শাহেদীন সাহেবকেও তো এই ব্যাপারে বলা আছে।
‘হ্যা। আর উনি থাকেনও দেশের বাইরে। এসব ব্যাপারে মাথা ঘামাবেন না।
‘আজ রাতে আমাকে সব গুছিয়ে দিয়ে আপনি নিজেও আর কোন যোগাযোগের চেষ্টা করবেন না। আমিই প্রয়োজনে আপনার সাথে যোগাযোগ করব।
‘জানি ম্যাডাম। আপনার সাথে তো আর আমি দু’একদিন কাজ করছি না। আপনার ওখানে প্রায় মাসখানিকের বাজারসদাই করে দেয়া আছে। আর কিছু লাগলে…
‘অসুবিধে নেই। আমি মাঝেমধ্যে বের হব। তখন মোবাইলে আপনার সাথে যোগাযোগ করে দেখা করে নেব। আমার নতুন পাথর এসেছো তো?
‘হ্যা। ওটা রাতেই সেট করে দিয়ে যাব। আপনি ছেনি বাটালি নিন নিয়ে কাজে লেগে যেতে পারবেন।
‘কিন্তু আমার হাতে তো আসল জিনিসই নেই।
‘কি?
‘আমার ভাস্কর্যের মডেল। ফুটপাথে পড়ে থাকা বিকৃত, হতভাগ্য মানুষ। আজ শেষ রাতেই আমি গাড়ি নিয়ে মডেল খুজতে বের হব। আমার নেক্সট প্রজেক্ট।


নোরা আহমেদের কাজের ধরণই অন্যরকম। পাথরের মুর্তি গড়ার জন্য পাথরের সাথে একাত্ব হওয়ার প্রয়োজন মনে করেন তিনি। পাথরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে আগে প্রাণের ছোয়া চাই। সেই ছোয়া তিনি নিজের শরীরের স্পর্শে পাথরকে দেন।
মি: এবাদুর রহমান ভাস্করের হলঘরে নতুন আনা বিশালকার পাথরটা মুর্তি গড়ার জন্য বসিয়ে দিয়েছেন। রাত তিনটার মধ্যেই সব কাজ শেষ হয়ে গেছে। কুলিরা ঘন্টাখানেকের মধ্যে ফ্রিজটিভি, খাটপালংক, আলমারী জায়গামত বসিয়ে দিয়ে পৌণে দুইটার দিকে পারিশ্রমিক নিয়ে বেরিয়ে গেছে। কেয়ারটেকার মকুবুল মিয়ার নতুন মালেকীনের দেখভালের জন্য আরো কিছুক্ষণ থাকার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তার টাকা বুঝিয়ে দিয়ে কোনরকম যোগাযোগ না করার কথা কড়া গলায় জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তারপরে আর থাকা চলে না। মি: রহমান ভাস্কর্যের কক্ষে পাথরটা সেট করে দিতে দিতে রাত তিনটে হয়ে গেছে। তারপর ম্যাডামের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে, কিছু কাগজপত্র সই করে বেরিয়ে এসেছেন। ম্যাডামও এসেছেন তার সাথে সাথে গেট পর্যন্ত। লোহার ভারী বিশাল গেট মি রহমান লাগানোয় সহায়তা করেছেন। যদিও বলিষ্ট শরীরের নোরা আহমেদ সেটা ভালভাবেই করতে পারবেন। বাকি দিনগুলোতে তাকেই করতে হবে। দুটো বিশাল সাইজের বিদেশী তালা লাগিয়ে দিয়েছেন গেটে। মি রহমান বিদায় হলে তিনি ফিরে এসেছেন ভাস্কর্যের কক্ষে।

ভাস্কর্যের কক্ষের বেদীতে নতুন মসৃণ পাথরটা দণ্ডায়মানভাবে সেট করা। কম পাওয়ারের বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বলছে সেখানে। গোটা ঘর মুদু নীলচে আলোয় ভরে আছে। সেই আলোয় পাথরটা মাথা হাত পা বিহীন একটা মানুষের মতই লাগছে। এই মানুষের মতই পাথরটাকে তিনি মানুষের রুপ দেবেন। যেমনটি দিয়েছেন আশেপাশের ওই মানুষগুলোকে। ওগুলোও আগে এক খন্ড পাথরই ছিল। এখন সবাই জীবন্ত মানুষের মত। বিকৃত অথচ যেন জীবন্ত। জীবন্ত মানুষের মত হয়ে উঠবে প্রাণহীণ পাথর। আর তার জন্য চাই সাধনা। এখনই সাধনায় বসবেন তিনি।
নোরা আহমেদ বাড়ির শেষ বাতিটাও নিভিয়ে দিলেন। গোটা বাড়ি ডুবে গেল আলকাতরা অন্ধকারে। ভাস্কর্যের কক্ষের বাতিটা নিভিয়ে দিতেই পাথরের মুর্তিগুলো মুহুর্তেই অদৃশ্য হয়ে গেল। অদৃশ্য হয়ে গেল সামনের পাথর খন্ডও। শুধুই নিকষ কালো ভয়াবহ অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যেই তিনি একে একে তার পরিধেয়র শেষ বস্ত্র খুলে ফেললেন। পাথর খন্ডের মতই নগ্ন তিনি।

ধীরে ধীরে অন্ধকার চোখ সওয়া হয়ে গেলে তার সামনে মসূণ পাথরখন্ড দৃশ্যমান হলো। তিনি ধ্যানস্থের ভঙ্গিতে পাথর খণ্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন। যেন পাথরখণ্ড তার নগ্ন প্রেমিক। নগ্ন প্রেমিকা এই গভীর রাতে নগ্ন প্রেমিককে আলিঙ্গন করছে। গভীর ভালবাসায়। তিনি পাথরখণ্ডটিকে জড়িয়ে ধরলেন।

নিশ্চিদ্র এই হলঘরের কোন ফাক ফোকর গলিয়ে সকালের আলো সুচের মত এসে পড়েছে নোরা আহমেদের শরীরে। আলো দেখে তিনি চমকে উঠলেন। নির্জন বাড়িতে পাখির কলকাকলি ও থোকা থোকা আঙুর গুচ্ছের মত সুর্যের আলোয় নিজের নগ্ন শরীরের দিকে চোখ চলে গেল। পোশাক পরে বেরিয়ে এলেন হলঘর ছেড়ে। ভারী একটা তালা লাগালেন তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষে। যেখানে প্রবেশের অধিকার তার ডির্ভোসী স্বামীও কখনও পায়নি। এটা একান্তই তার নিজের জগৎ।

সকালের সব কাজ একা হাতেই সারলেন। দীর্ঘদিনের অভ্যাস। নিজের সব কাজ নিজে করার। একা থাকারও। বিদেশে কারো বাসায় কাজের লোক থাকে না। বিদেশী থাকার সেই অভ্যাস ছাড়তে পারেননি। দেশে সস্তায় কাজের লোক পেলেও তিনি কখনও রাখেননি। তার একাকীত্বের ঘরে কেউ হানা দিক, সেটা তার কাম্য নয়। কাজের লোকের নানান ফ্যাকড়া-অসুখ বাধলে ডাক্তার দেখাও, পেট বাধলে..

সকালের ব্রেকফাস্টটা একটু ভারীই করলেন। সাহেবী কায়দায়। কর্ণ ফ্লেকস্, টোস্ট, জ্যাম জেলী আপেল জুস।
এটাই তার রুটিন। সকালে অন্যের দিনের শুরু। তার রাতের। এখন সারাটাদিন টানা ঘুম দেবেন। তারপর সন্ধ্যেয় উঠে তার দিনের শুরু। সারারাত জেগে চলবে পাথর সাধনা।

ভরা সন্ধ্যেয় ঘুম থেকে উঠে শরীর ম্যাজম্যাজ করছিল। তিনি অন্ধকার বারান্দায় দাড়িয়ে কিছু ফ্রিহ্যান্ড এক্সারসাইজ করে শরীরের আড়ষ্টতা ভাঙলেন। আজ অনেক কাজ। প্রথম কাজ গাড়ি নিয়ে শহরে যাওয়া। সন্ধে মিলতেই অতি সাধধানে চোরের মত বেরিয়ে পড়লেন তিনি। লোহার গেটে জোড়া তালা লাগাতে ভুললেন না। নিজের লরিটা নিয়ে ঢাকার ভবঘুরে ভিক্ষুকদের স্থানগুলোতে হানা দিলেন তিনি। কমলাপুর রেলস্টেশনে তার সাবজেক্ট মডেল পাওয়া গেলেও এখান থেকে জোগাড় করা ফ্যাকড়া ভেবে তিনি নির্জন স্থানগুলোতে খোজ নেন। ট্রাফিক জ্যামেই পেয়ে যান কাঙ্খিত মডেল। অল্প বয়স্ক এক কিশোরী। এক পা খোড়া। এক চোখ কানা। কানি বকের মত এক পায়ে ক্রাচে ভর দিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে এগিয়ে আসে। কোলে পেট মোটা উদোম গায়ের এক শিশু। মাথা ন্যাড়া করা। নাকের কাছ দিয়ে সিকনি ঝরছে। পেটটা বিশাল। ট্রাফিক জ্যামে আটকা থাকার ফাঁকেই নোরা মেয়েটাকে টাকার বিনিময়ে তার বাসায় কিছুক্ষণের জন্য বসে থাকার কথা জানান। জানান মেয়েটার ছবি আকবেন তিনি। মেয়েটা প্রথমে রাজি হয় না। পরে টাকার পরিমানটা বেশি বলেই যেতে রাজি হয়। জানায় রাত একটু বাড়লেই তাকে এখানে এনে ফিরিয়ে দিয়ে যেতে হবে। নোরা আহমেদের মাথায় অন্য পরিকল্পনা থাকলেও মেয়েটার প্রস্তাবে রাজি হন। মেয়েটাকে তুলে নেন তার গাড়িতে। মরালাসের দিকে গাড়ি ছোটান।

নির্জন অন্ধকার বাড়ি দেখে কিশোরী মেয়েটা ভয় পায়। নোরা আহমেদ মেয়েটাকে পর্যাপ্ত খাবার দিতে দিতে বলেন, ‘ভয়ের কিছু নেই খুকি। ভিক্ষে করে যা পাও তার তিনগুণ টাকা আমি তোমাকে দেব। আর সেই সাথে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে। ওর জন্য দুধের ব্যবস্থাও আছে। কয়েকটা দিন আমার বাড়িতে থাকতে হবে তোমাকে।’ নোরা আহমেদ মেয়েটার হাতে চকচকে একশ টাকার নোট গুজে দেন।
কয়েকটা দিন থাকার কথা শুনে মেয়েটা গাইগুই করতে থাকে। আজ রাতেই তাকে ফেরত দিয়ে আসতে হবে।
‘ঠিক আছে বাবা, আগে চলো তো দেখি কাজের কতদুর কি করা যায়।’ নোরা আহমেদ মেয়েটাকে খাইয়ে দাইয়ে ভাস্কর্যের ঘরে নিয়ে আসেন।
অন্ধকার ঘর দেখে মেয়েটা ভয় পায়। বাতি জ্বললেও মেয়েটার ভয় দুর হয় না। ঘরের মাঝখানে একটা টুলের সামনে বিশালাকার পাথরের চাই। তার সামনে দুপাশে অসংখ্য পাথরের মুর্তি। হাত ভাঙা, পা খোড়া, দুর্ঘটনায় থেতলে ছেছড়ে যাওয়া, বিকলাঙ্গ বিকটাকার সব মুর্তি।
নোরা আহমেদ পাথরের চাইয়ের পাশে কিশোরী মেয়েটাকে দাড় করান। তার ময়লা ফ্রকটা ঠিক ঠাক করে দেন। বড় বড় চোখে চেয়ে থাকা কোলের বাচ্চাটাও তার মন মতো করে দাড় করান। কিশোরী মেয়েটা তখনও ঘটনা বুঝতে পারে না। ফ্যাল ফ্যাল চোখে নোরার দিকে তাকিয়ে থাকে।
নোরা টুলের উপর উঠে হাতে ছেনি নিন পাথরের চাইয়ের উপরের দিকে মনোযোগ দেন। পাথরের কাজ অতিরিক্ত ঝুকিপুর্ণ। এই পাথরের চাইটার শরীরে ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হবে কিশোরীর দুঃখী খোড়া শরীর, আর অপুষ্টিতে ভোগা পেটমোটা শিশুটির বিস্ময়কর চোখ। এরা বিদেশের কাছে হতদরিদ্র বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসাবে রিপ্রেজেন্ট করবে।
পাথর শক্ত হলেও ভঙ্গুর। ভুলভাল ছেনি চালালে তা বিকৃত মানুষের শরীরে আরো বিকৃতি এনে দেবে। পাথর কঠিন হলেও অত্যন্ত নাজুক। কোথাও একটু ভুলে ছেনি চালিয়েছো তো পুরো পাথরটাই গচ্চা। সারাক্ষণ এক ধরণের স্নায়ুবিক চাপ কাজ করে পাথরের কাজে।
স্নায়বিক চাপ নিয়ে প্রথমে পাথরের চাইয়ে ছেনি চালান নোরা। শিশুটির বেঢপ বৃহদাকার মাথাটার আকৃতি দিতে হবে আগে। কয়েকবার ছেনি চালানোর পর কান্নার শব্দে তার স্নায়ুবিক চাপ বেড়ে যায়। তিনি বিরক্ত চোখে মডেলের দিকে তাকান। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে কিশোরী মেয়েটি। কান্নার দমকে দমকে ফুলে উঠছে তার শরীর। আশ্চর্যের ব্যাপার! মেয়েটির অন্ধ চোখ গড়িয়েও পড়ছে কান্নার পানি। ওহ! এই দৃশ্যটা যদি পাথরের বুকে ধরে রাখা যেতো!
আশ্চর্য শিশুটি অবাক বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে কিশোরীটির দিকে। কান্নার কারণ অবুঝ মনে বোঝার চেষ্টা করছে। হঠাৎ তীক্ষ্ম কান্নার চিৎকারে চারপাশে খান খান হয়ে যায়। নোরার মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায়। নিরেট পাথরের বুকে হাতের ছেনি কেপে ওঠে।
নাহ! এই জঞ্জাল মডেল নিয়ে কাজ করা সম্ভব নয়। এদের বাড়তে থাকা কান্নার প্রকোপে ঘরবাড়ি ভেসে যাবে। তার নিরবতা ভেঙে খান খান হয়ে যাবে। তার নির্জনতা প্রকাশ পাবে। চারিদিকে তার অবস্থান জানাজানি হয়ে যাবে। ভালয় ভালয় আজ রাতের মধ্যেই আপদ বিদায় করে দিয়ে আসতে হবে। এখখুনি। পাথরের চাই কোন রুপ ধারণ করার আগেই অন্য বয়স্ক মডেল নিয়ে আসতে হবে। শিশু মডেল নিয়ে আর নয়। অনেক শিক্ষা হয়েছে।


মুড নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নোরা সেই রাতে আর পাথরের কাজে নামেন না। তবে পাথরের ঘর থেকে বের হন না তিনি। পাথরের সাথে একাত্মতা দরকার। চর্তুদিক থেকে পাথর পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। পাথরের গায়ে হাত বুলিয়ে, টুলের উপর দাড়িয়ে, বসে, মেঝেতে শুয়ে, কাত হয়ে পাথর পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। স্কাল্পচারের উপর বিভিন্ন ছবিও দেখতে থাকেন পাথর ঘরের উজ্জল আলোয়। কিশোরী মেয়েটার দাড়ানোর জায়গাটায় চোখ বুলিয়ে ভিন্ন পরিকল্পনা খেলে যায় তার মাথায়। পাথরের চাই দেখতে দেখতে সামনে পেছনের পাশের মুর্তিগুলোর দিকে চোখ পড়ে তার। স্থানান্তরিত করায় সেগুলো সদ্য নতুনের মত চকচক করছে। ধুলোর আস্তর পড়ে এখনও মলিন হয়নি সেগুলো। বিকৃত মুর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে নির্জন রাতে একধরণের বিভ্রম ভর করে মাথায়। ওগুলো মুর্তি মনে হয় না। জীবন্ত বিকৃতি কিছু মানুষের সমারোহ! পরের দিন মেঘাচ্ছন্ন বিকালেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন নোরা আহমেদ। ফার্মগেটের ওভারব্রিজের উপর কাঙ্খিত মডেল পেয়ে যান তিনি। কনুইয়ের কাছ থেকে দুইহাত কাটা। হাটুর কাছ থেকে দুই পাও। বিশাল দশাসই শরীরের বিকৃত, বিকলাঙ্গ লাশের মত এক মানুষ পড়ে আছে ওভারব্রিজের উপর। নোরা পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে বিকলাঙ্গের ব্যাপারে খোজ খবর শুরু করে দেন। জানতে পারেন বিকলাঙ্গকে দেখভাল করার জন্য একজন লোক আছে। তিনি তার খোজে যান। লোকটা জানায়, টাকার বিনিময়ে বিকলাঙ্গকে সপ্তাহখানেকের জন্য নিয়ে যাওয়া যাবে ঠিকই, তবে তার জন্য মোটা অংকের টাকা দিতে হবে। তিনি রাজি হয়ে যান। ভিক্ষুকের এজেন্ট জানায়, তবে আজ সন্ধ্যের পরে একে নিতে হবে। সন্ধ্যে পর্যন্ত এখানেই কামাবে বিকলাঙ্গ ভিক্ষুক।

নোরা রাজি হন। তার বেশ কিছু কাজ আছে। এই ফাকে সেরে নেয়া যাবে। এজেন্ট মি: এবাদুর রহমানকে মোবাইলে ফোন দেন, ‘মি: রহমান, ফার্মগেটে নতুন আরেকটা মডেল পেয়েছি। আপনি সন্ধ্যের আগে একটু ফার্মগেটে চলে আসেন। মি: রহমানই তার হয়ে ভিক্ষুকের এজেন্টের সাথে টাকা পয়সার লেনদেন চুক্তিপত্র সারেন। থাকা খাওয়াসহ শরীর স্বাস্থ্যের সকল দেখভাল এ ক’দিন নোরাই করবে। এবং ডিমপাড়া সোনার হাসের পেট চিরে ডিম নেয়া যাবে না। তাকে আবার ফার্মগেটের ওভারব্রিজের উপর এনে দিতে হবে। সব চুক্তিপত্র শেষ হয়। ভিক্ষুকের এজেন্টের হাতে টোকেন মানি দিয়ে মি: রহমান নোরা আহমেদের সাথে ভিক্ষুককে ধরাধরি করে তুলে দেন গাড়িতে। মি: রহমানকে সাথে নিয়ে নোরা আহমেদ ভিক্ষুককে নিয়ে যখন মরা লাসে আসেন তখন সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত নেমে গেছে। দুজনে কাটা হাত পায়ে ধরাধরি করে ভারী শরীরের ভিক্ষুককে ভাস্কর্যের ঘরে এনে ঢোকান। কাজ শেষ করে মি: রহমান ম্যাডামের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যান মরা লাস থেকে।
ভিক্ষুকটা বোবা। নোরা আহমেদ রাতের খাবার ভিক্ষুকের মুখে চামুচে তুলে খাওয়ান। খাইয়ে দাইয়ে পাথরের চাইয়ের পাশে শুইয়ে দেন। লোকটা মরা মানুষের মত নিশ্চল নিথর পড়ে থাকে।
রাতে খুব হালকা খাবার খেয়েই নোরা আহমেদ কাজে লেগে পড়েন। বাড়ির সব বাতি নিভিয়ে দিয়েছেন। শুধুমাত্র স্কাল্পচারের ঘরে জ্বলছে স্বল্প পাওয়ারের বাতি। ঠিক মাথার উপরে। অতিকষ্টে তিনি পাথরের দাড় করানো চাইটাকে শুইয়ে দেন। টুলটা সরিয়ে ছেনি, হাতুড়ি, নিন নিয়ে লেগে পড়েন কাজে। গভীর রাত নেমে গেছে। পুরো পৃথিবীর স্থবিরতা নেমে এসেছে ঘরে। তার ভেতরে নিষ্প্রাণ মুর্তির মত শ্বাস টানছে বিকলাঙ্গ পড়ে থাকা মানুষটি। একাগ্রতায় কাজ শুরু করেন নোরা আহমেদ। পাগলের মতো ছেনি চালাচ্ছেন, হাতুড়ি ঠুকছেন। নিস্তব্দ রাতের স্তব্দতা টুকরো হয়ে যাচ্ছে প্রবল নিঃশ্বাসে এবং ঠুকঠুকের শব্দে।
হঠাৎ লোডশেডিং। নোরা যেন হাঁপ ছেড়ে বাচলেন একটু। একটানা কাজ করতে যেয়ে সমস্ত শরীর ব্যথায় টনটন করছে। কিছুদিনের অনভ্যাসে শরীরে জড়তা এসে গেছে। একটানা কাজ করে পাথরের মাথার কাজ প্রায় হয়ে এসেছে।
তিনি জমাটবদ্ধ অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে দরজার কাছে এলেন। দরজা খুলে বাইরের প্রকৃতির আলোয় দেখে দেখে নিজের ঘরে এলেন। সিগারেটের লাইটারটা হাতড়ে নিলেন টেবিলের উপরে। পাথরে কাজের সময় তিনি ধুমপান করেন না। দুইহাত একত্রে লাগালে ধুমপান করা যায়! তাছাড়া ধুমপানে মনোযোগ বিঘ্নিত হয়। লাইটার জ্বালিয়ে টেবিলের উপর থেকে পানির বোতলটা হাতে নিলেন। ঢক ঢক করে আধেকটা বোতল সাবাড় করে একটা সিগারেট ধরালেন। কয়েকটা টানে ধোয়া মাথার ভেতরে পাক খেতে পাথরের শরীর যেন প্রাণ ফিরে পেল। নিকোটিন মস্তিস্কের কোষে কোষে ঢুকে সমস্ত শরীরের ব্যথা বোধ কমিয়ে দিল। সদ্য কেনা বড় সাইজের মোমবাতির প্যাকেট খুলে একটা মোমবাতি ধরালেন। বাহারী মোমবাতিদানে সেটা রাখলেন। ট্রাউজারের পকেটে গোটা কয়েক মোমবাতি ও সিগারেট লাইটার ঢুকিয়ে নিলেন। এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট অন্য হাতে মোমবাতি নিয়ে অন্ধকারের ভেতরেই চলে এলেন ভাস্কর্যের ঘরে। সিগারেটে কষে একটা টান দিয়ে মোমবাতি দানের মোমবাতিটা ধরালেন। মুহুর্তেই গোটা ঘর ভরে গেল মোমবাতির নরোম আলোয়। আর মোমবাতির সেই নরোম আলোয় শোয়ানো পাথরের চাইয়ের পাশে তাকিয়ে তিনি বিস্ময়ে বিমুঢ় হয়ে গেলেন। দুই পা, দুই হাত কাটা সেই নিশ্চল বিকলাঙ্গ ভিক্ষুকটা সেখানে নেই!


নোরা আহমেদ মোমবাতি উচিয়ে আশে পাশে দেখতে লাগলেন। কোনমতে সরে সরে কোন পাশে চলে গিয়েছে কিনা। তিনি বেশিক্ষণ বিস্মিত অবস্থায় খোজার সময় পেলেন না। সামনের দিকে একটু এগুতেই তার মাথার পিছনে কেউ ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করল। তার হাত থেকে জ্বলন্ত মোমবাতি সামনে ছিটকে পড়ে নিভে গেল। মোমবাতির নেভার মত তিনিও সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে জ্ঞান হারালেন। চোখে মুখের উপর প্রবল পানির ঝাপটায় তার জ্ঞান ফিরে এল। চোখ খুলতেই সামনের এক রাশ অন্ধকার ঢুকে পড়ল চোখে। তিনি আবার চোখ বন্ধ করে ফেললেন। আবার পানির ঝাপটা। তিনি চোখ খুললেন। ক্ষীণ একটা আলোর রেখা কোত্থেকে জানি আসছে। তার পিছন দিক থেকেই। তিনি নিজের অবস্থান বুঝে উঠার চেষ্টা করতে লাগলেন। হাত উপরে তুলতে যেতেই হাতে বাধা পেলেন। তিনি ক্ষীণ আলো চোখ সয়ে আসতে দেখতে পেলেন চুড়ির মত করে দু’হাতই ভারী শিকল দিয়ে বাধা। হ্যান্ডক্যাফের সাথে শিকল লাগানো। তিনি বসে আছেন একটা চেয়ার। নিজের অজান্তেই দুচোখ চলে গেল পায়ে। তার দুপায়ে লোহার বেড়ি লাগানো। বেড়িটা ঠিক হাটুর নিচে এসে গোল হয়ে শেষ হয়ে গেছে। ভয়ংকর ফাসির আসামীদেরই কেবল এরকম লোহার ডান্ডাবেড়ি পরানো হয়। তিনি বুঝতে পারলেন ভয়ংকর কোন চক্রের মধ্যে পড়ে গেছেন। এখন মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। মাথার কথা চিন্তা করতেই মাথার পিছনের চিনচিনে আঘাতের ব্যাথাটা অনুভুত হলো। তিনি শিকল বাধা হাত উচিয়ে মাথার পিছনে হাত দিয়ে দেখলেন। তার বব কাট চুলের মধ্যে মাঝারি মানের একটা আলু উঠে গেছে। তিনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন। ভেবেছিলেন উঠে দাড়াতে পারবেন না। কিন্তু ডাণ্ডাবেড়ি পরে ভাল ভাবেই দাঁড়াতে পারলেন। এমনকি মনে হচ্ছে হাঁটাহাঁটিও করতে পারবেন। সামনের পাথরের চাই আর আশেপাশের মুর্তি দেখে বুঝতে পারছেন চক্রের হাতে পড়লেও নিজের বাড়িতেই আছেন। কেউ অপহরণ করে তাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাইনি। এখানেই বন্দী করে ফেলেছে।
তিনি চেয়ার ছেড়ে সামনের দিকে পা বাড়াতেই পেছন থেকে ভারী পুরুষালী গলা শুনতে পেলেন. ‘আরেকটু বসে জিরিয়ে নিন। একটু ধাতস্থ হোন ম্যাডাম। এখনই হাঁটতে চাইলে টলে পড়বেন। মাথায় আঘাতটা আস্তে দিতে চাইলে একটু জোরেই লেগে গেছে।’
নোরা আহম্মেদ পোড়খোড়া শক্তপোক্ত মহিলা। ভেতরে ভেতরে ভয়ে দমে গেলেও শরীরে তার কোন অভিব্যক্তি ফুটে উঠল না। তিনি মাথা ঘুরিয়ে পিছনের দিকে তাকিয়ে বেশ আদেশের সুরে বললেন, ‘কে? কে আপনি? কি চান এখানে? মাথার খুব কাছ থেকেই জবাব এল, ‘আমি? বলার মত কেউ নই? নামগোত্রহীন বিকৃত বিকলাঙ্গ হাতপা কাটা পঙ্গু এক ভিক্ষুক। এখন আপনার পাথরের মডেল। আর, কি চাই? আপনার কাজে সাহায্য করতে চাই।
নোরা আহমেদ লোকটাকে দেখলেন। মোমবাতির আলোয়। মোমবাতিদানটা লোকটার হাতে ধরা। সেই বিকলাঙ্গ পঙ্গু ভিক্ষুকই। কিন্তু এখন আর বিকলাঙ্গ পঙ্গু নয়। দিব্যি সুস্থ সবল হাতপাওয়ালা মানুষের মত দাড়িয়ে আছে। যদিও ভিক্ষুকের সেই আগের পোশাক পরনে। এমনকি চেহারাটাও সেই ভিক্ষুকের। যাকে তিনি চামচে তুলে নিজে হাতে খাইয়েছেন। এ কিভাবে সম্ভব? হাত পা কাটা একজন মানুষ এভাবে দাড়িয়ে হাতে মোমবাতি ধরে দাড়ায় কিভাবে? মাথা চক্কর দিয়ে উঠলেও তিনি মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করলেন। ভয়ংকর কিছু একটা ঘটে গেছে। এ অবস্থায় মাথা ঠাণ্ডা না রাখলে কোন ভাবেই মুক্তি পাওয়া যাবে না। লোকটা তার মুখের সামনে মোমবাতি ধরে নরোম গলায় বলল, ‘সরি ম্যাডাম, আপনাকে এভাবে ডাণ্ডা বেড়ি পরিয়ে রাখতে চাইনি। কিন্তু কোন রিস্ক নিতে সাহস হলো না। আপনি যেরকম বেপরোয়া মেয়েমানুষ। সাধারণ কোন মেয়েমানুষ হলে এসবের দরকার হতো না। বড় জোর দড়ি দিয়ে বেধে রাখলে হতো। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে…
নোরা আহমেদ কথা শেষ করতে দিলেন না। তিক্ত কন্ঠে বলে উঠলেন, ‘কে আপনি? কী চান আমার কাছে? আমাকে এভাবে বেধে রেখেছেন কেন?
লোকটা মোমবাতিদানটা টুলের উপর রাখল। কাষ্ঠ হাসি হেসে বলল, ‘আপনাকে তো প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছি। বেধে রেখেছি কেন সেটাও বললাম।
‘আপনার আসল পরিচয় কি? আপনি যে পঙ্গু ভিক্ষুক নন সে তো দেখতে পাচ্ছি। কৌশল করে আমার বাড়িতে ঢুকেছেন কেন?
‘কৌশল করে ঢুকেছি, কারণ ওটাই আমার কাজের ধরণ। আমার আসল পরিচয় জানতে চান। আপনি আমি একই গোত্রের মানুষ।
‘মানে?
‘মানে, আমিও আপনার মত একজন শিল্পী। আপনি কাজ করেন পাথর নিয়ে। আমি কাজ করি মানুষ নিয়ে। জীবন্ত মানুষ। আপনি কাজ করেন অসুন্দর বিকলাঙ্গদের নিয়ে। আমি কাজ করি সুন্দর মানুষ নিয়ে। আমি সুন্দরের পুজারী। আমি সৌন্দর্য শিল্পী।
‘আপনার মত ভয়ংকর একজন মানুষ সৌন্দর্যশিল্পী হয় কিভাবে?
‘এই তো ম্যাডাম আপনি ঠিকই ধরে ফেলেছেন। শিল্পী না হলে কি শিল্পীর ব্যাপরে এত সহজে ধরা যায়। আসলেই আমি ভয়ংকর একজন মানুষ। কতটা ভয়ংকর সেটা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।
নোরা আহমেদের বুকের মধ্যে কেঁপে গেল। সত্যি সে ভয়ংকর একজন মানুষের পাল্লায় পড়েছে তাহলে? ‘ভয়ংকর না হলে কি এভাবে ডান্ডা বেড়ি দিয়ে ফাসির আসামীর মত কেউ কাউকে আটকে রাখে? আমি কি ফাঁসির আসামী?
‘আমার কাজের ধরণই ওই রকম। একেকজনের কাজের ধরণ একেক রকম। আপনার যেমন বিকলাঙ্গ মডেল দরকার হয় মুর্তি গড়তে। আমার তেমনি শিল্প সৃষ্টিতে ওসবের দরকার হয়। আপনি আপনার মন মতো মডেল সাজিয়ে নেন। আমিও আমার মন মতো মডেলদের পরিয়ে নেই।
‘আপনার কথার মাথামুন্ড কিছুই বুঝতে পারছি না। কিসের শিল্প সৃষ্টি করেন আপনি? আপনি শিল্পের কোন শাখায় বিচরণ করেন?
‘সর্বোচ্চ শাখায়। সেটা শুনতে আপনার ভাল লাগবে না।
‘ঠিক আছে। আমার ভাল লেগে কাজ নেই। শুনতেও চাচ্ছি না। এখন আমার হাত পা থেকে এসব শিকল ফিকল খুলে দেন। আর আপনি বিদায় হোন। আপনার মত মডেলের আমার দরকার নেই।
লোকটা মোমবাতিটা নিচে নামিয়ে রেখে টুলে বসতে বসতে বলল, ‘আপনার দরকার না থাকতে পারে, আমার দরকার আছে। আমার শিল্প সৃষ্টিতে দরকার আছে। আগে আপনার কথা মত কাজ হয়েছিল, এখন আমার কথা মত কাজ হবে। আপনি অতি উচ্চ শিক্ষিতা। বুঝতে পারছেন না কেন আপনি আমার হাতে বন্দী। এই বাড়ির সাথে আপনি সকল সংযোগ বিছিন্ন করে রেখেছেন। কেউ আপনাকে খোজ করতেও আসবে না। আপনার মোবাইলটাও এখন আমার কাছে। আপনি কারোর সাথে যোগাযোগও করতে পারবেন না।’
লোকটা নোরা আহম্মেদের মোবাইল বের করে হাতে নিল। অন্ধকারে মোবাইল আলোকিত হয়ে উঠল। লোকটা সুইচ টিপে মোবাইলটা ডেড করে দিয়ে বলল, ‘বাইরের দুনিয়ার সাথে সব যোগাযোগ ছিন্ন করে দিলাম। এখন কেউ চাইলেও আর কোন যোগাযোগ করতে পারবেনা। এখন শুধু এই বাড়িতে আপনি আর আমি। দু’জন শিল্পী। একজন বিখ্যাত। একজন কু…’
ইলেকটি্রুসিটি চলে এল। মাথার উপরের ঝুলানো স্বল্প পাওয়ারের বাল্বটা তার সাধ্যমত গোটা ঘর আলোকিত করার চেষ্টা করল। নোরা আহমেদ উঠে দাড়ালেন। দেখলেন তার দুই হাতের শিকল ঘরের দুপাশের দুই আংটায় মজবুত ভাবে আটকানো। তিনি কয়েকবার দুই হাতে ঝাকি দিলেন। শিকল নড়ে উঠল। হাতে ব্যথা পেলেন তিনি। পায়ের ডান্ডাবেড়ির কারণে একটু নড়াচাড়া করতেই শিকলের আওয়াজ ঝংকৃত হলো।
লোকটা টুল থেকে উঠে দাড়াল। রাগত স্বরে বলল, ‘ম্যাডাম কোন রকম ঝামেলা করার চেষ্টা করবেন না। আপনার শিকলের শব্দ শুনে কেউ আসবে না এখানে। কেউ না।’ লোকটা হাতের ডেড মোবাইলটা তার গড়া একটা স্কাল্পচারের গায়ে ছুড়ে মারল। টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেল প্লাস্টিকের শখের দামী ক্ষুদে যন্ত্রটা।
নোরা আহমেদ এবারে সত্যিকারের ভয় পেলেন। এতক্ষণ লোকটার কন্ঠস্বরে কিছুটা নমনীয়তা থাকায় তিনি একরকম খেলা ভেবেছিলেন। কিন্তু এখন বুঝতে পারলেন এটা খেলা বটে। তবে মরণখেলা। তিনি ঢোক চিপে কোন মতে চিচি করে বললেন, ‘আপনি আমার সাথে এরকম করছেন কেন? কি ক্ষতি করেছি আমি আপনার?
‘কিচ্ছু না। এই বিকলাঙ্গ মানুষগুলো আপনার কোন ক্ষতি করেনি। আপনি তাদের নিজের শখে তুলে এনে মডেল বানিয়েছেন। ঠিক সেরকমই, আমার নিজের শখে আমি আপনাকে মডেল বানিয়েছি। এটা শখের খেলা। শখের শিল্প, আর কিছু না। বিকলাঙ্গ হতভাগ্য মডেলগুলোর জন্য আপনার কোন মায়ামমতা নেই। আপনি জানেন কাজ, সম্মান, খ্যাতি। ওদের ভাগ্য ফিরানোয় আপনার কোন হাত নেই। ওদের দিয়ে নিজের ভাগ্য ফেরাতে ব্যস্ত আপনি। ওদের দেখার সময় কোথায় আপনার? শিল্পের তো এইই নিয়ম, তাই না ম্যাডাাম? শিল্পের কাছে শিল্পই বড়, মানুষ নয়। আমিও শিল্পী। আমার কাছেও আমার শিল্পও বড়, মানুষ নয়।
‘আপনি আমাকে নিয়ে কি করতে চান? খুন?
‘ইউ আর এ জিনিয়াস ম্যাম। এত সহজেই ধরে ফেললেন ব্যাপারটা? জি ম্যাম। সেটাই আমার শিল্প। আমি একজন সিরিয়াল কিলার। প্রতিটি সিরিয়াল কিলারই একজন উঁচু মানের শিল্পী। আমার ক্ষেত্রটা আবার অন্যরকম। আমি যেকোন মানুষকে হত্যা করি না। সুন্দরী, বিখ্যাত মহিলাদের তারিয়ে তারিয়ে হত্যা করেই শিল্পের সুখ উপভোগ করি। আপনি সমাজ সচেতন মানুষ। আপনার নিশ্চয় জানা থাকার কথা, পত্রপত্রিকায় পড়ার কথা বিখ্যাত সুকণ্ঠী গায়িকা শাফিনা কাদেরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা। বিকৃত লাশের কথা। আমিই সেই শিল্পী। আমিই সেই খুনী। আমাকে খুনী শনাক্ত করেছে চতুর পুলিশ। খুনের দায়ে ফেরারী আসামী হয়ে ঘুরছি আমি। আপনার এই নির্জন বাড়িটাই নির্বিঘ্নে পালিয়ে থাকার সবচেয়ে সুরক্ষিত জায়গা। পাশাপাশি আরেকটা শিল্পকর্মের। কি বিশ্বাস হচ্ছে না আমার কথা? ঠিক আছে পেপারের এই কথাগুলো তো বিশ্বাস করবেন?’
লোকটা তার ভিক্ষুকের পোশাকের ভেতর থেকে একটা খবরের কাগজের পাতা বের করে নোরা আহমেদের হাতে ধরিয়ে দিলেন। হতবুদ্ধি নোরা আহমেদ জম্বির মত ভাবে কাগজটা হাতে নিয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন।
কাগজের ছবিটার দিকে তাকিয়ে একবার লোকটার মুখের দিকে তাকালেন? এই লোকটাই তাহলে সেই কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার আব্রাহাম কাদিচ? ভয়ে নোরা আহমেদের অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল।
আব্রাহাম কাদিচ নোরা আহমেদের মুখের সামনে নিজের মুখটা এনে ক্রুর হাসি হেসে বলল, ‘জ্বি ম্যাডাম, এই অধমের নাম আব্রাহাম কাদিচ। আর এই আব্রাহাম কাদিচের শিল্প সৃষ্টির হাতিয়ার।’ কাদিচের হাতে ধারালো ছোরা। বৈদ্যুতিক আলোয় চকচক করছে। আব্রাহাম কাদিচ হাত বাড়িয়ে উপরের সুইচের দড়ি ধরে টান দিয়ে বাতি নিভিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমিও আপনার মত অন্ধকারে সৃষ্টি করতে ভালবাসি।


সাজু মকবুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কল্কেতে আস্তে টান দিস মকু। সেদিন শুনলাম কে নাকি গাঁজার কল্কেতে পুরো দম দিয়ে টান দিতে গিয়ে বুক ফেটে মরে গেছে।
‘বুক ফেটে আবার মানুষ মরে কিভাবে?
‘ওই তো লাংস না কি বলে না তাই ফট করে বার্স্ট হয়ে গেছে। জায়গায় চিৎপটাং।
ওপাশ থেকে কুজো বলে উঠল, ‘আরে ধুর! ওইসব গাজাখুরি। লোকজন যাতে গাজায় দম না দেয় এইজন্য বানানো। আমার লাংস অতো ঠুনকো না যে গাজায় টান দিয়ে ফাটবে। লাংস শালার দম আছে।
মকবুল তার টান শেষে কুজোর হাতে কল্পে পাস করতে করতে চোখ লাল করে বলল, ‘লাংস ফাটলে ফাটবে, তয় গাজায় দম না দিয়ে থাকতে পারব না।
সাজু বলল, ‘তাই ছাড়া আর করবি কি? তোর কেয়ারটেকারের চাকরিটা নাকি চলে গেছে? ওই বাড়িতে নাকি কোন খান্ডারনী মহিলা এসেছে। তোকে ওখানে যেতে নিষেধ করেছে।
‘নিষেধ করেছে ঠিকই। কিন্তু মাস গেলে নাকি বেতন দেবে। এই মাসটা যাক দেখি কি হয়।
‘মহিলার ব্যাপারটা কি? কোন দুই নম্বরীর কাবারটারবার আছে নাকি? মানে ওই যে চামড়ার ব্যব…
মকবুল বাধা দিল, ‘আরে না না। ওরকম কিছু না। কি নাকি গুরুত্বপূর্ণ কাজ নাকি করবে নিরবিলিতে বসে। কেউ আসবে না। ওই ম্যানেজার ব্যাটাও না।
‘কি কাজ জানিস কিছু?
‘নাহ! এক গাদা কাঠের বাক্সটাক্স নিয়ে এসেছে। সেগুলোতে কারো হাত লাগাতে দেয়নি। বলে ওতে নাকি এমন কিছু আছে যার দামের কোন ঠিকঠিকানা নেই..
‘মানে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা…তাই না? একবার জিনিসগুলো কি দেখা দরকার…বিদেশী জাদুঘরের মুর্তির চোরাচালানী টালানী কিনা…
মকবুল বলল ‘তোর ইচ্ছে হয় তুই ওই বাড়িতে যেয়ে দেখে আয়। আমি ওর মধ্যে নেই। ম্যাডামের হাতে ধরা পড়লে মাসের বেতনটাও যাবে। বাড়িওয়ালার চাকরিটাও যাবে।
‘মাসে আর কয় টাকা বেতন পাস? একবার যদি সেরকম দান ধরা যায় সারাজীবনের জন্য নিশ্চিন্ত।
ওপাশ থেকে কুজো বলে উঠল, ‘আর সেরকম বুঝলে মাগী হেরিতেরি করলে জন্মের মত সিধে করে..
মকবুল আতকে উঠল. ‘উহু। ওসব ঝামেলায় যাওয়া যাবে না। ম্যাডামের হাত কিন্তু খুব লম্বা..
সাজু ধমকে উঠল. ‘ধুত্তোর হাত লম্বা। হাতে টাকা আসলে আমাদেরও হাত লম্বা হয়ে যাবে। শোন, মকু, ওই বাড়ির কোথায় কি আছে, কিভাবে ঢুকব আমরা কিছুই জানি নে, তুই বাড়ির সবকিছু জিনিস, তোকে আমাদের সাথে থাকতেই হবে। তারপর দেখ কি করি…
মকবুল গলা নামিয়ে বলল, ‘তার আগে একটা কাজ আছে। ম্যানেজার ব্যাটাকে আগে শায়েস্তা করতে হবে। ওই ব্যাটা যদি বাড়িতে থাকে কিছুই করা যাবে না। ম্যানেজারের কাছে পিস্তল আছে। আমি দেখেছি।
‘ঠিক আছে। ম্যানেজারের পিস্তল থাকলে আমরাও তা নেব। তুই ম্যানেজারের সাথে যোগাযোগ রাখ। আমি এদিকটা দেখছি। জোগাড়যন্ত্র করতে হবে। এই মওকা কোনমতেই ছাড়া যাবে না।

চকচকে ছুরি এবং অন্ধকার ঝপ করে নেমে আসতেই নোরা আহমেদ সামনে মাথা ঝুকিয়ে দিলেন। আব্রাহাম কাদিচ ডান হাতে ছুরি ধরে বাম হাতে নোরার মুখখানা তুলে দেখল অজ্ঞান হয়ে গেছে। অজ্ঞান মডেল নিয়ে সে কোন শিল্প সৃষ্টি করে না। সে স্বগোক্তির মত বলল, ‘থাকুক কিছুক্ষণ ওরকম। এই ফাকে কিছু কাজ সেরে নেই। এই ভিক্ষুকের পোশাক দিয়ে বোটকা গন্ধ বেরুচ্ছে। এটাই আগে চেঞ্জ করতে হবে। ঘরে কি পরার মত কিছু আছে? এই মহিলা যখন ট্রাউজার টিশার্ট পরে তখন তার আরেক সেট নিশ্চয় আছে।’
সে নোরা আহমেদকে অন্ধকারের মধ্যে রেখে দরজা আবজিয়ে নোরার বেডরুমে চলে এল।
আব্রাহাম কাদিচের চলে যাওয়া নিশ্চিত হতেই নোরা মাথা তুললেন। অন্ধকারে চোখ সয়ে আসতেই আছড়ে ভাঙা মোবাইলটার দেখতে চেষ্টা করলেন। না, সেটা যেভাবে ভেঙেছে কোন কাজ হবে বলে মনে হয় না। উঠে দাড়াতেই শিকল ঝনাৎ করে শব্দ করল। তিনি আরো সাবধানে চেয়ার থেকে উঠলেন। হাত যেভাবে বাধা তাতে রুমে ভেতর কিছুটা চলাচল করা যাবে কষ্টে সৃষ্টে। তিনি অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে পাথরের চাইয়ের পেছনে চলে এলেন। ওপাশে তার ছেনি নিন হাতুড়ি পড়ে আছে। শিকলের আবার শব্দ হলো। বারান্দায় পায়ের শব্দ। তিনি ধারালো নিনটা পায়ের তলায় লুকালেন। তারপর সেটা পা দিয়ে টানতে টানতে চেয়ার পর্যন্ত নিয়ে এলেন।
পেছনে দরজা খুলে গেল। তিনি পায়ের তলায় নিনটা চাপা দিয়ে মাথা সামনে ঝুকিয়ে অজ্ঞানের ভান করে চেয়ারে বসে রইলেন। আব্রাহাম কাদিচ ঘরে ঢোকার আগে নিনটা কোনরকমে তুলে নিয়ে ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে ফেললেন।
আব্রাহাম কাদিচ ঘরের ভেতর এসে আলো জ্বালল। নোরাকে সেভাবে দেখে মাথা ধরে বার কয়েক ঝাকাল। ‘ম্যাডাম? ব্যাপার কি আপনার? ছুরি দেখেই অজ্ঞান হয়ে গেলেন? আপনাকে তো আমি অসীম সাহসী ভেবেছিলাম। এরকম নির্জন একটা বাড়িতে একাকী রাত কাটানো তো প্রচণ্ড সাহসের কাজ।
নোরা আহমেদ নড়ে উঠলেন। ‘উঠুন। উঠে পড়ুন। এই মুহুর্তে আপনাকে নিয়ে শিল্প সৃষ্টির ইচ্ছে আমার নেই। ওটা ধীরে সুস্থে করা যাবে। বরং আপনার ভাস্কর্য সৃষ্টি দেখতে চাই।
নোরা মাথা তুলে চোখ মেলে তাকালেন। খুনীটা তারই টিশার্ট গেঞ্জি পরে ভদ্রস্থ হয়ে এসেছে। দেখতে খারাপ লাগছে না। লম্বা, তামাটে গড়নের লোকটার চেহারায় খুনীর প্রকট ভাব। হাতে চকচকে ছুরি নেই।
‘কি করতে হবে আমাকে?
‘একটা স্কাল্পচার বানাতে হবে।
‘মডেল কোথায়? কার স্কাল্পচার বানাবো।
‘আমার স্কাল্পচার বানাবেন। মডেল আমিই।
‘মানে?
‘মানে খুবই সোজা। আপনি বিকলাঙ্গ মানুষের ভাস্কর্য বানাতে অভ্যস্ত। আমি একজন বিকলাঙ্গ মানুষ। মানসিক ভাবে বিকলাঙ্গ। আমার স্কাল্পচার বানাবেন। আমাকে দেখে আমার মনের বিকলাঙ্গতা স্কাল্পচারে ফুটিয়ে তুলবেন। তবেই বুঝব আপনি মহান শিল্পী। নিন, কাজ শুরু করে দিন। পাথরের চাই এখনও আস্তই আছে। আশা করি আমার ভাস্কর্য বানাতে সমস্যা হবে না।
নোরা আহমেদ ঝাঝের সাথে বলে উঠলেন ‘আমার হাত পা বাধা। আমি স্কাল্পচার বানাবো কিভাবে? এই বাধা হাত পায়?
‘ঠিক আছে। আপনার হাতের শিকল খুলে ওটা পায়ে লাগিয়ে দিচ্ছি। ভাস্কর্য বানাতে নিশ্চয় পা লাগবে না?
আব্রাহাম কাদিচ ট্রাউজারের পকেট থেকে ছোট্ট রুপালি একটা চাবি বের করল। নোরার বাম হাতের হাতকড়ার মত জায়গায় চাবি ঢুকিয়ে খুলে দিল। তারপর শিকলটা পায়ের ডাণ্ডা বেড়ির সাথে লাগিয়ে দিল। এরপর ডান হাতেরটা খুলে ডান পায়ে।
নোরা আহমেদ শান্ত স্বরে বললেন, ‘পায়ের শিকলও আপনাকে খুলে দিতে হবে। আমার একটু বাথরুমে যাওয়া দরকার। চাপ নিয়ে শিল্প সৃষ্টি করা যায় না।’
‘ঠিক আছে। পায়ের শিকলটাও খুলে দিচ্ছি। তবে ডাণ্ডা বেড়ি নয়। আর কোনরকম চালাকি করার চেষ্টা করবেন না। আমি যে কত ভয়ংকর হতে পারি এটুকু ধারণা নিশ্চয় আপনার হয়ে গেছে।’
শিকল খোলার পর নোরা আহমেদ ঘরের এটাচড বাথরুমের দিকে এগুতেই আব্রাহাম কাদিচ বাধা দিল, ‘আপনার ট্রাউজারের পকেটের নিনটা রেখে যান। বাথরুমে কোন অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না।
নোরা আহমেদ মুখ চুন করে পকেট থেকে নিনটা বের করে আব্রাহাম কাদিচের হাতে দিলেন।
বাথরুমে ঢুকে নোরা আহমেদ কোন সুবিধে করতে পারলেন না। বাথরুমের ওপাশে খুনী দাড়িয়ে আছে। বেশিক্ষণ দেরী করা যাবে না। দেরী করলেও লাভ হতো না। এক টুকরো ভেন্টিলেটর দিয়ে হু হু করে অন্ধকার ঢুকছে। ওটা ভাঙলে কোন উপায় হলেও হতো। কিন্তু ভাঙার কোন উপকরণ তার হাতে নেই।
নোরা ঢুকতেই আব্রাহাম কাদিচ আমুদে গলায় বলল, ‘কি ফ্রেশ হয়েছেন? এখন কাজে লেগে পড়ুন। কফি টফি কিছু বানিয়ে আনব নাকি? তাহলে পায়ে শিকল পরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।
আব্রাহাম কাদিচ সত্যি সত্যি তার পায়ে শিকল লাগিয়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল। এবারে নিন হাতুড়ি ছেনি এরকম জায়গায় রেখেছে যেখানে তার হাতের নাগাল না যায়।
কিছুক্ষণ পর কাদিচ ফিরে এল। তার হাতে ধোয়া উড়া দুমগ কফি। নোরার হাতে এক কাপ বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, ‘নিন। কফি খান। রাত জেগে কাজ করতে হবে। কফি টনিকের কাজ করবে।
নোরা হাত বাড়িয়ে কফির কাপ নিতে নিতে বলল, ‘আমার রাত জাগা অভ্যাস আছে।
‘জানি। আপনাকে অনেক দিন ধরেই চোখে চোখে রেখেছি তো। আপনারও রাতের কাজ। আমারও।’
নোরা ভেতরে ভেতরে চমকে উঠলেন। তাহলে এই খুনী তাকে আগেই টার্গেট করেছে। ভিখারী সেজে ঢুকেছে ভেতরে। সত্যিকারের শিল্পীর মত সব গুছিয়ে নিয়েছে। গরম ধোয়া ওঠা কফিতে চুমুক দিয়ে নোরার একটু ভাল লাগল। অসাধারণ কফি বানিয়েছে খুনীটা। প্রতিভাবানরা সব কাজেই চরম প্রতিভা ব্যবহার করে। সামান্য কফি বানানো থেকে মানুষ খুনেও।
কফি শেষ করে আব্রাহাম কাদিচ উঠে দাড়াল। ‘আপনার সিস্টেমটা কি? কিভাবে মুর্তি গড়বেন? দাড়িয়ে থাকব না চেয়ারে বসব?
‘আপনার যেরকম ইচ্ছে।
‘দাড়ানোয় ভাল। বসা অবস্থায় ক্রুরতা প্রকাশ পায় না। দাড়ানো শরীরে অনেক বেশি হিংস্রতা, খুনের ভাব আসে। বসে মানুষ খুন করা যায় না।’
‘ঠিক আছে, পাথরটার হাত খানেক বাম পাশে দাড়ান।
‘টিশার্ট খুলে ফেলি কি বলেন? মনের বিকলাঙ্গতা ফুটিয়ে তুলতে গেলে শরীর দেখানোর দরকার আছে।’ বলে টিশার্ট খুলে পাশের বেঢপ বিকলাঙ্গ একটা মুর্তির উপর টিশার্টটা রাখল। ‘এই সবগুলো মুর্তিই কি বিকলাঙ্গ মানুষকে মডেল বানিয়ে করেছেন?
‘হ্যাঁ। মডেল ছাড়া আমি স্কাল্পচার গড়তে পারি না।
‘এতো মডেল জোগাড় করেছেন কিভাবে?
‘যেভাবে ভিক্ষুক মডেলকে জোগাড় করেছিলাম।’ নোরা ব্যঙ্গাত্বক গলায় বললেন।
‘ও তাই তো। টাকা থাকলে পৃথিবীর কোন কিছুই জোগাড় করা আপনাদের পক্ষে অসম্ভব নয়।
‘আপনি কি কথাই বলবেন নাকি চুপ করে দাড়াবেন। মডেলরা কথা বলে না।
‘ঠিক আছে, চুপ করার আগে আরেকটা প্রশ্ন করি। এই একেকটা মুর্তি গড়ার পর আপনি প্রদর্শনীটনী করে কেমন টাকা পান?
‘অনেক। লাখের উপরে।
‘বিকলাঙ্গ মডেলদের কেমন টাকা দেন?
‘ওদের সন্তুষ্টির মত টাকা দেই। ওরা খুশী হয়ে আগের জীবনে ফিরে যায়।
‘ওদের জন্য আর কিছু করেন না?
‘আর কি করব?
‘তা ঠিক, আর কি করবেন? আপনার কাজ তো শেষ। খ্যাতি, সম্মান অর্থ সবই তো পেয়েছেন আর কি? আচ্ছা, আর কোন কথা বলছি না। নট নড়ন চড়ন। স্টাচু। আপনি আপনার কাজ শুরু করুন।
মনে বিষ নিয়ে নোরা পাথরের চাইয়ে নিন ধরে। হাতুড়ি চালায়। এই পাথরটাই অপয়া। কিশোরী মেয়েটা কেদে কেটে চলে গেল। মুর্তি গড়া হলো না। হাত পা কাটা বিকলাঙ্গ ভিক্ষুককেও করা গেল না। এখন এই খুনীর মুর্তি গড়। মুর্তি গড়া শেষ হলে যে তাকে খুন করে ফেলবে। কি অদ্ভুত!
নোরা নিন হাতে অতি সাবধানে পাথরে চাচ দেয়। মডেল দেখার চোখ দিয়ে তিনি খুনীকে দেখেন। তার পাথরের চাইয়ের আর খুনীর দুরত্ব মনে মনে মেপে নেন। দুহাতের শিকল খোলা। এক হাতে ধারালো নিন, অন্য হাতে এক তাল লোহার হাতুড়ি। তার মাথা দ্রুত কাজ করে। খুনীটার ট্রাউজারের পকেটে শিকল খোলার চাবি। এক লাফে খুনীটার গায়ের উপর পড়ে খোলা বুকে নিন বিধিয়ে এক সাথে হাতুড়ি দিয়ে যদি কষে বাড়ি কষানো যায়। একেবারে মেরে ফেলার কোন ইচ্ছে তার নেই। আপাতত কিছুক্ষণের জন্য যদি অজ্ঞান করে দেয়া যায়। সেই ফাঁকে চাবি নিয়ে শিকল খুলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাবে সে। বাকিটা যা করার মি. রহমানই করবে।
নোরা পরিকল্পনা একে ঠুকঠুক করে কাজ করে যেতে থাকেন। দাড়িয়ে দাড়িয়ে খুনীটার শরীরের শক্তি কমিয়ে আনতে হবে। পা ধরে যাবে। হাত পা অবশ হয়ে যাবে। ঝিমুনি এসে যাবে। তখনই কাজে লাগতে হবে। এই সুযোগ দুবারে হবে না। যা করার এক বারে করতে হবে।
ঘন্টাখানিক এক নাগাড়ে কাজ করে আগের কানের থেকে গলার কাছ পর্যন্ত আসে। আব্রাহাম কাদিচ অধের্য হয়ে পড়ে। ‘আপনাদের কাজের সিস্টেম এরকম নাকি। এরকম বিরক্তিকর কাজ আমি জীবনে দেখেনি।
‘মডেল অধৈর্য হলে মুর্তি গড়তে পারি না আমি। চুপ করে দাড়িয়ে থাকুন। আমি দাড়িয়ে কাজ করতে পারলে আপনি পারছেন না কেন?
‘কে বলল পারছি না। দেখুন, এরপর কোন নড়াচড়া না করে ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থাকব।’ আব্রাহাম কাদিচ মুখ বন্ধ করে দাড়িয়ে রইল। মহিলার ধৈর্যর সাথে একাগ্রচিত্তে কাজ করা দেখে সে অভিভুত হয়েছে। এমনকি ধীরে ধীরে সে যে মহিলার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে তা সে বেশ বুঝতে পারছে। এর আগে কোন কাজে তার এমনটি হয়নি। একবারেই কাজ শেষ করেছে। তাই সে অজ্ঞান হয়ে যাক আর জাহান্নামে যাক। কিন্তু একে হত্যা করতে গিয়ে ছুরি তুলেও অজ্ঞান হওয়া দেখে বিরত থেকেছে। তখনই বোঝা উচিত ছিল যতই সময় যাবে ততই মহিলাকে হত্যা করা কঠিন হয়ে পড়বে। টার্গেটের সাথে মেলামেশা না করাই সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা। মানুষের মন একবার দুর্বল হলে দুর্বল হতেই থাকে।
আব্রাহাম কাদিচ যখন এইসব ভাবছে তখনই নোরা ভাবছে নিন হাতুড়ির উপযুক্ত ব্যবহার। খুনীটা এখন অন্যমনস্ক হয়ে আছে। এটাই মোক্ষম সময়।
নোরা ক্ষ্যাপা ডাইনীর মত আব্রাহাম কাদিচকে হতচকিত করে দিয়ে এক লাফে সামনে এসে পড়ল। অতি উত্তেজনায় হাত কেপে যাওয়ায় ধারালো নিনটা ঠিক বুকে বসাতে পারল না। সরে গিয়ে হাত ও বগলের মাঝামাঝি লাগল। তবে হাতুড়ির বাড়িটা পড়ল জায়গা মত। একটা আর্ত চিৎকার দিয়ে মেঝেতে ঢলে পড়ল খুনী।

মাটিতে লুটিয়ে পড়া আব্রাহাম কাদিচের কাধের ক্ষত থেকে গল গল করে রক্ত ঝরতে লাগল। নোরা আহমেদ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল না। সে অজ্ঞান মুখ থুবড়ে পড়া কাদিচকে ঠেলে চিৎ করে দিয়ে তার ট্রাউজারের পকেটে হাত ঢোকাল। না, ডান পকেটে নেই। এবারে বাম পকেট। না, এখানেও চাবি নেই। কিন্তু নোরা স্পষ্ট দেখেছে লোকটা তার পায়ে শিকল পরিয়ে দিয়ে চাবিটা ট্রাউজারের পকেটে রেখেছে। সে ক্ষ্যাপার মত হয়ে গেল। লোকটাকে উল্টে পাল্টেও চাবিটা না পেয়ে তার মাথা খারাপের মত হয়ে গেল। কোথায় রাখতে পারে চাবিটা? টিশার্টের সাথে? চোখ গেল টিশার্টের দিকে। একটা বিকলাঙ্গ মুর্তির উপর রাখা। মুর্তিটা তার হাতের নাগালের বাইরে। পায়ের শিকলে টান পড়ায় মুর্তিটাকে ধরা যাচ্ছে না। নিনটা খুনীর গায়ে বেধে আছে। হাতুড়িটা এক পাশে ছড়ানো। তিনি ঝুকে হাতুড়িটা তুলে নিলেন। হাতুড়ি বাড়িয়ে কোনমতে মুর্তির গায়ে ছোয়া যাচ্ছে। তিনি হাতুড়ির ডগা দিয়ে মুর্তির গায়ে একটু একটু করে ধাক্কা দিতে লাগলেন। ধাক্কার পর ধাক্কায় জোর হওয়ায় বিকৃত মুর্তিটা স্টান্ডের উপর দুলতে লাগল। তিনি হাতুড়ি দিয়ে ঠেলে ঠেলে দুলুনি বাড়িয়ে দিলেন। দুলতে দুলতে মুর্তিটা স্টান্ডের উপর নড়বড়ে হয়ে গেল। আরেকটু দুলুনি দিলেই পড় পড়। নোরা আহমেদ হাতুড়ি দিয়ে জোর একটা দুলুনি দিয়ে চট করে সরে এলেন। না হলে মুর্তি তার পায়ের উপরেই পড়তো। বিশাল এক মানুষ সমান ভারী পাথরের মুর্তিটা হুড়মুড় করে মাথার উপরের টিশার্টশুদ্ধ হুড়মুড় করে মেঝেতে পড়ল। মুর্তির হাতের একাংশ গিয়ে পড়ল অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা আব্রাহাম কাদিচের গায়ের উপর। নড়ে উঠল আব্রাহাম কাদিচ।
টং শব্দ করে টিশার্টের ভেতর থেকে চাবিটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে দুরে সরে গেল। নোরা আহমেদও উন্মত্তের মত চাবি লক্ষ্য করে ঝাপিয়ে পড়লেন। পায়ের শিকলে টান পড়ল। তিনি শুয়ে পড়ে চাবির দিকে হাত বাড়ালেন। চাবি হাতের নাগালের বাইরে। ওদিকে খুনীটার নড়ে ওঠা তার নজর এড়ায়নি। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। এখন এক হাত লম্বা হাতুড়িটাই শেষ ভরসা। তিনি আবার পেছনের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে হাতুড়িটা কুড়িয়ে নিলেন। শুয়ে পড়ে হাতুড়ি বাড়িয়ে দিলেন। নাহ হাতুড়ির মাথাও নাগাল পেল না চাবির। একটুর জন্য। মাথা খারাপের মত হয়ে গেল নোরার। কি করা যায়!
হঠাৎ নজরে পড়ল ছিটকে পড়ে থাকা টিশার্টের উপর। ওটা নিশ্চয় হাতুড়ির চেয়ে লম্বা হবে। তিনি হামাগুড়ি দিয়ে টিশাট হাতে নিলেন। আবার শুয়ে পড়ে চাবির দিকে টিশার্ট ছুড়ে দিলেন। হালকা কাপড়ের জিনিস চাবির উপর পড়ল না। আবার চেষ্টা। নাহ, এবার উপরে পড়লেও চাবিটাকে নাড়াল না। এবার চাবিটা একটু নড়ল। একটু কাছে এল। আবার। এবার আরেকটু কাছে। এবার একেবারে হাতের নাগালে।
আব্রাহাম কাদিচের দিকে তাকাবার সময় নেই তার। চাবি নিয়ে উত্তেজনায় কাপতে থাকা হাতে শিকল খোলার চেষ্টা করলেন। প্রথমে খোপে ঢুকলই না। পরের বারে কাজ হলো। খুলে ফেললেন বামপায়ের শিকল। ডান পায়েরটা খুলতে সময় লাগল না।
এক লাফে চলে এলেন দরজার কাছে। দরজা বন্ধ। প্রথমে বাইরে থেকে বন্ধ ভেবে কয়েকবার টানটানি করলেন। কিন্তু বাইরে থেকে তালা দেয়া কোন মতেই সম্ভব নয়। এ ঘরে প্রবেশের দরজা এই একটাই। তাহলে দরজা বন্ধ কেন? চোখ চলে গেল দরজার উপরে। দরজার উপরের ছিটকিনি লাগানো। হাপ ছেড়ে বাচলেন তিনি। নাহ, তাহলে ভয়ের কিছু নেই। শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেলেন তাহলে।
ছিটকিনি হাত দিয়ে খুট করে খুলে ফেলতেই গোটা রুম ভরে গেল অন্ধকারে। লোডশেডিং নাকি? মাথার পেছনে হাতুড়ির আঘাতে টলে পড়তে পড়তে বুঝলেন ওটা লোডশেডিং নয়। খুনীটাই নিভিয়ে দিয়েছে। তার জীবনপ্রদীপও নিভে আসবে এইবার। সত্যিকারের অজ্ঞান হয়ে পড়লেন তিনি।

আব্রাাহাম কাদিচ ক্ষত জায়গাটায় এক হাত দিয়ে টি শার্ট চেপে ধরে অন্য হাতে নোরার ডান্ডাবেড়ি টানতে টানতে ঘরের মাঝামাঝি নিয়ে এল। দাত দাত চেপে ব্যথা সহ্য করে অজ্ঞান নোরার দুই হাতে আবার শিকল পরিয়ে হ্যান্ডকাফ লক করে দিল। এবারে অন্য শিকল এনে দুহাতের হ্যান্ডকাফের সাথে দুই পায়ের ডান্ডাবেড়িতে আটকে দিল যাতে নড়াচড়া করতে না পারে। এই মুহুর্তে হারামজাদীকে খুন করে ফেলতে পারলেই সবচেয়ে ভাল হতো। কিন্তু কিছুটা দুর্বলতা, কিছুটা অন্য একটা পরিকল্পনা মাথায় ঘোরায় সে আর সেই কাজে গেল না। তেজী **কে রসিয়ে রসিয়ে খুন করাই সবচেয়ে ভাল হবে। তার চেয়ে ভাল হবে এক ঢিলে দুই পাখি মারা।
ভাস্কর্যের ঘর থেকে নিন, ছেনী, হাতুড়ি, টিশার্ট সবই সরিয়ে ফেলল সে। ঘর অন্ধকার করে দিয়ে বাইরে দরজা ভারী চাইনিজ তালা লাগিয়ে দিল। তারপর চলে এল নোরার বেডরুমে। ফার্স্ট এইডের বক্স খুজে বের করল। এন্টিসেপটিক ও ব্যান্ডেজ লাগিয়ে নিল ক্ষতেয়। দুটো ব্যথার ওষুধ একবারে খেয়ে নিল। রক্তমাখা টিশার্টটা ফেলে দিয়ে আরেকটা কলারওয়ালা শাদা মেয়েলী শাট খুজে পেল ওয়ার্ডরোবে। সেটাই পরে নিল। তুলে নিল গাড়ী ও গেটের চাবি। তারপর ঘর অন্ধকার করে মরা চাদের আলোয় বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে।
গ্যারেজ থেকে গাড়ি চালিয়ে গেট খুলল। বাইরে বেরিয়ে আবার তালা দিয়ে রাখল। তারপর বেরিয়ে পড়ল বাড়ি ছেড়ে।
১০
মকবুল সাজু আর কুজো আজ রাতে বাড়িতে হানা দেবে চিন্তা করে বাড়ির আশেপাশে রেকি করছিল। বাড়ির পিছনদিক দিয়েই ঢোকা নিরাপদ মনে করে একটা ঝোপের আড়ালে বসে পরিকল্পনা আটছিল। মকবুলই আগে ঢুকবে। তার পিছনে সাজু। ওরা নিরাপদ মনে করলে সংকেত দেবে। তখন কুজো ঢুকবে।
মকবুল পাচিলের সাথে লাগানো গাছ বেয়ে কেবল উঠেছে তখনই গাড়ীর শব্দ পেল। গাড়িটা গ্যারেজ থেকে বেরুনোর সময় হেডলাইটের আলোয় সে গাড়ির ভেতরে ড্রাইভিং সিটের মানুষটাকে দেখতে পেল। না, তার ম্যাডাম নয়। এমনকি ম্যানেজারও নয়। এ অন্য লোক। ষন্ডা মার্কা লোক। গাড়ি চুরি করে নিয়ে চলে যাচ্ছে নাকি?
মকবুলের পিছু পিছু সাজুও গাছে উঠে এসেছে। সেও দেখে বলল, ‘কি করে তোর ম্যাডামের নাকি পুরুষের লগে কারবার নাই। তাহলে ওই ব্যাটা কে?
মকুবলু ফিসফিস করে বলল, ‘সেইটা তো আমারও কথা। চল দোস্ত, আজ আর অপারেশনে কাজ নেই। এই জায়গায় অন্য কিছু হচ্ছে। আজ রাতটা বাদ দে। দোহাই দোস্ত। আমার ভাল ঠেকছে না।
‘আরে অত ভয় কিসের? দেখ, তোর ম্যাডামের কোন নাগরটাগর হবে হয়তো।
‘নাগররা ম্যাডামের গাড়ি নিয়ে যাবে না? আর ম্যাডামও সাথে থাকত। আজ বাদ দে না।
নিচে নামলে কাজুও জানাল সেও গাড়িটারে যেতে দেখেছে। তারও ভাল ঠেকছে না। আজ রাতটা বাদ দেয়াই ভাল। সকালে যদি দেখে কোন বিপদ হয়নি তাহলে কাল রাতে অপারেশন করা যাবে। ওই গাড়ির লোকটা যদি ম্যাডামকে খুন করে রেখে চলে যায় তাহলে সেই খুনের দায় তাদের উপরে চাপবে।
এই সন্দেহ মকবুলের মনেও ডেকে গেছে। সে বাকি রাতটা এখানে পাহারা দিয়ে কাটিয়ে দেবে ঠিক করল।
সাজু কুজো চলে গেলেও মকবুল গাছের আড়ালে বসে পাহারা দিতে থাকে। তারপর কি ভেবে চুপিসারে ঢুকে পড়ে বাড়ির ভেতর। বারান্দায় এসে প্রথমে ম্যাডামের বন্ধ রুমে উকি দেয়। ভেতরে কেউ নেই। কি ভেবে সে হলঘরের দিকে পা বাড়ায়। বাইরে থেকে চাইনিজ তালা দেয়া। দরজার ফাক দিয়ে চোখ চালিয়ে হাতের পেন্সিল টর্চের সরু আলো ভেতরে ফেলে। চমকে ওঠে সে। ম্যাডাম পড়ে আছে মেঝেতে। রক্তের দাগ লেগে আছে মেঝেতে। ম্যাডামকে কি খুন করে ফেলেছে নাকি?
হঠাৎ গাড়ির শব্দে তার গোয়েন্দাগিরির শখ মিটে যায়। সে তাড়াতাড়ি নিঃশব্দে বেরিয়ে উঠে পড়ে গাছে। গাছে বসে গাড়ির আলোর দিকে তাকায়। ম্যাডামের গাড়িই। সেই লোকটাই গাড়ি নিয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু গাড়ির পেছনে ওটা কি? কাঠের বাক্স। কিন্তু বাক্সটাকে ওরকম পরিচিত পরিচিত লাগছে কেন? কেমন যেন কফিনের বাক্সের মত। ওটা তো কফিনই।
মকবুলের পরাণে পানি রইল না। সে টোটকা ফোটকা অপরাধ, চুরিচামারি করে থাকলেও খুনখারাবির লাইনে কখনও হাটেনি। কফিনটা দেখে তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে ম্যাডাম খুন হয়েছে। আর এই খুনী কফিনে করে ম্যাডামের লাশ পাচার করবে।
মকবুল দিশেহারা হয়ে গেলো। আজ এখানে না এলে এসব না দেখলেই ভাল হতো। এখন দেখে ফেলেছে এখন তো একটা কিছু করা দরকার। কিছু না হোক রহমান সাহেব তো জানানো দরকার। তিনিই তো ওই বিখ্যাত ম্যাডামের দেখ ভাল করেন।
গাড়িটা গেটের ভেতরে ঢুকতেই মকবুল ঝোপ ভেঙে দৌড়াতে শুরু করল।
১১
ভারী কফিনটা গাড়ি থেকে বারান্দায় নামিয়ে মেঝে দিয়ে টানতে টানতে ভাস্কর্যের ঘরের সামনে নিয়ে এল কাদিচ। তালাটা অক্ষতই আছে। তালা খুলে অন্ধকার ঘরে ঢুকে পড়ল কাদিচ। লাইট জ্বালল। না, বেচারী এখনও সেভাবে পড়ে আছে। জ্ঞান ফেরেনি। যে কারণে পালাবারও চেষ্টা করেনি। গাড়িটা গ্যারেজে রেখে এসে কফিনটাকে ঘরের ভেতরে ঢোকাল। বাথরুম থেকে পানি এনে নোরার চোখে মুখে ছিটাল। কয়েকবার ছিটাতেই সাড় ফিরে এল দেহে।
নোরা হতাশ চোখে তার দিকে তাকাতেই কাদিচ শুষ্ক হাসি হেসে বলল, ‘আমার মত খারাপ লোকের স্কাল্পচার করতে আপনার এত অনীহা এটা আমাকে বললেই হতো। তার জন্য এত কিছু করার কোন দরকার ছিল না। আমিও আহত হলাম, আপনিও ব্যথা পেলেন। মাথার ব্যথাটা কি কমেছে?
ততক্ষণে নোরার দৃষ্টি চলে গেছে কফিনের দিকে। তিনি ভয়ার্ত গলায় বলে উঠলেন, ‘ওটা কি?
‘আশ্চর্য! একটা কফিনকে চিনতে পারছেন না। মাথা গুলিয়ে গেছে নাকি?
‘ওটা কি হবে?
আব্রাহাম কাদিচ কাধ ঝাকাল, ‘কফিন কি কাজে লাগে? লাশ বহন করা হয়।
নোরা ভয়ে আতংকে আর কথা বলতে পারল না। কার লাশ তা আর তার বুঝতে বাকি নেই।
‘ঘাবড়ে গেলেন? অত ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আপনার সময় এখনও আসেনি। এখনও কিছুটা কাজ বাকি আছে। আমি চোখের সামনে আপনার হাতে একটা ভাস্কর্য গড়া দেখতে চাই। এটা আমার শখ বলতে পারেন। আমি আপনার জন্য মডেল নিয়ে এসেছি। ওই কফিনেই আছে সেই মডেল।
‘মানে?
‘মানে খুবই সোজা। এতদিন বিকৃত বিকলাঙ্গ মানুষকে মডেল করে ছবি একে ফায়দা তুলেছেন। এবারে আমি চরম বিকৃত মডেল নিয়ে এসেছি। লাশ নিয়ে এসেছি আপনার মডেল হিসাবে।
নোরা কিছু বলার আগেই আব্রাহাম কাদিচ কফিনের কাছে চলে এল। কফিনের ডালা খুলে ফেলল।
কফিনের ভেতর তাকিয়ে নোরার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। গলা ঠেলে বমি উঠে আসতে চাইল। এ কি দেখছে সে! এ কি ভয়ংকর কোন দুস্বপ্ন! এ কার লাশ দেখছে সে!
‘কি ঘাবড়ে গেলেন? আশা করি চিনতে পেরেছেন। এই তো আপনারা বিখ্যাত সুন্দরী মহিলা। সুন্দরী হবেই না কেন? নায়িকারা তো সুন্দরীই হয়। এই সময়ের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সুপার ডুপার হিট উঠতি নায়িকা অরুণিমা। যার সাথে আপনার কিছুটা ঘনিষ্টতা আছে। আমি সেই ঘনিষ্টতার সুযোগ নিয়েছি। আপনার সিম দিয়ে ওকে ম্যাসেজ পাঠিয়েছি। আপনার ড্রাইভার সেজে পরিচয় দিয়ে আপনার গাড়ি নিয়ে ওর বাসায় গেছি। আপনার সিগারেট লাইটার রেখে এসেছি। গোয়েন্দা পুলিশের সাধ্যমত ক্লু রেখে ওকে খুন করে লাশ নিয়ে এসেছি। আপনার পরিচয়ের কারণে কেউ সন্দেহ করেনি। এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছি। এখন আপনাকে আমি খুন না করলেও আইন করবে। সেটাই আমার শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম হবে।
নোরা তোতলাতে তোতলাতে কোনরকমে বললেন, ‘আপনি অরুকে খুন করেছেন?
‘ইয়েস ম্যাম। আমি ডু ইট। শুধু খুন করিনি। ওকে আপনার ভাস্কর্যের মডেলের জন্য নিয়ে এসেছি। বিকলাঙ্গ মডেল পছন্দ করেন বলে ওর চার হাত পাই আমি বিছিন্ন করেছি। আপনি ঘাবড়ে যাবেন ভেবে হাত পা গুলো লাশের সাথে আছে। আসলে ওগুলো কাটা। আপনি সুন্দরী বিকৃত মডেল পেয়ে গেছেন। এখন কাজ শুরু করুন। যত দেরী হবে ততই লাশ পচবে।
‘আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
আব্রাহাম কাদিচ হাসল, ‘আমার মাথা তো খারাপই। আমি সিরিয়াল কিলার। কোন সুস্থ লোক সিরিয়াল কিলার হয় না। আমি ভয়াবহ মানসিক রোগী। এসব করে আমি আনন্দ পাই। শিল্প সৃষ্টির আনন্দ। যেমনি আপনি ভাস্কর্য গড়ে পান। নিন, শুরু করুন। এখন এটা আপনার জন্য জীবন মরণ শিল্পকর্ম। ওই লাশ পচে গন্ধ ছড়ানোর আগেই আপনি ভাস্কর্য শেষ করবেন। যদি পারেন তবেই আপনি মুক্তি পাবেন। আমি কথা দিচ্ছি।
‘আমি মরে গেলেও ওই ভাস্কর্যের কাজ করব না।
‘যত দেরী করবেন ততই লাশ পচবে। আর এবার আপনাকে শিকল হাতেই কাজ করতে হবে। কোন ছাড় পাবেন না। লাশ পচবে তো আপনার জীবন প্রদীপ নিভে যাবে। নিন, শুরু করুন।
নোরা আহমেদের চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে এল। তিনি ঝাপসা চোখে নিন হাতুড়ি তুলে নিলেন। পাথরের গায়ে নিন বসালেন। এই পাথরে কিভাবে বসবে অরুণিমার কোমল মুখ?

১২
মকবুল পাগলের মত দৌড়াচ্ছে। পুলিশের কাছে এই ব্যাপারে কিছু বললে বুঝবে না। এসে যদি কিছু না পায় হয়রানি করার জন্য তাকে দাবড়াবে। আর তাকেও গ্রেফতার করতে পারে।
একজনকে শুধু জানানো যায়।
মকবুল ঘড়ি দেখল। রাত সাড়ে তিনটা বাজে। নির্জন রাস্তা। কিন্তু তাকে যেতে হবে অনেকদুর। রহমান স্যারের বাসা এখান থেকে মাইল পাচেক দুরে।
পথে টহল পুলিশ তাকে আটকাল। সে কাকুতি মিনতি করে জানাল একজন খুব অসুস্থ। তার জন্য আরেকজনকে খবর দিতে সে যাচ্ছে।
মি. রহমানের ফ্লাটের গেটে সে যখন এসে পৌছাল তখন চারটে বাজব বাজব করছে। দারোয়ান ঝিমুচ্ছিল। তাকে এরকম হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে সেও দয়াপরবশ হলো। ইন্টারকমে রহমান সাহেবের নাম্বারে আট দশবার ফোন দিয়ে শেষে ধরতে পেরে জানাল, ‘কেয়ারটেকার মকুবুল জরুরী দরকারে আপনার সাথে দেখা করতে চায়। ম্যাডাম নাকি কি বিপদে পড়েছে।
মি রহমান প্রথমে কেয়ারটেকার মকবুল কে বুঝতে পারল না। কিন্তু ম্যাডামের কথা বলায় মনে পড়ে গেল। তিনি মকবুলকে ভেতরে পাঠিয়ে দিতে বললেন।
মকবুল ভেতরে এসেই আকুতি জানাল ‘স্যার, শিগগীর নেন। এখখুনি ম্যাডামের বাড়িতে চলেন।
‘কেন কি হয়েছে?’ তিনি রাত পোশাকটা পরিবর্তন করবেন কিনা সেই চিন্তাভাবনা করতে থাকেন।
‘স্যার, একজন খুনে লোক ম্যাডামকে আটকে রেখেছে। এতক্ষণ বোধ হয় খুন করে ফেলেছে। লোকটা লাশ সরাতে একটা কফিন বাকসো নিয়ে বাড়িতে ঢুকেছে।
‘তুমি দেখলে কিভাবে?’ তিনি পোশাক পরিবর্তন করে কোট প্যান্ট পরার সিদ্ধান্ত নেন।
মকবুল আমতা আমতা করে বলে, ‘স্যার, মানে আমার একটা দরকারী জিনিস ওই বাড়িতে ছিল তাই আনতে দেয়াল টপকে ঢুকেছিলাম। তারপর দেখি ম্যাডামকে ঘরে বন্দী…স্যার, আর কথা বলতে গেলে ম্যাডাম আর বাঁচত না স্যার…
মকবুলের আকুতির কারণেই হোক আর ম্যাডামের নিরাপত্তার কথা ভেবেই হোক তিনি কোটের ভেতর পকেটে লোডেড পিস্তলটা নিয়ে নেন। তারপর গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে নিজেই ড্রাইভিং সিটে বসে বলেন, ‘তুমি আমার পিছনে ওঠো। ঘটনা কি তার ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন আছে।’
শেষ রাতে ফাকা রাস্তায় গাড়ি ঝড়ের বেগে মরালাসের দিকে ছুটে চলে।
১৩
জীবন বাঁচাতে দ্রুত হাতে ছেনি নিন হাতুড়ি চালায় নোরা আহমেদ। ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে গেলেও এখনও শক্ত থাকার ভান ধরে আছেন। চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে। লাশটা পচে ওঠার আগেই ভাস্কর্যের কাজ শেষ করতে হবে। তাহলেই বাচবে তার জীবন। বাইরে কোথাও গাড়ির আওয়াজ কানে ঢোকে তার। তিনি ভ্রুক্ষেপ করেন না। কার না কার গাড়ি কোন দিকে চলে যাচ্ছে।
গাড়ির আওয়াজে ইব্রাহিম কাদিচ সচেতন হয়ে ওঠে ‘সৃষ্টিশীলতার জন্য কারোর সাথে তো যোগাযোগ নেই বলেই জানি। কাজেই গাড়ি নিয়ে কেউ সাহায্য করতে আসবে বলে তো মনে হয় না।
নোরা আহমেদ কথা বলেন না। একমনে কাজ চালিয়ে যান।
আব্রাাহাম কাদিচ চেয়ারে বসে বসে মুগ্ধ দৃষ্টিতে নোরার হাতের কাজ দেখতে থাকে। সামনে পড়ে আছে সুন্দরী যুবতীর খন্ড বিখন্ড লাশ। মুখের নিটোল ভাবটা যায়নি। নোরা ভাস্কর্যের মুখে সেই নিটোল ভাব ধরার চেষ্টা করছে। নিটোল অথচ মৃত।
আব্রাহাম কাদিচ প্রশংসার সুরে বলল, ‘আপনার হাতের কাজ সত্যিই অতুলনীয়। এই পরিবেশেও আপনি যে অসম্ভবকে সম্ভব করছেন সেজন্য আপনাকে সেলুট জানাই। একজন প্রকৃত শিল্পীই অন্য শিল্পীর মর্যাদা বোঝে। আপনাকে হত্যা করা হবে আমার জন্য সবচেয়ে জঘন্য এবং সবচেয়ে শিল্প সম্মত কাজ। যেমনটি হবে আপনার এই স্কাল্পচারের ক্ষেত্রে। জঘন্য এবং শ্রেষ্ঠ।
নোরা আহমেদ আপনমণে কাজ করে চলেছেন। কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।
‘আফসোস, আপনার মত বিখ্যাত একজন শিল্পী শুধু শিল্পের পিছনেই জীবন উৎসর্গ করে গেলেন। শিল্পের পিছনে, মানুষের পিছনে নয়।’ আব্রাহাম কাদিচ আফসোসের সুরে বলল।
‘কী বলতে চান আপনি?’ নোরা ভাস্কর্য থেকে চোখ না সরিয়ে জিজ্ঞেস করেন।
‘আমি একজন সিরিয়াল কিলার। আমি আর কি বলতে পারি? আমার কথা তো কেউ শুনবে না। সেজন্য শিল্পের এই পথ বেছে নিয়েছি। কুখ্যাত হওয়ার পথ। সুন্দরী এবং শিল্পীদের হৃদয় থাকে না। আবেগ থাকে না। তাদের থাকে শুধু শিল্প। তাই আমিও প্রতারিত হয়ে আবেগকে দমন করেছি। হৃদয়কে উৎসর্গ করেছি। বেছে নিয়েছি আপনাদের মতো সুন্দরী ও শিল্পীদের। যারা শুধু শিল্প বোঝেন। মানুষ বোঝেন না। কিন্তু শিল্পের চেয়ে মানুষ বড়ো। এই যে বিকলাঙ্গ মানুষগুলোকে মডেল বানিয়ে আপনার শিল্পচর্যা চালিয়ে যান। বিনিময়ে তাদেরকে পারিশ্রামিক দেন। শিল্পের বিনিময়ে আপনি লক্ষ কোটি টাকা কামান। তারা যে ভিক্ষুক সেই ভিক্ষুকই থেকে যায়। ওদের আপনি দেখেন মডেল হিসাবে। মানুষ হিসাবে নয়। আর সেই কারণেই ওদের জন্য কিছু করতে আপনার মনে ডাকে না। কারণ মন নামক বায়বীয় বস্তুটি আপনাদের নেই। থাকলে ওদের জন্য, ওদের কল্যাণের জন্য আপনার অর্জিত অর্থে কিছু করতে পারতেন। আপনার মত বিখ্যাত একজন শিল্পীর একটা ডাকে এক আহবানে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ আপনার ভক্ত যোগ দিত। আপনি এই বিকলাঙ্গ মানুষগুলোকে পথ দেখাতে পারতেন।
মকবুল দেখানো পথে এই বয়সেও গাছ বেয়ে দেয়াল টপকে ভেতরে ঢোকেন মি. রহমান। গোটা বাড়ি অন্ধকারে। শুধু একটামাত্র ঘরের ভেতরের ক্ষীণ আলো দরজার নিচ দিয়ে চুইয়ে বাইরে আসছে। মি রহমান সর্ন্তপনে পা টিপে টিপে এগুতে থাকেন। তার পিছনে আক্রান্ত হলে আগে ভাগে পালিয়ে যাওয়ার দুরত্ব রেখে মকবুলও বাড়ির বারান্দায় উঠে আসে।
মি. রহমান বুঝতে ম্যাডামের ভাস্কর্যের ঘরের সামনে এসে নিঃশব্দে দাড়িয়ে ভেতরে ম্যাডামের হাতুড়ি নিন ছেনি ঠুকঠাকের শব্দে বুঝতে পারেন কাজ চলছে। আর কোন একজন পুরুষ ভেতরে আছে। শিল্প সংস্কুতি সমন্ধে ম্যাডামের সাথে আলোচনা করছে।
ব্যাপারটা দিবালোকের মত পরিষ্কার হয়ে যায় মি রহমানের কাছে। ম্যাডাম নিঃসংগ জীবনে তার কোন পুরুষ শিল্পী বন্ধুকে, কোন ভাস্করকে ডেকে এনেছে। দুজনে একত্রে কাজ করছে। গাধা মকবুল এই ব্যাটাকে দেখেই খুনী ভেবে রাত দুপুরে দৌড়ে তার কাছে এসেছে। হয়তো লোকটা কোন কাঠের বাক্সে করে পাথরের চাই অথবা তার গড়া কোন মুর্তি এনে ম্যাডামকে দিয়েছে বা দেখাতে এনেছে। সেই কাঠের বাক্সকেই মকবুল কফিন ভেবেছে।
মি: রহমান তারপরও কোন সাড়াশব্দ না করে আবজানো দরজাটা ধীরে ধীরে এক চোখ গলানোর মত ফাক করে ভেতরে দেখেন। যা ভেবেছিলেন তাই। ম্যাডাম পাথরে মুর্তি গড়ছে। পুরুষ মানুষটা চেয়ারে বসে আছে। শিল্পীর ভক্তদের নিয়ে, কোন একটা প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলছে। মি: রহমান হাতের পিস্তলটা কোটের ভেতরের পকেটে ঢুকিয়ে নেন। তারপর একটু পিছিয়ে এসে স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে দরজা ঠেলে ‘ম্যাডাম আপনাকে এক রাতে ডিস্টার্ব করার জন্য দুঃখিত। কিন্তু ঘটনা কি হয়েছে জানেন…’ বলতে বলতে ভেতরে ঢুকে তার কথা বন্ধ হয়ে যায়।
আব্রাহাম কাদিচ চমকে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায়। তার চেয়ে চমকান নোরা। তার ডান হাত থেকে নিন নিচে পড়ে ঝণাৎ করে শব্দ করে ওঠে।
মিং রহমান সামনে পড়ে থাকা খন্ড বিখন্ড লাশের দিকে তাকিয়ে আতকে ‘হায় আল্লা’ বলে চেচিয়ে ওঠেন। লাশের মুখ দেখে তিনি চিনতে পারেন ম্যাডামের বান্ধবী সুন্দরী নায়িকা ম্যাডাম। তার মাথা গুলিয়ে যায়। ঘটনা কি বুঝতে না পেরে তিনি হতভম্ব হয়ে যান। ম্যাডাম আর তার বন্ধু দুজনে মিলে বান্ধবীকে খুন করে ভাস্কর্য গড়ছে নাকি? শিল্পের জন্য ম্যাডাম স্বামীকে ডিভোর্সের মত সবকিছু করতে পারেন। মানুষ খুন পর্যন্ত!
গাধা এজেন্ট খালি হাতে এই রাতে কি করতে এসেছে নোরা আহমেদ বুঝে উঠতে পারেন না। সাথে সবসময় পিস্তল রাখলে এখন কি পিস্তলটা নিয়ে আসেনি? আর এনে থাকলে ঠাই ঠাই করে খুনীটাকে গুলি করে দিচ্ছে না কেন? এখন তো খুনী ওই গাধাটাকেও মেরে ফেলবে। মরিয়া হয়ে যাবে।
মি রহমানকে দেখেই আব্রাহাম কাদিচ চিনে ফেলেছে। ম্যাডামকে নজর রাখতে যেয়ে এজেন্ট ভালভাবে চেনা হয়ে গেছে। ছদ্মবেশে ভিক্ষুক সাজার সময়ও দেখেছিল। আর এজেন্টের কাজ কি সে ভাল করেই জানে। নিজের জান গেলেও ম্যাডামকে রক্ষা করবে। নিজের উপরে রাগ হচ্ছে তার। বোকামী করে পিস্তলটা ম্যাডামের শোবার ঘরে রেখে এসেছে। এখন ভরসা এই আধ হাত লম্বা ছুরিটা।
আব্রাহাম কাদিচ ছুরি বের করে মি রহমানের দিকে এগুতে থাকলেও মি রহমান পিস্তল বের করেন না। আসামীর মত দুহাত উপরে তুলে আত্মসমর্পণ করেন।
নোরা আহমেদ এগিয়ে আসেন মি: রহমানের কাছাকাছি। তারপর ক্ষিপ্রগতিতে ডান হাত বাড়িয়ে মি রহমানের কোটের ভেতরের পকেট থেকে পিস্তল বের করে আব্রাহাম কাদিচের বুক লক্ষ্য করে পর পর গুলি করে পিস্তল খালি করে ফেলেন।
তারপর পিস্তল হাতেই লুটিয়ে পড়েন বান্ধবীর মৃতদেহের উপর…

 পাঠকদের জন্য সুখবর!

অনলাইনে ডিজিটাল বাংলা  কমিক্স পড়ুন
ফ্রি-তে!

সদস্য রেজিস্ট্রেশন
close-link