একঃ

মাশুক ভাই খুব যত্ন করে ফোনটা খুলে সিমটা ভেঙ্গে ফেলল। অলীককে অবাক চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল, ‘এমনে চাইয়া আছছ ক্যান? জীবনে প্রথমবার দেখলি নাকি? তোর আগে যে ছিল, বহুবার করছে এই কাজ। আমি অবশ্য এই পহেলাবার ,হে হে।’

অলীক মানে ঐ হাবাগোবা টাইপের এক লোক। বলার সময় মুখে কথা জড়িয়ে যায়। মফিজ ছ্যাঁচড়া আচমকা কাউকে কিছু না জানিয়ে মেস ছেড়ে তলিতল্পা গুটিয়ে সেই যে পালাল, অমনি এই লোকটার হঠাৎ আগমন। কাজকারবার কিছু করে না, মাশুক ভাইয়ের মতো বেকার।

‘কিন্তু ভাই,’ নার্ভাস ভঙ্গিতে একবার ঠোঁট ভেজাল অলীক, ‘যার ফোন সে হয়তো এতক্ষণে কাইন্দা কাইন্দা ম…মরতাছে। কত্ত ক…কষ্ট হয়তাছে ওনার।’

‘কষ্ট?’, কুৎসিত মুখটা হঠাৎ থমথমে হয়ে গেল, ‘ভালা একটা চাকরীর লাইগা যখন মানুষের দ্বারে দ্বারে রাতদিন ঘুরছি, তখন কী আমার কষ্ট লাগে নাই! টাকার অভাবে মা যখন মইরা গেল,কষ্ট পাই নাই আমি? ক্যান চাকরী পাই নাই জানোছ? আমার এই বিশ্রী চেহারাটার লাইগা। মানুষ খালি আমার এই চেহারাটাই দেখছে, কত কষ্ট কইরা ছোট থেকে পড়াশুনা করছি সেইটা দেখে নাই। আরে শালা, আমি তো পাত্থর! আমার তো কষ্ট লাগে না এমন জীবন চালাইতে!’

একটু থেমে বলল,‘কারো কষ্টে কুনু যায় আসে না আমার। আমি ভালা তো দুনিয়া ভালা। নিজের ফুর্তির লাইগা সবকিছু করবার পারি আমি।’

অলীক মাথা নিচু করে শুনছিল। হাত দুটো শক্ত করে মুঠো পাকিয়ে আছে। বলল, ‘আমারও অনেক ক…কষ্ট, ভাই।’

‘তোর আবার কীসের কষ্ট?’

মাথা তুলে বোকার মতো হাসল লোকটা। ডান পাটা হাতে তুলে বলল, ‘আমারে মশা কামড়াইতাছে, ভাই। এইহানে অনেক ম…ম…মশা।’

‘দুত্তোর! তুই একটা হাঁদা মার্কা গাধা,’ বিরক্তি ঝরে পড়ল মাশুকের কণ্ঠে, ‘মফিজ পোলাডা কামের ছিল। কোথায় যে গেল পোলাডা। তোর মতো মানুষের দ্বারা কিচ্ছু সম্ভব না। যা,আমার চোখের সামনে থেকে ভাগ।’

‘হ, ভাই। কিচ্ছু হইবো না।’

***

মিরপুর মেসে অলীকের তৃতীয় দিন। অলীকের নিয়ে আসা চায়ে চুমুক দিচ্ছে মাশুক ভাই। একফাঁকে বোকা মানুষটার মুখের দিকে তাকালো। ‘আরে, এত চিন্তার কিছু নাই। পুলিশ ধরতে পারবো না আমারে,’ আনমনে মিটমিট করে হাসতে শুরু করলেন মাশুক আলী, ‘গত মাসে বড়সড় একটা কান্ড ঘটাইছিলাম, কই? পারছে আমারে ধরতে?’

মাশুক ভাই কী করছে না করছে সেদিকে আগ্রহ দেখালো না অলীক। হাত দুটো কচলাতে কচলাতে বলল, ‘ভাই,চলেন কোনোমতে একটা ব্যাবসা শুরু করি। টা…টাকা-পয়সা আর বেশি নাই।’

‘ওসব ব্যাবসা ট্যাবসা আমারে দেয়া হয়তো না। ম্যালাবার ট্রাই করছি –লাভ হয় নাই কুনু।’

‘তাইলে কী করবেন ভাই?’

‘জানি না,’ মুখে বললেও মাশুক ভাই চিন্তিত হয়ে পড়ল। পকেটের অবস্থা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না তার। ইদানীং কোনো দুই নম্বুরি কাজ করলে,তারপর আর বাইরে না বেরোনোই ভালো। কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে পরে নতুবা অন্য কোনো কাজে হাত দেওয়া যাবে। মাশুক আলী তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই ক’টা দিন মেস ছেড়ে কোথাও যাবে না।

মাশুক-অলীক ছাড়া জীর্ণ ঐ দ্বিতল মেসে আর কেউ থাকে না। ঠিক মেস নয়,পরিত্যক্ত একটা গুদামঘর। আশেপাশ গোটাকয়েক মিল-ফ্যাক্টরী আছে। পাড়ার আনাচে কানাচে সরু গলি পেরোতে রিকশাওয়ালার ঘাম ছুটে যায়। পানির সমস্যা, গ্যাসের অভাব সবকিছু মিলে ভাড়াটে বাসিন্দাদের দূর্ভোগের শেষ নেই। মাশুক আলী সারাজীবন এমন নিরিবিলি পরিবেশ কামনা করেছিল। লোকের উপহাস থেকে বাঁচতে, নিজের সব দুঃখ-কষ্ট চাপা দিয়ে বেপরোয়ার লেবাস নিয়ে একপ্রকার পালিয়ে আছে সে। জানাশোনা কোনো বন্ধু নেই। নিজের সম্পর্কে অন্য কাউকে জানতে দেয়নি। তাই পুষে রাখা সব ক্ষোভ নীরব ঘাতক হয়ে বাস করছে তার মনের ভিতর।

লালজান হোটেলে মাশুক আলীর নামের পাশে সাতশ টাকা বাকি উঠেছে। মেসের প্রবেশপথে হারুন মুন্সীর চায়ের দোকান। সে দোকানের পাশের এক মাঝারি আকারের হোটেল সেটা। বিষুদবার সন্ধ্যায় মেসের দরজায় বেদম পিটাপিটি আরম্ভ হলো। হোটেলের ছোকরা ভেবে দরজা খুলে দিল অলীক, যমদূতটাকে চিনতে পারল না। তিন মাসের বকেয়া ভাড়া নিতে এসেছে জালাল তরফদার, মেসের মালিক। তার সঙ্গে চামচার মতোন দেখতে এক লোক। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মাশুক আলীর চেহারা দেখে মেসওয়ালা যা বুঝার বুঝে নিল। শুরু হলো তুমুল গালিগালাজ। মাশুক, অলীক দুজনেই চুপ,কেউ কোনো কথা বলছে না। মেসওয়ালা যখন দুদিনের মধ্যে মেস ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিল তখন অলীক বলল, ‘ভাইজান, দশটা দিন সময় দেন, আপনার ভাড়া আমরা দিয়া দিমু। এমন কইরেন না ভাই।’

ভাগ্য ভালো। শেষবারের মতো দু-চারটে গালি ছেড়ে বিদেয় হলো মালিক। হাফ ছাড়ল অলীক, ঘাড় ঘুরিয়ে মাশুক আলীর দিকে তাকালো। স্বার্থপর লোকটা মাথা নিচু করে খাটের উপর বসে আছে, মুখ থমথমে। পরিস্থিতি এমন অস্বস্তিজনক যে ব্যবসার কথা আরেকবার তুলতে গেল না অলীক।

বিষণ্ণ এই শহরের অধিবাসীরা দুপুর গড়িয়ে গেলেও টের পায় না, কাজের ব্যস্ততায় দিন কেটে যায়। কাজহীন মানুষদের কাছে ঠিক তার উল্টো। একঘেয়ে নিরবতায় অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে দুজন। অলীক মাঝে মাঝে দু একটা কথা বললেও মাশুক আলীর জবান একেবারে বন্ধ। মেসওয়ালার অপমান মাশুক আলীর গায়ে আঠার মতো লেগে বসেছে। অহমে লেগেছে মেসওয়ালার প্রত্যেকটা কথা। ভেতরে ভেতরে ভুগছে প্রচন্ড মনোকষ্টে।

খিদেয় মোচড় দিয়ে উঠল অলীকের পেট। শেষপর্যন্ত বলেই ফেলল, ‘মাশুক ভাই লালজান থাইকা কী ভাত পাঠাইবো না। তিনটা তো বাইজা গেল। আমি নয়তো নি…নিয়া আসি।’

‘না যাইস না,’ এতক্ষণ পর নড়েচড়ে বসল মাশুক। ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘অনেক ট্যাকা বাকি আছে। ট্যাকা ছাড়া ভাত দিতো না। তোর থাকলে নিয়া আয়। আর না হলে, কী আর করা–’

অলীকের কাছেও খুব বেশি টাকা নেই। কোনোমতে মুড়ি কলার ব্যাবস্থা করতে পারবে। উঠে বসতেই ইশারায় না যেতে নির্দেশ দিল মাশুক, ‘ট্যাকা পয়সার পরে দরকার হইতে পারে। আইজ কিছু খামু না।’

কোনো কথা না বলে কাথামুড়ি দিয়ে নীচে শুয়ে পড়ল অলীক। খানিকবাদে মাশুক আলীও। তার প্রত্যেকটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ অলীক স্পষ্ট শুনতে পেল।

***

‘আর জায়গা পান নাই… ঐ মানুষটার সাথে থাকতে গেছেন কেন?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেসা করলেন বাদশা মিয়া। চেহারায় জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব আছে তার। সামনের ডেস্ক একগাদা পত্রিকায় ভরপুর। প্রত্যকদিন দৈনিক পত্রিকার প্রতিটা অংশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন তিনি। এই মুহূর্তে সামনে বসে থাকা মানুষটাকে অতিরিক্ত রকমের হাবাগোবা বলে মনে হচ্ছে। বয়স তিরিশ এর ভেতর,চোখে-মুখে এক ধরণের উদভ্রান্ত ভাব। বাদশা মিয়া খেয়াল করে দেখেছেন, এই ভদ্রলোক প্রতিটা কথা বলার জন্য বেশি সময় নেন, যেন কী বলবে ভাবে পায় না। ভালো, তবে কাজকাম ঠিকমতো করতে পারলে হচ্ছে।

‘মাশুক লোকটা কিন্তু প্রচন্ড স্বার্থপর,আচার আচরণ বিশেষ সুবিধার না। আমি এখানকার পুরানা লোক। কে কী বলে সব এই বাদশা মিয়ার কানেই আসে। আজ বাদে কাল আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন। শোনা কথা নাহয় বাদ দিলাম। এই কয়েকমাস ধরে ওনারে মাঝরাতে এলাকায় ঢুকতে দেখছি। আমার অনুমান ভুল হয় না। আমি নিশ্চিত, ঐ লোক আকাম-কুকাম করে।’ একটু থেমে বললেন, ‘মানুষটা মহা শয়তান। চেহারা দেখলেই বোঝা যায়…’

বকরবকর বৃথা। হাবাগোবা লোকটা তার টেবিলের পেপারওয়েটের দিকে ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখে শূণ্য দৃষ্টি।

‘আপনের পুরা নাম কী?’ জিজ্ঞেস করল বাদশা মিয়া। লোকটার উপর যারপরনাই বিরক্ত তিনি।

‘মোঃ অলীক আবদুল্লাহ ,’ সক্ষেপে জবাব দিল লোকটা। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ‘কী…কী ক…করব?’

‘মানে?’

আলীক নির্লিপ্ত স্বরে বলল, ‘আমার কা…কাজটা কী ভাইজান?’

*

বড়বাগের সীমানা প্রান্তের বিশাল ফটকটা বন্ধ করার তোড়জোড় চলছে। পাল্লা দিয়ে গলা খুলে দিয়েছে নেড়ি কুকুরগুলো। রাস্তায় মানুষের আনাগোনা কম। বাদশা বিল্ডার্স থেকে একজোড়া তটস্থ পা ধীরে ধীরে হেঁটে চলেছে। একটু আগেই বাদশা মিয়ার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে আবার স্থান করে নিয়েছে এই লোক। তিন হাজারটা টাকা পকেটে পুরে নেওয়ার সময়, একেবারে ভাবহীন ছিল লোকটা। বাদশা মিয়ার বদ্ধমূল ধারণা হলো, মানুষটা সত্যিকার অর্থে টাকার মূল্যই বোঝে না।

এত রাতে হারুন মুন্সীর চায়ের দোকান খোলা। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বুড়ো হারুন মুন্সী অদ্ভুত চাহনী দিল তার দিকে। জিজ্ঞেস করল, ‘এই কয়েকদিন দেখলাম না যে তোমাদের?’

দোকানদারের কথায় সম্বিত ফিরে পেল যেন অলীক। দোকানদারকে অস্ফুট জবাব দিয়ে দ্রুতপায়ে মেসের সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠল। রডের একটা চালান দিতে গিয়ে তিনটা দিন ঢাকার বাইরে ছিল ,তাই মাশুক আলীর সাথে তার এই ক’টা দিন কোনো দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। ভাবতে ভাবতে দরজার কাছে এগিয়ে গেল। মৃদু ধাক্কা দিতেই হাট করে খুলে গেল ওটা।

মেসের ভিতর ঘুটঘুটে অন্ধকার। একদম নীরব, নিঃস্তব্ধ। মাশুক আলীর উপস্থিতি আছে কী নেই, সন্দেহ আছে। হারুন মুন্সী যদি ঠিক বলেন, তাহলে মাশুক আলী এই তিনটা দিন মেস থেকে বাহির হয়নি। হয় এখনো আছেন তিনি নয়তো কোনো এক ফাঁকে মেস ছেড়ে গেছেন পালিয়ে। দ্বিতীয়টা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

ধুলোমাখা স্যান্ডেলজোড়া খুলে ঘরে প্রবেশ করল। দরজাটা বাম পাশে টেনে লাগিয়ে দিল। মাশুক আলীর খাটের উপর কালো অবয়ব দৃষ্টি আকর্ষণ করল অলীকের। দু পা তুলে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ওখানে বসে আছে একজন। নিকষ অন্ধকারেও মাশুক আলীকে চিনতে পারল অলীক। দাড়ি গোঁফের ছোটখাটো জঙ্গল হয়ে আছে তার মুখমন্ডলে। একটু পাশে মুড়ির টিনটা ঢাকনাবিহীন অবস্থায় পড়ে আছে। মেঝেতে ভাঙ্গা কাঁচের টুকরা। চৌকিতে বাসনকোসনের দিকে তাকাল অলীক, বুঝতে পারল মাশুক ভাই এই কদিন মুড়ি আর মদ ছাড়া আর কিচ্ছু নেয়নি।

অলীকের উপস্থিতি মাশুক আলীর কাছে অজানা। তার আধবোজা চোখে আর মুখ পুরোপুরি ভাবান্তরহীন। অলীক সুইচবোর্ড হাতড়ানো শুরু করতেই সামান্য নড়ে উঠল।

‘লাইন নাই, কাইটা দিছে।’, ঠান্ডা গলায় বলল মাশুক আলী।

‘অ ভাই, এসব কী করতাছেন?’, জিজ্ঞেস করল অলীক।

বিকৃত মুখে অদ্ভুত এক হাসি ঝুলিয়ে দিল মাশুক। তবু চোখ খুলল, ‘জানি না।’

ঝাড়ু বের করে কাঁচের টুকরো পরিষ্কার করতে শুরু করল অলীক। আজকের রাতটা অদ্ভুত, আর মনে হচ্ছে তেমনি কিছু একটা হবে আজ রাত্রে। মাশুক আলীর জবজবে ভেজা মুখ, অলীকও প্রায় ঘামতে শুরু করেছে। এই অসহ্য গরমে রাত কাটানো দায়। মাশুক আলীকে দেখে মনে হচ্ছে, অন্য জগতের বাসিন্দা। অলীক এ কদিন কোথায় ছিল না ছিল সে ব্যাপারে কোনো কথার খরচা করল না। অলীক মিনমিন করে বলল, ‘ভাইজান, কিছু ট্যা…ট্যাকা কামাই করছি—আপনি কিছু দিলে ভাড়াটা মা…মানে……ঐ,’ অলীক ভেবে পায় না কী বলবে। কথার খেই হারিয়ে ফেলা তার দুর্বল স্মৃতিশক্তির আভাস। তাই তাড়াহুড়ো করে যোগ করল, ‘একটা মোমবাতি জ্বালায় দেই ভাই?’

জবাব এল না কোনো। ধ্যানের মাঝে কখন যেন মাশুক আলীর বিকৃত মুখটা ইস্পাতের মতো কঠোর হয়ে গেছে। দাঁতে দাঁত চেপে কী যেন সহ্য করে আছে। মুখের অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছে সে কথা। বিব্রত বোধ করছে অলীক। মাশুক আলীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। ভোর হতে আরও ঘন্টা তিনেক বাকি। দিনের আলো অবশ্য মেসের বিস্তীর্ণ অন্ধকার খুব কমই দূর করতে পারে।

অন্ধকার চিড়ে আসলো না কাঙ্ক্ষিত ভোরের আলো, তার বদলে ভয়ংকর চিৎকার মধ্যরাতের নিঃস্তব্ধতা চুরমার করে দিল। ধড়ফড় করে উঠে গেল অলীক, হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সামনে। হাত দুপাশে ছড়িয়ে আর্তনাদ করছে তার মাশুক ভাই! সময়ের ব্যাবধানে সেই আর্তনাদ কখনো গোঙানির মতো শোনাচ্ছে ,কখনো বা হিংস্র জানোরের গর্জন স্বরূপ। ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে অলীক। এক মুহূর্ত ভেবে শেষ পর্যন্ত ছুটে গেল মাশুক আলীর কাছে। অলীকের হাত ফসকে খাটে গড়িয়ে পড়লেন তিনি। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারল না অলীক। বাকশক্তি সব যেন গলায় আটকে আছে !

যন্ত্রণার এক ঝলক সারা শরীরে কম্পন ছড়িয়ে দিয়েছে। অলীক তাকে বাঁচানোর জন্য ছুটে এল। সে জানে না তাতে আদৌ কোনো লাভ হবে কী না, জীবনের শেষদিন হয়তো আজ। সময় ফুরিয়ে গেছে। নিজের মৃত্যু নিজেই ডেকে এনেছে সে। প্রত্যেকটা হার্টবিট দুমাদুম বাড়ি খাচ্ছে পাঁজরের গায়ে। স্বার্থপর এই দুনিয়ার প্রতি তার মনোভাব তাতে কিছু্টা শিথিলতা এনে দেয়। বুঝতে পারল, খানিক আগে কল্পনায় ধরা দেওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত কন্ঠস্বর কল্পনা ছিল না। এতটুকু মিথ্যে ছিল না তার বক্তব্যে। আচমকা সাক্ষাৎ পাওয়ায়, একটুও ভয় পায়নি সে—বরং মনে হয়েছে, তাঁর জন্য সে যেন বহুদিন অপেক্ষা করে ছিল। দীর্ঘ কথোপথনের ফাঁকে নিজের পরিচয় দিয়েছিল কন্ঠস্বরের মালিক।

‘ভেনদত্তা? কে আপনি?’, বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেছিল মাশুক। এমন সময় মেঝেতে একটু শব্দ হলো। অলীক বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। তিন-চারদিন আগে মেজাজ চরমে ছিল মাশুক আলীর। রেগে গেলে তার চেহারা স্বাভাবতই অভিব্যক্তহীন হয়ে যায়, তবে মাথার ভিতর ঝড় বয়ে যায়। অবচেতন মনে কখন যে কী খেয়াল চেপেছিল ঠিকমতো মনেও নেই। শুধু মনে আছে দিনরাত ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে থাকতে শান্তি পেত বুকে। সেই শান্তি ক্ষুধার কষ্ট ভুলিয়ে দেয়, পুরনো দুঃখগুলো ভীষণ রকম মনে করিয়ে দেয়। ভেতরে ভেতরে জেগে উঠে এক অদ্ভুত বাসনা। সেই বাসনার জোরেই কী এই সত্তার আগমন?

কন্ঠস্বরটি সাড়া দিয়েছিল,জবাব দিয়েছিল তার মতো তুচ্ছ, বিকৃত চেহারার এক মানুষের প্রশ্নে। সত্তাটির প্রতি হঠাৎ ভক্তি জন্মে গেল মাশুকের। বুকের ভেতরটা কেমন জানি খালি খালি লাগছে। বহুদিন পর ভরসা করার মতো কাউকে পেয়েছে আজ।

‘ভেনদত্তা দুর্বলতার ফাঁদে আটকে পড়া মানুষের বোধের তৃষ্ণা মেটায়। আমাকে দেখতে পাবি না, ছুঁতেও পারবি না। নিজের কোনো দেহ নেই। আছে কেবল আত্মা। কী চাস তুই?’

‘প্রতিশোধ চাস? প্রতিশোধ!’, ভেনদত্তার উচ্চারিত শেষ শব্দে মাথা ঝাঁকালো মাশুক। ‘তোর ডাকে সাড়া দিয়েছি আমি। প্রতিহিংসার আগুনে বহুত জ্বলেছিস। তিলতিল করে পুড়িয়ে ফেলেছিস নিজেকে। এ আগুন নেভানো সম্ভব নয় তোর পক্ষে। নিভু পর্বের সূচনা আমিই শুরু করব, তোর সাথে। তোর থেকে শুধু একটা জিনিস চাই। দিবি? দিবি আমায়?’

মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনে যেতে লাগল মাশুক।

***

সেদিন পুরোপুরি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল মাশুক আলী। অলীকের চেষ্টায় কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আগের মতো চুপচাপ তিনি। শুধুমাত্র অলীকের কৌতুহলী প্রশ্নে মাঝেমাঝে পাগলের মতো হাসেন। সে হাসিতে একগাদা আত্মতৃপ্তি লুকিয়ে থাকলেও অলীক তাতে কিছুই খুঁজে পায় না। অবাক চোখে একদৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকে মাশুক আলীর দিকে।

বাদশা বিল্ডার্সের অস্থায়ী কাজটা শেষপর্যন্ত স্থায়ী হয়ে দাঁড়ালো। ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে রড, সিমেন্ট পরিবহনে মজুর খাটে অলীক। দুর্বল শরীরে এসব কঠিন কাজ একেবারে অসাধ্য তার কাছে। দাঁতে দাঁত চেপে তবুও করে যায়। কখনো বা ঢাকার বাইরে গিয়ে মাল খালাস করতে হয়। যেখানেই যাক না কেন, লোকে তার মেয়েলি আচরণ নিয়ে ঠাট্টা রসিকতা করে।

মাশুক আলীর অজ্ঞান হওয়ার দিনই অলীক আবার বেড়িয়ে পড়ে কাজে। মাশুক ভাই কেন জানি তাকে সামনে দেখতে চাচ্ছে না। মাশুক ভাইয়ের এমন অদ্ভুত আচরণে অলীকও মেসে থাকতে আর সাহস করেনি। বাদশা মিয়ার কথায় তাই বড়সড় একটা ট্রাকের সাথে পুরান ঢাকায় চলে গেল। ফিরে এল পরদিন বিকেলে। খিদে পেয়েছে । মেসে না ঢুকে তাই হারুণ মুন্সীর দোকানে প্রবেশ করল। আরেক কাস্টমার ছিল দোকানে। ঐ লোক বের হতেই হারুণ মুন্সী জিজ্ঞেসা করল, ‘মাশুকরে দেখিনা না যে আজকাল? চলে গেছে নাকি পোলাডা?’

‘না,চাচা।’, এটুকু বলেই চুপ হয়ে গেল অলীক। কালকের কথা হঠাৎ মনে পড়ায় মুখ খুলল আবার। ‘জানেন, মাশুক ভাই না কালকে অজ্ঞান হয়ে গেছিল। আমি তো…ভোরে…ভয়…উনি ঠিকমতো ভাত খায় না…চুপ কইরা ব…বইসা থাকে…তারপর আবা…’ তোতলাতে শুরু করল সে। হারুণ মুন্সী থামিয়ে দিলেন তাকে।

‘বুঝছি,বুঝছি। তোমার মাশুক ভাই হইল গিয়া লাইনছাড়া মানুষ। ওগো মতো ফাটা কপালের মানুষের ভাগ্য বলতে কিছুই নাই। এই মাশুক হইল আরেক জনমদুঃখী। জন্মের পর ওর চেহারা দেইখা বাপের বংশের আত্মীয় ভয় পাইয়া গেছিল। মাশুকের বাপের ট্যাকাপয়সা কম আছিল না। হ্যারা ছিল পীর বংশের। বউ শয়তান জন্ম দিছে—এই বইলা খালি বাড়ি না পুরা গেরাম থেইকা বাইর কইরা দিল’, বলতে বলতে হারুণ মুন্সী মাথা নিচু করে ফেলে।

‘কয়েক বছর পরে পেটের দায়ে এই ঢাকা শহরে মাশুকরে নিয়া চইলা আসে ওর মা। চার বছর আগে মইরা যায়। মইরা যাওনের আগে বহুত কষ্টে মাশুকরে পড়াশুনা করায়। আমি এই চায়ের দোকানে বইসা বহুবার মাশুকরে দেখছি সাহেবি জামা-জুতা পইরা ইন্টারভিউ দিতে যাইতে । খোদার কী লেখন! মাশুকের মতো শিক্ষিত পোলা এত চেষ্টা কইরাও একটা চাকরি জুটাইতে পারল না।’

হারুণ মুন্সী খেয়াল করলেন তার চোখ পানিতে ভরে যাচ্ছে। মনে পড়ল, বছরখানেক আগে এমনই ভেজা চোখে এই কথাগুলো তার কাছে বলেছিল মাশুক। তারপর কালেভদ্রে যখনই তার দোকানে আসত, ছেলেটার চাহনি বলে দিত- কারো করুণা চায় না সে।

চোখ মুছে অলীকের দিকে তাকালেন হারুণ মুন্সী। একমনে চা রুটি খাচ্ছে সে। কথাগুলো যেন প্রভাব ফেলেনি অলীকের মাঝে। বিলটুকু মিটিয়ে দিয়ে বেড়িয়ে গেল।

মেসের দরজায় আঘাত করল অলীক, ‘আমি অলীক, ভাইজান দরজা খোলেন।’ মিনিট পাঁচেক এভাবে কেটে গেল। দরজা খোলার কোনো নামগন্ধ নেই। অবশেষে ভেতর থেকে ছিটকিনি খোলার আওয়াজ এল। ধীরে ধীরে বামদিকে অর্ধেক সরে গেল দরজাটা। পাশ কেটে ঢুকে পড়ে পুরো ঘরটার দিকে তাকাতেই মুখ থেকে রক্ত সরে গেল তার, বুঝতে পারছেনা এইমাত্র কী হলো তার সাথে। কে খুলে দিল দরজা, ঘরে তো কেউ নেই! বাথরুমের খোলা দরজা বুঝিয়ে দিচ্ছে মাশুক আলীর ছায়াও নেই কোথাও।

‘হে হে, আমি জানতাম তুই ভয় পাবি। খালি তুই না,সবাই ডরাইবো আমারে।’ অলীকের সামনে থেকে মাশুক আলীই বলল কথাগুলো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে না তাকে। ধপ করে পড়ে গেল অলীক, চোখদুটো বড় বড় হয়ে গিয়েছে।

‘দেখবি কেমনে? আত্মা কী আর দেহন যায়?’ মাশুকের প্রত্যেকটা শব্দ নেশাজড়ানো। অলীককে না যেন নিজেকে নিজে বলছে, ‘আমার আত্মাটা নিয়ে তোর সামনে খাড়াই আছি এখন। প্রতিশোধের খেলা শুরু হইবো আজ থেকে। কেউ থামাইতে পারব না, কেউ না। আমার প্রতিহিংসার আগুন থেকে কেউ বাঁচবো না।’ বিকট শব্দে হাসতে শুরু করল মাশুক।

‘ভা…ভাই আপনার শ…শ…শরীর কই?’ জিজ্ঞেস করল অলীক।

‘ভেনদত্তাকে দিছি। তিনি আমার হয়ে প্রতিশোধ নেবেন। তাঁর হাত থেকে কেউ পালাইতে পারবো না। ধরা খাইব সক্কলে। আগামী সাতদিনে রক্তের নদী বইয়া যাইব। ভেনদত্তা কথা রাখে, মানুষের মতো বেঈমান না। তুই দেইখা নিস।’

‘আর ব…বইলেন না ভাই। ভ…ভয় লাগতাছে আমার!’, অচেতন হয়ে গেল অলীক। মাশুক আলী সেদিকে পাও বাড়ালো না। মনে প্রাণে অপেক্ষা করছে কালকের দিনটার জন্য।

***

‘প্রকাশ্যে খুন’ এই শিরোনামগুলো জাতীয় পাত্রিকার মূল আকর্ষণ। পরদিন ৯ অক্টোবর এমন এক হত্যাকান্ড হলো, ১০ অক্টোবর সৃষ্টি হলো তেমনই এক শিরোনাম। বেচারা জালাল তরফদারের জানটা গেল কবজ হয়ে। সাধারণ এক আমজনতার খুন, আমলে নিল না কেউ। ভিক্টিমের গলায় পুরোপুরি ছোরা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিডিও করার মতো চতুর্দিকে কেউ ছিল না, তাই বোঝা গেল না হত্যাকানডের চাঞ্চল্য। মামলা হলো থানায়, অপেক্ষায় রইল জালাল তরফদারের পরিবার।

বাদশা বিল্ডার্সের বাদশা মিয়া হেডলাইনটা পড়ে হাই তুলল। পরক্ষণে সোজা হয়ে বসলেন। জালাল তরফদার, নামটা কেমন চেনা চেনা। মনে পড়েছে, লোকটার মালিকানায় দু তিনটে দোকানপাট আছে এই এলাকায়। আচ্ছা, ঐ অলীক নামের লোকটাও না তার মেসে ভাড়া থাকে? সাথে থাকে মাশুক আলী। বাদশা মিয়ার দেখা দুনিয়ার সবচেয়ে জঘন্য সৃষ্টি।

দোকানের বাইরে এ সময়টা রিকশা আর মানুষের ভিড়ে জনাকীর্ণ। ভিড় ঠেলে অলীক প্রবেশ করল দোকানে। অবাক হলেন বাদশা মিয়া। আজ কোনো ডেলিভারি নেই, আগামী এক সপ্তাহেও এমন কোনো কাজ নেই যেখানে তাকে প্রয়োজন।

মেসে ঢুকেই পত্রিকাটা মাশুক ভাইয়ের খাটের উপর রাখল। ভয়ে ভয়ে তাকালো চারপাশে। বাইরে গিয়ে কাজ নেই। কিন্তু মেসে থাকতে ভয় পাচ্ছে অলীক। ‘ভাই,আপনি পেপার আনতে বলছিলেন। বাদশা ভাইজানের কাছ থাইকা নিয়া আসছি।’

আশেপাশে ছিলেন মাশুক আলী। কারণ তার হাসির শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেল অলীক।

১১ অক্টোবর। দৈনিক পত্রিকাগুলোর ছোট্ট এক অংশজুড়ে আরেকটি খুনের ঘটনা। দিন-দুপুরে এক বেসরকারি ব্যাংকে ঘটনাটা ঘটে। গতকালের প্রকাশ্য খুনের মতো অতটা চটকদার নয় বলে এটাকে সামনের পাতায় জায়গা দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি। কিন্তু ব্রিফিংয়ে হত্যার বিবরণ আসার পর সম্পাদকদের কাছে মনে হচ্ছে, মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে তাদের। কেননা ব্যাংকের সিনিয়র হেড অফিসারকে গলায় ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে।

***

বাদশা মিয়া ভাবছে।

রাতারাতি মিডিয়ার ইস্যু পরিবর্তন। মাত্র তিনদিন। এগারো থেকে তের তারিখের বিশেষ তিনটি হত্যাকান্ড ভোজ পাল্টে দেশে সিরিয়াল কিলিংয়ের মতো নতুন ধারণার জন্ম দিল। আগের দুটো মিলিয়ে মোট পাঁচটি হত্যাকান্ড। সর্বশেষ খুনটার খবর অর্থাৎ কালকের খুনের ঘটনা আজকের পত্রিকায় এইমাত্র পড়েছে বাদশা মিয়া। সর্বশেষ বললে ভুল হচ্ছে, ভাবলেন তিনি। প্রতিদিন যদি একটা করে হয় তবে আজকেও আরও একটা খুন হতে পারে যদি না পুলিশ এতক্ষণে হারামিটাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। টিভি নেই, নয়তো আজকের খবরের আজকেই পাওয়া যেত।

বাদশা মিয়ার আশংকা সত্যি হলো। শুরু থেকে প্রত্যেকটা খুনের ঘটনা নাড়িয়ে দেখলে পরেরদিনের পত্রিকায় কালকের খুনটা অদ্ভুত ঠেকল তার কাছে। পিরোজপুরে একই পরিবারের তিনজনকে গলায় ছুরি ঢুকিয়ে হত্যা। বেশ সমৃদ্ধশালী পরিবার, পীরবংশ। তিন ভিক্টিম সম্পর্কে মা-ছেলে। মায়ের বয়স নব্বইয়ের উপরে। আর দুই ছেলের বয়স সত্তরের কোঠায়। খবরের অর্ধেকটা পড়ে বাদশা মিয়ার মনে নানান প্রশ্ন জাগছে। খুনী একদিনের মধ্যে পিরোজপুর চলে গেল? আর একটা ৯৫ বছরের বৃদ্ধার উপর এত কীসের ক্ষোভ? তার দুই ছেলেরও এমন কী দোষ থাকতে পারে যার কারণে খুনি তাদেরকেই বেছে নিল। সম্পত্তির লোভ? টাকাপয়সা,জমি-জমা এসব যদি হত্যার প্রধান কারণ হয়ে থাকে, অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু বৃদ্ধার মৃত্যুটা কেন জানি এসবের সাথে যায় না। খুন হওয়ার আগপর্যন্ত একেবারে মরণাপন্ন অবস্থা ছিল বৃদ্ধার। ক’দিন পরে এমনিই স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করতেন। তাহলে? ঝট করে আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল বাদশা মিয়ার। সম্পত্তির ব্যাপারটা যদি বাদ দেওয়া হয়, তাহলে শুধু একটা কথাই মাথায় আসে। এসব হত্যাকান্ডের পেছনে কারো প্রতিশোধ স্পৃহা কাজ করছে না তো? বাদশা মিয়া পড়েছেন, দেখেছেন, প্রতিশোধের কারণে তিন-চার মাসের নিষ্পাপ শিশুকেও বলি হতে।

আধপড়া পত্রিকাটা হাতে নিলেন আবার। মধ্যরাতে নিজ বাড়ির ভিতর ঘটনাটা ঘটেছে। যৌথ পরিবার, তাই বাড়িতে মানুষের সংখ্যাও কম ছিল না সেসময়। ভিক্টিম তিনজন- ইবাদত আলী মুফতী, খায়ের শাহ মুফতী এবং বৃদ্ধা ফাতিমা বানু । খুন করতে ব্যবহার হয়েছে আলাদা আলাদা তিনটা ছুরি। ইবাদত এবং খায়ের শাহ মুফতী নিজ নিজ স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে একসাথে থাকতেন। ইবাদত আলীর প্রথম বিয়ে হলেও, খায়ের শাহের এটা ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথমপক্ষের স্ত্রী কিংবা সন্তান নিয়ে কোনো কিছু বলা হয়নি পত্রিকায়। খবরের উল্লেখযোগ্য যে অংশটা বাদশা মিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সেটা হলো খুনিকে এক পলকের জন্য দেখতে পেয়েছে সেই পরিবারের একজন। ইবাদত আলীর স্ত্রীর ভাষ্যমতে, প্রচন্ড খারাপ চেহারার এক লোককে দেখতে পেয়েছেন তিনি। এরপর আর কিছু জানেন না, অজ্ঞান হয়ে যান।

এই অংশটুকু পড়ে থমকে গেলেন বাদশা মিয়া। হয়তো লোকটাকে মনে মনে ভীষণ অপছন্দ করেন কিন্তু এই মুহূর্তে মাশুক আলীর নামটা এক পলকে তার ভাবনার বেড়াজাল পাল্টে দিল। দুইসপ্তাহ যাবৎ লোকটাকে বাইরে দেখাও যায় না তেমন। লোকটার চেহারায় এমন এক হিংস্রতা আছে যে এমন ভয়ানক খুনখারাবি যেন শুধু তার সাথেই যায়। অমন শয়তানের মতো মানুষটার সাথে একঘরে থাকে কীভাবে অলীক? পারে, অলীক বোকা টাইপের লোক। নিজের ভালোলাগা-মন্দলাগা নিয়ে ভাবেনা কখনো। মাশুক আলীকে রীতিমতো বড়ভাইয়ের মতো মান্য করে। তাই তো বড়ভাইকে ঘরে বসিয়ে নিজে এত কষ্ট করে কাজ করছে তার দোকানে। সামনের ক’টা দিন অবশ্য অলীকের কাজ নেই। কাল একবার এসেছিল তার কাছে পত্রিকা নিতে। না, শুধু গতকাল না এই টানা পাঁচদিনই তার দোকানে এসেছিল! সন্ধ্যার সময় এসে আবার ঠিক ঠিক তার কাছে দিয়ে যেত পত্রিকাটা।

সর্বপ্রথম এসেছিল এই মাসের ১০ অক্টোবর।

চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন বাদশা মিয়া। এইমাত্র নতুন আরেকটা জিনিস আবিষ্কার করেছেন। সন্দেহের তীর কেন বারবার কুৎসিত লোকটার দিকেই ছুটছে? মনে হচ্ছে, এসব খুনের সাথে মাশুকের কোনো না কোনো সম্পর্ক আছে। অলীকের সাথে প্রথম আলাপের কথা স্পষ্ট মনে আছে বাদশা মিয়ার। কথার ফাঁকে পত্রিকা পড়ে কী না জানতে চেয়েছিলেন তিনি। উত্তরে পেয়েছিলেন না বোধক জবাব। তাহলে প্রত্যেকদিন কার জন্য পত্রিকা নিয়ে যায় সে? কীসের জন্য?

তীরটা যে এবারো মাশুক আলীর দিকে যাচ্ছে। এই তিনটা বছর একবারের জন্যও তার কাছ থেকে পত্রিকা নেয়নি ঐ কুৎসিত লোক। আর দেশজুড়ে আচমকা অদ্ভুত হত্যাকান্ড শুরু হতে না হতেই, এত কী প্রয়োজন পড়ল যে অলীককে দিয়ে পত্রিকা আনা-নেওয়া করাচ্ছে মাশুক আলী? খুনের পর পুলিশের দৌড়-ঝাঁপ পরখ করে নিচ্ছে?

বাদশা মিয়া মনে মনে একটা সুযোগ দিতে চান অলীককে। মিস হলে পুরোপুরি কাকতালীয় আর নাহলে……

শেষটাই হলো। চিরচেনা ভিড় ঠেলে ধীরপায়ে দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো অলীক। চোখ দুটো লাল দেখাচ্ছে আজ যেন ঘুম হয়নি। শান্ত স্বরে বলল, ‘বাদশা ভাই,আ…আজকের পেপারটা দেন তো।’

***

‘প্রতিদিন পেপার নিয়ে কী করেন?

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অলীকের চেহারা জরিপ করে নিল বাদশা মিয়া। এই সহজ সরল মানুষটার পক্ষে খুন করা এক্কেবারে অসম্ভব। অসম্ভব মিথ্যে বলাটাও।

‘আমি নিজে পড়ি।’, সেই অসম্ভব কাজটা করার বৃথা চেষ্টা করল অলীক।

পত্রিকাটা বাড়িয়ে দিলেন তার হাতে। যেতে উদ্যত হতেই তাকে থামিয়ে দিলেন বাদশা মিয়া।

‘দাঁড়ান, মেসে মাশুক ভাই আছে নাকি? অনেকদিন তারে দেখা যায় না।’

এক সেকেন্ডে অলীকের চেহারায় নানান অভিব্যাক্তি খেলে গেল। ‘হ্যা, মা…মাশুক ভাই তো আছে।’ বাদশা মিয়ার মনে হলো, মিথ্যে বলছে অলীক। জবাব দেওয়ার সময় তিনি একবারও চোখ সরাননি।

‘আচ্ছা,আপনার মাশুক ভাইয়ের গ্রামের নাম কী? আমার না ম্যালা জানতে ইচ্ছা করে।’

‘মাশুক ভাইয়ের গেরামের নাম…’ এদিক সেদিক থেকে তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করল বোকা লোকটা। মুখাভঙ্গি দেখে মনে হলো,মনে পড়েছে। ‘ভাইজানের গেরামের নাম পিরোজপুর’।

অলীক চলে যেতেই, পকেট থেকে ফোন বের করলেন বাদশা মিয়া। বোতাম টিপতে গিয়ে থেমে গেলেন।

সুযোগ দিতে চান আরো একবার।

***

এত হাসতে মাশুক আলীকে জীবনে আর কেউ কখনো দেখেনি।

‘তিন বেজন্মা মরছে। কইছিলাম না কেউ বাঁচতে পারবো না ভেনদত্তার হাত থেকে। আমার লগে, আমার জনমদুখী মা’র লগে ওরা যা করছে,ফল পাইছে হাতে নাতে। অলীক,এই লোকটাকে দ্যাখ। দেখছছ? এইটা আমার বাপ। আমার দাদা-দাদী, চাচা আর আমার বাপ মিইলা আমাগোরে বাড়ি থাইকা বাইর কইরা দিছিল একদিন। দাদার ভাগ্য ভালো,ভেনদত্তার হাতে মরতে হয় নাই। বুড়া কয়েক মাস আগে মাটির নিচে চইলা গেছে। আজ থেকে প্রতিশোধের দেনা শেষ। আর কেউ মরবো না।’

অলীক বলল, ‘ভাইজান, আপনারে তো এহনো দে…দে…খতে পা…পারতেছিনা।’

‘পারবি,’ বিরক্ত কন্ঠে বলল মাশুক। এই ছদিনে ছয়-ছয়টা খুনের নেপথ্য প্রত্যেকদিন ফাঁস করেছে হাবাটার কাছে, অথচ কোন ইয়ে নেই তার মাঝে। ওদিকে ভেনদত্তা তার শরীরে নিজের আত্মা ঢুকিয়ে একের পর এক খুনগুলো করেছে। গন্ডগোলটা লেগেছে কাল। চাচী দেখে ফেলেছে তাকে অর্থাৎ ভেনদত্তাকে। জল যদি গড়িয়েও যায় তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই মাশুকের। প্রমাণ সব তার বিরুদ্ধে যাবে। সাথে আছে অলীকের সাক্ষী। হাবাটার উপর ভরসা আছে মাশুকের। কিন্তু গত দুদিন ধরে মাশুক আলী লক্ষ করেছে একটা জিনিস। রাতের বেলা অনেকক্ষণ বাথরুমের ভিতর দরজা বন্ধ করে থাকে অলীক।

‘হ,পারবি’, পুরনো কথার খেই ধরল সে। ‘ভেনদত্তার সাথে আমার সাতদিনের চুক্তি হইছিল। আজকালের মধ্যে সেই চুক্তি খতম। তারপর আমার শরীরটা পাইয়া গেলেই আগের মতো হইয়া যামু আমি। হাহ হা…’ পাগলের মতো আবার হাসতে শুরু করল মাশুক আলী।

পত্রিকাটা নিয়ে বেরোল অলীক, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অন্যদিকে আত্মা অপেক্ষমান তার দেহের জন্য। কোনো দুশ্চিন্তা নেই, নেই কোনো আফসোস। বুকের বোঝা নেমে গেছে এই ছদিনে।

***

আত্মার ঘুম নেই। তাই বেলা করে ঘুম ভাঙ্গতেই মাশুকের কোনো সন্দেহ রইল না। দুহাত মুখের সামনে এনে সংশয় দূর করল। ভেনদত্তা তার কথার হেরফের করেনি। নিজে পেয়েছে রক্তের স্পর্শ আর তাকে দিয়েছি প্রতিহিংসার নেওয়ার আনন্দ। ভাবল মাশুক, এখন কোথায় আছেন উনি? তার মতোই কারো ডাকে সাড়া দিতে চলে গেছেন? নাকি ভেসে বেড়াচ্ছেন অতৃপ্ত আত্মা হয়ে?

ঘড়ি বলছে সাড়ে বারোটা। দাঁড়িয়ে আছে অলীক। খাট থেকে উঠে বসতে ক্যাচক্যাচ শব্দ করে উঠল। সেই শব্দ পেয়ে অলীকও ধীর ভঙ্গিতে হেঁটে তার ব্যাগের তালা খুলতে শুরু করল। হাতে একটা ছোট্ট চাবি। ব্যাগের দুপাশ ফাঁক করে হাত ঢুকিয়ে দিল সে।

বিস্ফোরিত চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল মাশুক আলী। অলীকের হাতে একটা লম্বা ধারালো ছোরা উঠে এসেছে ! চোখ জ্বলজ্বল করছে লোকটার। এগিয়ে আসছে তার দিকে। থমথমে চাহনি, প্রতি পদক্ষেপে যেন হিংস্রতা ঝরে পড়ছে। এ কক্ষনো অলীক হতে পারে না!

বিস্ময়ের সাথে ভয় গ্রাস করেছে তাকে। স্বার্থপর মানুষটি নিজের জান বাঁচাতে মরিয়া। দ্রুত উঠে দাঁড়ালো মাশুক। সাথে সাথে বুক বরাবর লাথি মেরে বসল অলীক। তীব্র যন্ত্রণায় মাশুক আলী ছিটকে পড়ল খাটের উপর।

‘আরে, তুই এমন করতাছছ ক্যান?’ থরথর করে কাঁপছে মাশুক। অলীকের এমন ভাবমূর্তি হতবাক করেছে তাকে। চিৎকার করার চেষ্টা করল,পারল না, ‘আমি তোর কি করছি?’

অলীক জবাব দিল না। প্রচন্ড রেগে আছে সে। ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে রেখেছে একে অপরের সাথে। কথা বলে উঠল কেউ। ‘তার আগে বল, আমি তোর কী ক্ষতি করছিলাম ! আমার জীবনের একমাত্র আশা কেড়ে নিলি কেন আমার থেকে? আমার বোনকে কেন মেরে ফেললি। জবাব দে কুত্তা! জবাব দে!’্‌ অলীকের প্রত্যকটা শব্দে কোনো জড়তা নেই। তার বদলে একরাশ ঘৃণা মিশে আছে।

‘বোন?’, অবাক হলো মাশুক। দেড়মাস আগের ঘটনা নিয়ে এতদিন নিজের প্রতি অহংকার হতো তার। সবকিছু তার মনের মতন চলছিল। পুলিশ তার নাগালও ছুতে পারেনি। স্বার্থপর জীবনটা আইনের ফাঁক গলে দিব্যি বেঁচে ছিল। কিন্তু আজ যে তার কাছে কোনো জবাব নেই।

‘ও ছিল আমার একমাত্র ছোট বোন। আমার থেকে দশ বছরের ছোট।’, বলতে লাগল অলীক, ছোটবেলা থেকেই আমরা এতিম। আমাদের কেউ নেই। আমি ছাড়া যেমন মিলির কেউ ছিল না তেমনি মিলি ছাড়াও আমার জীবনটা ছিল শূণ্য। জীবনটা কোনোমতে চালিয়ে নিচ্ছিলাম দুই ভাই-বোন। মানুষটা আমি সারাজীবন বোকাসোকা। সবাই হাসাহাসি করে আমাকে নিয়ে। তাই নিজের জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণাও জন্মে গিয়েছিল। তবুও আমার বেঁচে থাকার একমাত্র মানে ছিল, মিলিকে বড় করা। অনেক কষ্ট করে ওকে পড়াশুনা করাতাম। আমি ভালোবাসতাম…অনেক ভালোবাসতাম আমার ছোট্ট বোনটাকে।’

***

অপেক্ষা করতে করতে সন্ধ্যার আগমন। আজকে শেষ সুযোগ দিয়েছিলেন নিজেকে। এইমুহূর্তে তাও শেষ । গতকাল কোনো গলায় ছুরি মেরে হত্যার ঘটনা ঘটেনি। আর আজ পত্রিকা নিতে আসেনি অলীক। কাল জবাব দেওয়ার সময় অলীকের অদ্ভুত হাবভাব, মাশুক আলীর গ্রামের নাম–সবকিছু মিলে সন্দেহের দানা আজকে এসে বড় আকারে ধারণ করেছে যা মাথা থেকে দূর করা অসম্ভব।

কালকের মতো ফোনটা আবার বের করলেন বাদশা মিয়া। পরপর তিনটা নয় চেপে কানের কাছে নিলেন।

***

অস্ত্রধারী অলীকের চোখ অশ্রুতে টলমল। কিন্তু নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করছে না। সরু অশ্রুধারা তার গাল বেয়ে পড়ছে অনবরত।

‘সেপ্টেম্বরের দুই তারিখ। স্পষ্ট মনে আছে আমার। প্রতিদিনের মতোই মিলিকে একা রেখে কাজে বেরিয়েছিলাম। এখনও আফসোস হয় আমার, সেদিন যদি না যেতাম, তোর মতো শয়তানের হাত থেকে বেঁচে যেত আমার বোনটা। তুই…তুই মিলির সাথে কেন এমনটা করলি? তছনছ করে দিলি মিলির জীবনটাকে। মেয়েটাকে তারপর শ্বাসরোধ করে খুন করিস। একটা মানুষের জীবন কেড়ে নিতে তখন তোর একটুও হাত কাঁপলো না।’

মণিতে প্রতিশোধের আগুন ধক করে জ্বলে উঠল অলীকের। ‘তুই পালিয়ে যাবার ঠিক একটু আগে বাসায় ফিরছিলাম আমি। আমাকে না দেখলেও, তোকে তখন অল্পের জন্য দেখতে পাই । তারপর ঘরে ঢুকে মিলির নিথর দেহটা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলাম। তোকে সন্দেহ হতে শুরু করে। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম প্রতিশোধ নেবো। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে তোর পিছু নিলাম আমি। তুই কোথায় থাকিস সেটাও বের করে ফেললাম। এই ছুরিটা দেখছিস? ছুরিটা পকেটে নিয়ে দিনের পর দিন আমি তোর মেসের সামনে ঘোরাফেরা করতাম। সুযোগ খুঁজতাম তোকে শেষ করে দেওয়ার। তুই বাইরে বের না হওয়ায়, একপর্যায়ে তোর পুরনো রুমমেট মফিজকে টাকা খাইয়ে মেস ছেড়ে দিতে রাজি করি।’

‘মেসে এসে প্রথমদিনেই তোকে খুন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি, হাত কাঁপতো আমার। বহু রাত জেগে থাকতাম এই ভেবে যে তুই ঘুমিয়ে গেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ব তোর উপর। আসলে ভয় পেতাম আমি। এই ভয় পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয় নয়। জন্মগতভাবে ভয় জিনিসটা যেন সবসময় আমাকে ছিঁড়েখুড়ে খেত। তাই আমি, সেই সহজ-সরল বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী অলীক তোকে শেষ করে দিতে ব্যর্থ হয়েছি প্রতিবার। কিন্তু আজ…’

সবকিছু হঠাৎ পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেল মাশুক আলীর কাছে। ছুরি হাতে যে অলীককে দেখছে এইমুহূর্তে সে সত্যিকারের অলীক না। এ হচ্ছে ভেনদত্তা, প্রতিশোধের সত্তা! ভেনদত্তার সাথে চুক্তি করেছে অলীক! দেহ দান করেছে ভেনদত্তার কাছে ! তারর মাধ্যমে অলীক কথাগুলো তাকে বলছে।

‘অলীক!’ চিৎকার করে ডেকে উঠল মাশুক। পাগলের মতো এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। জানে,অলীকের আত্মাকে দেখতে পাবে না। কাঁদতে শুরু করল সে।‘অলীক,অলীক…আমারে মাফ কইরা দে, মাফ কইরা দে আমারে ! ভেনদত্তাকে চলে যেতে বল!’

ভয়ংকর হাসিতে কুঁচকে গেল অলীকের মুখ। চোখের আগুন আরো জ্বলজ্বল করছে। এবার অন্য কন্ঠে কথা বলে উঠল সে, ‘বুঝে ফেলেছিস, না? হ্যাঁ, আমিই ভেনদত্তা। অসহায়ের প্রতিশোধের দেনা মিটাই। অলীক তোকে কক্ষনো ক্ষমা করবে না। তুই যেমন আমার মাধ্যমে প্রতিশোধ নিয়েছিস, অলীকও নেবে। একদিনের চুক্তি করেছে সে আমার সাথে। তোকে খতম করার চুক্তি!’ মাশুক আলীর গলা লক্ষ্য করে, ছুরি ধরা হাতটা দ্রুত নামিয়ে আনল ভেনদত্তা। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে একটা কন্ঠ যেন শুনতে পেল মাশুক। কে জানি বলছে, ‘তো…তোর সম…ময় শেষ।’

***

সন্ধ্যার আকাশে অমাবস্যার পরিপূর্ণ আধিপত্য। ছাদ থেকে নিচের দিকে তাকালেই কেবল আলোর দেখা পাওয়া যায়। পুরো এলাকার পরিবেশ শান্ত, নিরিবিলি ঠিক যেন অলীকের হৃদকম্পনের উঠানামার মত। পুলিশের সাইরেন সে রাতের নীরবতা ফুরিয়ে দিলেও অদ্ভুত প্রশান্তিতে ছেয়ে আছে তার মন। প্রতিশোধ নিতে পেরেছে সে ! মিলিটা যেখানেই থাকুক, খুশি হয়েছে নিশ্চয়ই!

ছাদের এক অংশে রেলিং নেই। দু কদম আগ বাড়িয়ে সেখানে পৌছে গেল সে। জীবনের প্রতি মায়া অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে। আর মিলি ছাড়া এমন অর্থহীন জীবনে বেঁচে থাকাও অসম্ভব।

ভিন্ন অনুভূতিকে পাশ কাটিয়ে প্রস্তুত হলো সে। এই জীবন রেখে কোনো লাভ নেই।

‘মিলিকে খুব ভালোবাসতেন, তাই না?’, অলীকের ঠিক পেছন থেকে বলে উঠল কেউ। কন্ঠটা পরিচিত। মিলির নাম অন্য কারো মুখে শুনতে পেয়ে পিছনে ফিরল অলীক। দুহাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে বাদশা মিয়া। চেহারায় সমবেদনার ছাপ।

‘দেখলেন তো,আমার অনুমান কখনো ভুল হয় না।’, মুচকি হাসল লোকটা। খুব কাছ থেকে সাইরেনের তীক্ষ্ণ আওয়াজ ভেসে আসছে। ‘মাশুক খুন হয়েছে। আর সেটা জানতে পেরে বুঝে গেলাম, আত্মহত্যা করবেন আপনি। এখানকার সবচেয়ে উঁচু ভবন এটাই। মনে পড়তেই দেরি না করে ছুটে এলাম আপনাকে বাঁচাতে। নিজেকে কেন শেষ করে দিচ্ছেন? পুলিশের ভয়ে? আপনাকে সবাই খুনী ভাববে সেজন্য? আমি জানি, খুনটা আপনি করেননি। কে করেছে, সেটাও জানতে চাই না,’ একটু থামল বাদশা মিয়া।

‘কিন্তু খুনটা করতে চেয়েছিলেন আপনি।’, সতর্ক দৃষ্টিতে অলীকের দিকে লক্ষ্য রাখছেন তিনি। আচমকা ঝাঁপ দিতে পারে সে। ‘প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম গত মাসের ঘটনাটা। একটা কিশোরী মেয়েকে রেপ করে হত্যা করা হয়। রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজে এক বিকৃত চেহারার আগমন। ওদিকে ঘটনার কয়েকদিন পর তার বড়ভাই উধাও। পুলিশ ক’দিন মাথা খাটিয়ে ভুলে গেল পুরো ব্যাপারটা। তবে শুরুতে মাথায় না আসলেও আজ বুঝতে পারছি, আদরের বোনকে ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যায়নি সেই বড় ভাই। উধাও হয়েছিল স্রেফ প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য।’

বাদশা ভাইয়ের সামনে থেকে ঘুরে দাঁড়াল অলীক। কাঁদছে সে। মিলির কথা মনে পড়লেই নিজেকে তার দায়ী মনে হয়। হাত দিয়ে চোখ মুছল সে। বলল, ‘ভাই,আপনি চ…চ…চলে যান।’

পিছে এসে দাঁড়িয়েছে বাদশা মিয়া। অলীকের কাঁধে হাত রাখলো। ‘আত্মহত্যা মহাপাপ। আপনাকে এভাবে মরতে দিতে পারি না আমি। কথা দিচ্ছি, আদালতে আপনার পক্ষে সাক্ষী দেব। মাশুককে যদি নিজ হাতে খুনও করতেন,আপনার পক্ষেই থাকতাম আমি। শুধুমাত্র প্রতিশোধ নিয়েছেন আপনি, দোষের কিছু করেননি। আমার সাথে চলেন। নতুনভাবে শুরু করবেন সব। খোদার দোহাই, নিজেকে এভাবে শেষ করে দেবেন না। ভালোবাসতে শিখুন নিজেকে। এই স্বার্থপর দুনিয়া এমনই। দু হাত ভরে যেমন দেয়, তেমনি কেড়ে নেয় কাছের প্রিয় মানুষগুলোকে।’

ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল অলীক। চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। চাপা পড়ে থাকা বুকের সকল কষ্ট যেন নোনা অশ্রুতে রুপান্তর হচ্ছে। আকাশে-বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে সে আহাজারি।

বিষণ্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন বাদশা মিয়া। ছেলেটাকে একটু কাঁদতে দিতে চান।

 পাঠকদের জন্য সুখবর!

অনলাইনে ডিজিটাল বাংলা  কমিক্স পড়ুন
ফ্রি-তে!

সদস্য রেজিস্ট্রেশন
close-link