-“বাসায় আয় নাহ!”

নাফিদ অনেকদিন ধরে জেদ করছে। জানে আমাকে টলানো সহজ নাহ, তবুও। কিন্তু এবার তার মিশন সাকসেসফুল। আমার রিয়েল লাইফ হররের প্রতি ইন্টেরেস্টের ফায়দাটা নিলো। তো যাক, মি. জাবিরের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে ওর বাসায় গেলাম। মি. জাবির দূর সম্পর্কের অাত্মীয় হয় নাফিদের।

-“আমার কথা তোর শুনতেই হলো শেষমেষ!”

ঘরে ঢুকার সাথে সাথেই নাফিদ আঁকড়ে বসলো। আরে বাবা, তুমি বললাই এমন জিনিস মি. জাবিরকে নিয়ে, আমি তো লোভই সামলাতে পারলাম নাহ। ভদ্রলোক নাফিদের রুমে আছেন শুনে চলে গেলাম সরাসরি ওর রুমেই। ভদ্রলোক যথেষ্ট গম্ভীর কিসিমের, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, শুভ্র দাঁড়ি, সম্ভবত আধপাকা চুল, মাথায় ক্যাপের জন্য বুঝা যাচ্ছে নাহ ঠিকমতন। মনে মনে যেরকম ফিগার এক্সপেক্ট করেছিলাম অনেকটাই তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

-“আসসালামু অালাইকুম, আংকেল”

-“ওয়ালাইকুমুস সালাম, নাসিম। তুমি আমাকে মি. জাবির বলতে পারো”

মি. জাবির আমার নামটা জানেন! নিশ্চয়ই নাফিদ আগের থেকে বলে রেখেছে! যাক, আমি কিছু বলার আগেই মি. জাবির জিজ্ঞেস করলেন আমাকে,

“তুমি ব্ল্যাক ম্যাজিকে বিশ্বাস কর?”

শুরুতেই এমন একটা প্রশ্ন খেয়ে ভ্যাঁবাচেকা খেলাম। কুশলাদি বিনিময় করার আগেই এ টপিকের প্রশ্ন। তা যাক, বললাম,

“আসলে আমি হরর জাতীয় বিষয়ে মাত্র কয়েকদিন আগে আগ্রহী হয়েছি। আমার অভিজ্ঞতা কম, তবে ব্ল্যাক ম্যাজিক নিয়ে আর্টিকেল পড়া আছে মোটামুটি। আমার মনে হয় এটা সত্যি ; বাট আমাদের ধর্মে নিষিদ্ধ।”

মি. জাবির বললেন, “শুধু আমাদের ধর্মেই নয়, বাইবেলেও এ নিয়ে বলা রয়েছে ঈশ্বরের সান্নিধ্য পেতে হলে প্রেতসাধনা মুক্ত হতে হবে। তো ব্ল্যাক ম্যাজিক নিয়ে প্রশ্ন টা করার কারণ আঁচ করতে পারছো?”

“সম্ভবত আপনি আপনার লাইফে ব্ল্যাক ম্যাজিক কে কেন্দ্র করে ঘটনা ঘটে যাওয়া নিয়ে আমাকে বলবেন এবং ঘটনায় আমার আগ্রহটা কিরকম হবে তা আমার বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল-সেজন্যেই বোধহয় প্রশ্ন করেছেন”

“অসাধারণ! কাহিনীতে প্রবেশ করা যাক, কি বলো?”

“অবশ্যই”-ভেতর থেকে একটা চাপা উত্তেজনার মুক্তির অনুভূতি টের পাচ্ছি!

“কাহিনীটা কয়েক বছর আগের। 2009 সালে আমি পড়াশোনা শেষ করে ইউএসএ তে চলে যাই। আমার বাবা আমি ছোট থাকাকালেই গত হয়েছিলেন। আমার মা অনেক কষ্ট করে আমাকে আর আমার ছোট বোনকে মানুষ করেছেন। ছোট বোনটাকে নিয়মিত সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হয়। প্রত্যেক বুধবার রাতে ও নাকি বাবার ছায়ামূর্তি দেখতে পায়, ভয়ে অদ্ভুত কাণ্ড করে বসে কখনো কখনো! বাবাকে ভীষণ ভালোবাসতো ও, এখনো ভুলতে পারে নাহ তাকে, হয়তো এত শোকের জন্য ওর এ অবস্থা।

মায়ের এ বৃদ্ধ বয়সে তাঁর কষ্ট যদি সামান্য হলেও লাঘব করতে পারি সেজন্যে বিদেশ গমনের সিদ্ধান্ত নিই। তো আমার সাথে আমার ক্লাসমেট রকিব হকও আমেরিকায় চলে আসে। আমরা মিশিগানের ডেট্রয়েটের ছোট্ট একটা বিল্ডিংয়ে উঠি। ছোট হলেও বিল্ডিংটার অবকাঠামো যেমন সুন্দর, তার চারপাশের প্রকৃতিও অপরূপ শোভাবর্ধক। বাসস্থান নিয়ে কোনো আপত্তি ছিলো নাহ বলা যায়।

এমন সময় পরিচিত কারো সান্নিধ্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলাম। তখন মনে পড়লো মি.ড্রেকের কথা। ক্যালিফোর্নিয়ায় বিভারি হিলসে থাকেন। আমি যখন ভার্সিটিতে ছিলাম, তখন উনি বাংলাদেশ ভ্রমণে এসেছিলেন। আমার বাসায় 1 দিনের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন, সে থেকে আমার সাথে সুসম্পর্ক। তো যে রাত্রে উনি আমার বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারপরের দিন সকালে বের হয়ে যান। বাট উনার একটা লকেট ভুলক্রমে রুমে ফেলে রেখে যান। তো সেটা নিয়ে এসেছিলাম, তার বাসায় যখন দেখা করতে যাব, তখন ফিরিয়ে দেব। লকেটটা যত্ন করে রাখতে হয়েছিলো কেননা উনি ফোন করে বলেছিলেন, তার স্ত্রীর দেওয়া লকেট, অনেক ভালোবেসে তাকে উপহার দিয়েছেন। ভদ্রলোক যে তার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন লকেটটা দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম। কাজটা যদিও করা ঠিক হয় নাই, কৌতূহলের বশে লকেটটার ভিতর খুলে দেখেছিলাম, ভদ্রলোকের স্ত্রীর ছবি ছিলো। আর কি জানি বর্ণ সংকেত ভাষার, বুঝতে পারছিলাম নাহ। জ্যামাইকান লোক তো, স্থানীয় ভাষা বোধ হয়। তার গত স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো, আমিও তো আমার বাবার কত জিনিসকেই স্মৃতি হিসেবে ধরে রেখেছি! মানুষ মনে হয় তার ভালোবাসার মানুষটির কোনো স্মৃতি নিজের প্রতিটা সময়ের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখে এক অযথা সুখানুভূতি পায়…..

জিনিসটা আমি অল্প হলেও কদর করতে পেরেছিলাম লকেটটা তার নিকট কতটা মূল্যবান হতে পারে। সেজন্যে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার সময়ও জিনিসটাকে নিয়ে আনতে ভুলিনি। মাকে তাও আবার মনে করাই দেয়ার কোনো দরকার ছিলো! রকিব এমনেই কৌতূহলী যা! ব্যাটা আমাকে চেপে বসলো, “কিসের লকেট?? আমাকে কখনো বলিসনি তো!”

“বিমানে উঠার পর বলবো নি তোকে লকেটের কাহিনী” এই আশ্বাস দিয়ে এয়ারপোর্ট পৌঁছানো পর্যন্ত রকিবের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে সমর্থ হই আমি। রকিব আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধুদের একজন ছিলো। তবে ও কিছুটা এগনোস্টিক কিসিমের মানুষ, যেটা কখনোই আমি ভালো চোখে দেখতাম নাহ ওর ব্যাপারে। তো যাই হোক, বিমানে উঠার পর ওকে লকেটটার পুরো কাহিনী বলতে হলো আমাকে।

শুধু কাহিনী শুনেই ক্ষান্ত হলো নাহ, আমাকে লকেটটা দেখাতে জোরও করলো। উপায়ান্তর না দেখে লকেটটা দেখালাম ওকে। তবে ওর মুখভঙ্গি দেখে মনে হলো খুব টেন্সড হয়ে পড়েছে লকেটটা দেখে। অথচ আমার খারাপ লাগছিলো লোকটার ভালোবাসার মানুষের এমন প্রস্থান দেখে, সে জায়গায় ও টেন্সড, ব্যাপারটা অদ্ভুত নাহ?”

নাফিদ আর আমি মাথা নাড়লাম। কথা বলার চেয়ে সম্মতিসূচক ইঙ্গিত দেয়া শ্রেয় মনে হলো।

মি.জাবির বলতে শুরু করলেন পুনরায়,

“কি হলো তোর, রকিব?”

“নাহ, কিছু নাহ।”

“বললেই হলো? তোর মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে খুব টেন্সড হয়ে গেলি।”

“আরে এমন লকেট আগেও দেখেছি মনে হচ্ছে তাই আর কি, বাদ দে!”

রকিব এমনিতে খুবই হাসিখুশি থাকে। কোনো কারণ ছাড়া মৌনতা অবলম্বন করবে- এমন ছেলে রকিব নয়। তবুও যাত্রাপথে প্রয়োজনীয় দুএকটা কথা ছাড়া আর তেমন কিছু বলল নাহ। বিমানযাত্রায় সারাক্ষণ নীরব রইল। বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দিলাম নাহ, মিশিগানে পৌঁছার পর আমার কি কি কাজ করতে হবে তা নিয়ে ভাবা শুরু করে দিলাম।”

মিশিগানে আসার পর 1 মাসের মধ্যেই দুজনই মোটামুটি পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে গেসি। এদিকে আমি জব খুঁজে পেয়েছিলাম খুব তাড়াতাড়ি। রকিবের কেন জানি এসব নিয়ে মাথাব্যথা ছিলো নাহ। নিজের জন্য একটা ভালো চাকরি চাইলে খুঁজে পেতে পারতো ছেলেটা, গা ছাড়া দিয়ে বসে থাকার মানে কি!

একদিন কফি বানাচ্ছিলাম সকালে, রকিব হুট করে আমাকে প্রশ্ন করে বসলো,”তোর মি. ড্রেক কে লকেট টা কবে দিবি?”প্রশ্ন শুনে মনে পড়লো, “ও হ্যাঁ, তাই তো! উনার লকেটটা ফেরত দিব, মনেও নাই, কন্টাক্ট করতে হবে উনার সাথে” তখন একটু অবাক ও হলাম বটে, রকিব তো মি. ড্রেক কে চেনে নাহ, কাহিনী শুনলো আমার মুখ থেকে কয়েকদিন আগে, তো জিজ্ঞেস করলাম, “তুই কি ওনার সাথে দেখা করতে চাস?” রকিব কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হলে তো ভালোই হয়।”

আমার ফোনে মি.ড্রেকের কন্টাক্ট নাম্বার সেভ্ড ছিলো। সকালে আমি কল দিয়েছিলাম দুবার ধরেন নি, তখন ভয়েসমেইল সেন্ড করে দিলাম, “মি. ড্রেক, আমি জাবির। আমি ইউএসএ তে এসেছি, আপনার সাথে দেখা করতে চাই।” ভয়েসমেইল পাঠানোর পর ঠিক দুঘণ্টা পর উনি কল ব্যাক করেন, দুজন কুশলাদি বিনিময়ের পর উনি আমাকে তার বাড়ির এড্রেস দেন, সেখানে দেখা করতে বলেন। আমি তাকে বলেও দিই যে, আমার এক বন্ধু আছে আমার সাথে, তাকেও কি নিয়ে আসতে পারব? মি.ড্রেক কিছুক্ষণ ভেবে বললেন যে তার কোনো আপত্তি নেই। রকিবকে বললাম মি. ড্রেকের সাথে কথা হলো, 5 দিন পর আমাদের যেতে হবে বিভারি হিলসে। রকিব বলল, ওর কোনো সমস্যা নেই, ফ্রি আছে। তবে রকিব কে দেখে অদ্ভুত লাগছে, মি. ড্রেকের কথা বললেই ও একটু কেমন যেন টেন্সড হয়ে যায়। আর আমি এর কদিন পর বাজে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলাম। যেমন- কেউ আমার মাথায় তীর ছুঁড়ে মেরে ফেলেছে, আমি ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করছি, অদৃশ্য কেউ আমার গলা চেপে ধরছে এরকম এরকম। তো আমি একটু ভীতু টাইপের লোক ছিলাম, এমন স্বপ্ন আসছিলো কেন বুঝতে না পেরে খুব ভয়ে ছিলাম।

5 দিন পার হয়ে গেলো। রকিবকে বললাম, “চল, রওনা দেই।”

ও কিছুক্ষণ ভেবে জবাব দিলো,”এত দূরে যাব দুজন একা, ঠিক হবে তো? মি.ড্রেক কে ভালো করে চিনিস নাহ এখনো, এত বিশ্বাস পাচ্ছিস কিভাবে?”

রকিবের কথায় যুক্তি আছে। বললাম, “লোকটা তো খারাপ মনে হয়নি, বড় কথা লকেটটা ফেরত দিয়ে চলে আসবো, বেশিক্ষণ থাকব নাহ”

রকিব কিছু বলে নি তারপর। আমরা রওনা দিলাম। মিশিগান থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে আসলাম। পৃথিবীর সব জায়গায়ই দেখতে সুন্দর, তবে মাতৃভূমির সৌন্দর্যের স্বাদটা অন্য কোথাও পাওয়া অসম্ভব! তো আমরা বিভারি হিলসে চলে আসলাম। আমি মি. ড্রেকের এড্রেস অনুযায়ী খুঁজে খুঁজে বাড়িটা বের করলাম। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেসে। মি. ড্রেকের বাড়িটা বড় অনেক, কিন্তু দেখতে অদ্ভুত। তো বাসার সামনে দাঁড়িয়ে যখন এসব খেয়াল করছি, মি. ড্রেক পিছন থেকে এসে চমকিয়ে দিলেন, “স্বাগতম!”

আমি আর রকিব ভয়ে পেয়ে গেলাম।

“আরে ভয় পেলেন নাকি! সরি, এত ভয় পাবেন ভাবিনি”

কৃষ্ণবর্ণের বিরাটদেহী লোককে সত্যি বলতে আজকে দেখে ভয় লাগছে কেন জানি। রকিবের কথাটা মনে পড়ছে খালি। তো যাক, তিনি আমাদের নিয়ে ঘরে ঢুকছেন। আমার ঢুকার সাথেই কেমন যেন একটু অস্বস্তি অনুভূত হলো। নাকে একটা বোঁটকা বোঁটকা গন্ধ আসছিলো। বাড়ির আঙ্গিনায় একটা ডগহাউজ আছে, কিন্তু কোথাও কুকুর নেই। ভালো করে খেয়াল করে দেখি ডগহাউজটার ভেতরে একটা হাড় পড়ে রয়েছে। মনে আচমকা ভয়ের সৃষ্টি হলো। রকিবকে ধরে ধরে আমি ঘরে ঢুকলাম। মি. ড্রেক আমাদের জন্য খাবার ডেকে পাঠালেন। আমি ঘর দেখতে শুরু করলাম। বড় রুম, আর অনেকগুলো বই এক তাকে, ভদ্রলোক সম্ভবত বইপ্রেমিক। তো আমার সেই হাড়ের ভয়টা কাটছে নাহ, তখন আমি তাকে না পেরে জিজ্ঞেস করে বসলাম, “মি. ড্রেক, আপনার ডগহাউজের ডগ কোথায়?” উনি উত্তর দিলেন, “ওটা তো আর নেই।” আমি ভয় পেয়ে গেলাম, “নেই বলতে?” উনি বললেন, “কুকুর আসলে প্রয়োজন হয় নাহ, তো আর কি রাখি নি ঘরে, অন্যের কাছে বেঁচে দিয়েছি”। শুনে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাব, তখন মনে হলো, “কুকুর যদি বেঁচে দেয়া হয়, তাহলে এখানে হাড় কী করছে??”

এখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে নাহ। কিছু একটা সমস্যা তো নিশ্চয়ই আছে। তবে তাজ্জব হলাম, রকিবকে দেখতে এবার আমার মত টেন্সড লাগছে নাহ। আমি লকেটের টপিক উঠানোর চেষ্টা করলাম, “মি. ড্রেক, মনে আছে আপনি যে আমাদের বাসায় আপনার লকেটটা ফেলে গিয়েছিলেন?”

“ও হ্যাঁ হ্যাঁ”

“আমি সেটা ফেরত দেয়ার জন্য নিয়ে এসেছি…”

“মাস্টার ড্রেক, খাবার নিয়ে এসেছি”আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই তাকিয়ে দেখি আমাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছেন এক মহিলা। মহিলার চেহারা দেখে মনে হলো, এনাকে কোথায় দেখেছি। ভাবতে শুরু করলাম। এ কী করে সম্ভব? ইনি তো মি. ড্রেকের মৃত সেই স্ত্রী, যাকে আমি লকেটে দেখেছিলাম। আমার হৃৎস্পদন অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেলো।

“ধন্যবাদ, এত দিন পরেও আপনার আমার লকেটটার কথা মনে ছিলো”

আমি মুখ ফুটে কথা বলতে পারছি নাহ… রকিব আমাকে ধরে বলল, “কি হলো তোর? জাবির? শুনতে পাচ্ছিস?”

আমার হুঁশ ফিরে আসলো। মি. ড্রেক বললো, “মি. জাবির, আপনার কি হলো?”

আমি কোনোমতে বললাম, “ইনি তো আপনার মৃত স্ত্রী, ইনি কিভাবে বেঁচে আছেন এখনো?”

মি. ড্রেক কিছুটা ভ্যাঁবাচেকা খেলেন বোধ হয়, “নাহ মানে, ইনি আমার স্ত্রী নয়, আমার স্ত্রীর যমজ আরেক বোন ছিলো, তাকে বিবাহ করেছি পরবর্তীতে…”

“মাফ করবেন, তবে আমি বুঝতে পারলাম নাহ, আপনার লকেটে আপনার স্ত্রীর ছবি, আমি ভেবেছিলাম আপনি তাকে খুব ভালোবাসেন। কিন্তু আপনি কিভাবে তার মতন দেখতে আরেকজনকে বিবাহ করতে পারেন?”

মি. ড্রেক কিছু বলার আগেই রকিব কথা বলে উঠলো,

“উনি বিবাহ করেন নি নতুন কাউকে। অন্য আত্মাকে নিজের স্ত্রীর দেহে প্রবেশ করিয়েছেন ভুডুবিদ্যার সাহায্যে।”

রকিবের কথা শুনে একদিকে গা শিউরে উঠলো, তখন সাথে সাথে আরেক দিকে মগজ খুলতে শুরু হলো। প্রথমত অদ্ভুত বাড়ি, বোঁটকা গন্ধ, মৃত কুকুরের হাড়, সব মিলে যেতে থাকে। রুমে যে বইগুলো আছে সেদিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখি ভুডুবিদ্যার বই।”

রকিব বলতে লাগলো,”আমি আগেই বুঝেছিলাম, ইনি একজন ওবিয়াহ, নেক্রোম্যান্সির সাথে জড়িত। তোর কাছে যে লকেটটা ছিলো সেটাতে যে অক্ষর চিহ্নগুলো ছিলো সেগুলো একজন ওবিয়াহ-এরই থাকতে পারে।”

মি. ড্রেক স্বীকার করলেন, “হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন আমি একজন ওবিয়াহ। আমি আমার স্ত্রীকে অনেক ভালোবাসি। ওর অকাল মৃত্যুকে আমি মেনে নিতে পারিনি। তাই আমি আমার স্ত্রীর মৃতদেহে অন্য আত্মাকে বশ করে এনে তাকে জীবিত করেছি।”

রকিব বলল, “জাবিরের বোনের প্রবলেমটাও আপনি মেইবি জানেন, সেটাও বলেন।”

আমি এবার রীতিমত শক খেলাম। আমার বোনের সাথে এ কাহিনীর সম্পর্ক কী হবে আবার?

মি. ড্রেক বললেন, “হ্যাঁ, মি. জাবিরের বোনের কাহিনীটাও আমি জানি।”

আমি আকাশ থেকে পড়লাম এ কথা শুনে।

উনি বলতে লাগলেন, “আসলে আবিরের বোনের কাহিনী একটি দুর্ঘটনা, আমার স্ত্রীর মৃত্যুর পর আমি বাংলাদেশে আসি। তখন আমার মি. জাবিরের বাসায় আতিথেয়তা গ্রহণ করতে হয়। দিনটি ছিলো বুধবার রাত। আমি আমার আংটি ব্যবহার করে এখানে আত্মাদের খুঁজছিলাম। এ কাজ করা অবস্থায় আপনার বোন মাঝরাতে ভুল করে আমার রুমে ঢুকে পড়ে। তখন আত্মাদের সাথে যোগাযোগ করা অবস্থায় দেখে ফেলে আমাকে। কিন্তু অাশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ও আস্তে করে “বাবা” বলে অজ্ঞান হওয়ার মত অবস্থা হয়। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে আপন রুমে চলে যায়। আপনাদের বাসায় ঢুকার পর ড্রয়িংরুমে আপনার বাবার ছবি দেখেছিলাম। একটা আত্মাকে দেখতে আপনার বাবার মত ছিলেন। তো আপনার বোন যেন আমার জাদুবিদ্যা নিয়ে কিছু না বলতে পারে সে জন্য আমি সে আত্মাক প্রতি বুধবার রাতে আপনার বোনের সামনে সদৃশ হওয়ার হুকুম দিয়ে আসি।”

মি. ড্রেক রকিবের দিকে ফিরে বললেন, “আপনি এসব জানেন কিভাবে? আপনি ব্ল্যাক ম্যাজিকের সাথে জড়িত?”

রকিব বলল, “আমি একজন শামান।”

সন্ধ্যা পেরিয়ে মধ্যরাতে সবকিছু দুঃস্বপ্নের চেয়ে কোনো আকারে কম লাগছে নাহ। যে ভার্সিটিতে আমার সাথে এত সময় কাটালো সে কিনা একজন শামান! আমার কাছে নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিলো এতদিন!

রকিব আমাকো বললো, “সরি, জাবির। তোকে কখনো বলতে পারি নি এ কথাটা। পরিস্থিতিই এমন ছিলো। তুই তো আমার ভালো বন্ধু, আমি চাইতাম নাহ এ কথা জেনে তুই আমাকে ভালো বন্ধুর তালিকা থেকে বের করে দিস..”

হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখি মি.ড্রেক সামনে আর নেই। রকিব বললো, “উঠ, জাবির, মি. ড্রেক কে ধরতে হবে।” আমরা ছুট লাগালাম উপরের তলায়। দেখি মি. ড্রেক নিজের আংটি নিয়ে কি যেন করতে বসছেন। রকিব তাকে বাধা দিয়ে বললো, “আমি থাকতে তোমাকে এ কাজ করতে দিতে পারব নাহ।”

মি. ড্রেক অসহায়ের সুরে বলল, “আজ অমাবস্যার রাত, সময় পেরিয়ে গেলে আমি যদি নিজের রক্ত না দিয়ে আত্মাদের সাথে করা চুক্তি রক্ষা না করি তাহলে অনেক খারাপ কিছু হতে পারে।”

রকিব বললো, “তাও আমি হতে দিতে পারি নাহ।”

“বুঝার চেষ্টা করেন, মি. রকিব।”

একটা ঘণ্টার আওয়াজ আসলো। সম্ভবত লিভিং রুমের বড় ঘড়িটা দেখে।

মি. ড্রেকের মুখ ফ্যাকাশে বর্ণের হয় গেলো। আমি এমনিতেই ভীষণ ঘোরের মধ্যে আছি।

তারপরও মি. ড্রেককে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি চুপ করে গেলেন কেন, মি. ড্রেক?”

“কেউ বাঁচবো নাহ আমরা এখন আর..”

কথা শেষ হওয়ার আগেই পুরো বিল্ডিংয়ে জোরে একটা কাঁপুনি হলো। মনে হলো ভূমিকম্প হচ্ছে জোরে। আমি দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলাম কতগুলো আত্মা ঘরে প্রবেশ করছে। হয়তো কোনো আত্মার চোখ নেই, নয়তোবা পা, কারো পেট কাটা, তো কারো গলাকাটা, আমি এ দৃশ্য দেখে দৌড় দিব ভাবছিলাম। কিন্তু রকিব কি মনে করে মি. ড্রেক কে ছেড়ে দিয়ে আমার হাত ধরে বসলো আর বলল, “জাবির, চোখ বন্ধ কর।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”

“দেরি করিস নাহ, চোখ বন্ধ কর।”

চোখ বন্ধ করলাম। রকিব কিছু পড়ছিলো আমতা আমতা করে, কোনো মন্ত্র সম্ভবত। তারপর কি হয় আমার মনে নেই…

পরের দিন সকালে উঠে আমি নিজেকে মিশিগানের ডট্রেয়টের সেই ছোট বিল্ডিংটায় নিজেকে পাই.. কিন্তু রকিবকে কোথাও দেখতে পাই নি.. আমি বিল্ডিং থেকে বের হয়ে যেতে চাচ্ছিলাম তখন এক টিভির দোকানে নজর পড়ে গেলো হেডলাইনে, “ক্যালিফোর্নিয়ায় বিভার হিলসে মি. ড্রেক নামক এক ব্যক্তির বীভৎস লাশ পাওয়া গিয়েছে। দেহে বিভিন্ন জায়গায় অস্বাভাবিক ক্ষতের চিহ্ন, কিন্তু আঘাতের কোনো নিশান খুঁজে পাওয়া যায় নি। তার সাথে তার স্ত্রীর লাশও পাওয়া গিয়েছে।” কিন্তু রকিব কোথায়? আমি অনেক খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু রকিবের কোনো খোঁজ আমি পেলাম নাহ। আমি ঐদিন ই চাকরি থেকে রিটায়ার করে বাংলাদেশে চলে আসি। কিন্তু আমি রকিবের কথা ভুলতে পারি নাহ, মিশিগান থেকে 2961 কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ার কোথাও ওর হদিস পেলাম নাহ….”

-“আপনার বোনের অবস্থার কোনো উন্নতি হয় পরবর্তীতে?”

-“হ্যাঁ। আমার বোন তখন থেকে বুধবার আর ঐ আত্মাকে দেখতে পায় নাহ, সাইক্রিয়াটিস্টরা বলছেন, ও শীঘ্রই সুস্থ হয়ে উঠবে। ”

-“যাক, এরকম একটা কাহিনী শুনে আমারও একটু ভয়ভয় করছে এখন।”

-“নাসিম দাঁড়া, কিছু খেয়ে যা, আম্মু বসতে বলছে।”

-“নাহ রে, আন্টিকে মানা করে দে। ঝড় হবে মনে হচ্ছে, আমাকে জলদি যেতে হবে বাসায়।”

-“আসি তাহলে মি. জাবির।”

মি. জাবিরের মুচকি হাসিটা কেন জানি অদ্ভুত লাগলো!

 পাঠকদের জন্য সুখবর!

অনলাইনে ডিজিটাল বাংলা  কমিক্স পড়ুন
ফ্রি-তে!

সদস্য রেজিস্ট্রেশন
close-link