ট্রেনের কামরায় আমরা তিনজন। আমার নাম শাওন। আমার পাশে ফারুক ভাই – লম্বা, কৃশকায়, কিন্তু চোখদুটো বেশ উৎসুক ধরনের । ফারুক ভাই আমার সিনিয়র কলিগ,কিন্তু আমাদের সম্পর্ক অনেকটা বড় ভাই-ছোট ভাইয়ের মতো । আমাদের সামনে ফারুক ভাইয়ের ভার্সিটি লাইফের বন্ধু জাহিদ ভাই বসা, হাতের ক্যামেরা দিয়ে মাঝে মাঝেই চলন্ত ট্রেনের জানলার ফাঁক দিয়ে ছবি তুলছেন। ফারুক ভাইয়ের হাতে একটি বই, আর আমি মোবাইল গুতায় যাচ্ছি। আমাদের গন্তব্য পালপাড়া গ্রাম , জাহিদ ভাইয়ের এক দূর সম্পর্কের চাচার বাড়ি।

 

জাহিদ ভাই একজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার । পালপাড়া গ্রামে বেশ পুরানো এক ভাঙ্গা মন্দির আছে । ওনার এক প্রজেক্টের জন্য কিছু পুরানো স্থাপত্যের ছবি দরকার । একা বোরিং লাগবে , তার জন্য ফারুক ভাইকেও সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন , আর ফারুক ভাইয়ের সবসময়ের ট্যুরমেট হিসেবে আমি তো আছিই।

 

সত্যি বলতে কি টানা অফিসের হ্যাপা সামলাতে সামলাতে আমি, ফারুক ভাই দুইজনেই প্রচণ্ডরকম ক্লান্ত। তাই যখন দুদিনের জন্য পালপাড়া যাওয়ার প্রস্তাব আসল, আমরা কেউই আর না করলাম না। তড়িঘড়ি করে এক শুক্রবার বেছে নিয়ে রওনা দিলাম পালপাড়ার উদ্দেশ্যে।

 

বেশ আড্ডা মারতে মারতে ট্রেন জার্নিটা উপভোগ করছিলাম। কথা প্রসংগে ফারুক ভাই বললেন,” জানিস শাওন, পালপাড়াতে একটা বেশ মিস্টিরিয়াস ঘটনা ঘটছে গত কয়েকবছর ধরে। তুই অবশ্য ব্যাপারটাকে ভৌতিক বলেও চালিয়ে দিতে পারিস। ”

 

একটু নড়েচড়ে বসলাম। ভূত বা এইরকম আধিভৌতিক ব্যাপারে আমার আবার একটু আলাদা টান রয়েছে। তাছাড়া আমি আর ফারুক ভাই এরকম দুয়েকটা কেস আগে সলভও করেছি।

 

জাহিদ ভাই ব্যাপারটা হয়তো খেয়াল করেই বললেন,” ভৌতিক কিনা জানি না, কিন্তু রহস্যময় তো বটেই । ওখানের এক ছেলে একবার আত্মহত্যা করে,  সম্ভবত প্রেম ঘটিত ব্যর্থতার জের ধরেই হয়তো,ঠিক নিশ্চিত না আমি । ঘটনাগুলো এর কয়েক মাস পর থেকেই শুরু ।”

 

জাহিদ ভাই কিছুক্ষণ থেমে বলতে লাগলেন, “ পালপাড়া ছোট এলাকা ।মোটামুটি সবাই সবাইকে চিনে । আমার চাচা মনসুর আহমেদের ওখানে একটা হোমিওপ্যাথির দোকান আছে । দোকান তেমন চলে না, এখনকার সময়ে হোমিওপ্যাথি কেই বা কিনে ! সন্ধ্যার পর সবাই কাজ শেষে ওনার দোকানে এসে আড্ডা দেয় । চাচা নিজ হাতে সবাইকে চা বানায় খাওয়ায় । আটটা-নটা পর্যন্ত এরকম আড্ডা চলে এরপর সবাই যার যার বাড়ি চলে যায় । তো একদিন ঐ ছেলেটার পাশের বিল্ডিংয়ের এক লোক হঠাৎ হার্ট এট্যাক করে মারা যান। ভদ্রলোক বেশ সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন । রাতের বেলা চাচার দোকান থেকে আড্ডা মেরে এসেছেন । বাড়ি আসার একটু পরেই কেমন যেন ছটফট করা শুরু করলেন, পুরো শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছে । বারবার খোলা জানালার দিকে ইশারা করে অস্পষ্ট স্বরে কি যেন বলছেন। চোখেমুখে ভয়ের ছাপ,কিছু একটা দেখে প্রচন্ড পরিমাণে ভয় পেয়েছেন। কেউ কিছুই বুঝতে পারছে না । এলাকা থেকে বেশ দূরেই সদর হাসপাতাল,তড়িঘড়ি করে সেখানে নেয়া হলো । কিন্তু ওনাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি,মারা যান । আবার তার কয়েক মাস পর ঠিক তার পাশের বাসাতে হুবহু সেম কেইস, সুস্থ মানুষের সাডেন হার্ট এট্যাক আর মুখে প্রচন্ড ভয়ের ছাপ ।  ঠিক এই প্যাটার্নে একটার পর একটা মৃত্যু টানা কয়েক বছর ধরে চলে আসছে । কোনোটা হয়তো মাসখানেক পর, আবার কোনোটা সপ্তাহখানেক বাদে। ওখানকার স্থানীয়রা সবাই মোটামুটি ব্যাপারটা জানে । প্রথমদিকে অনেক আলোচনা হতো এটা নিয়ে,কোনো লাভ হয়নি । কিন্তু এখন সবাই কেমন যেন মানিয়ে নিয়েছে , মুখ ফুটে না বলা এক আতঙ্কের মাঝে থাকে মানুষগুলো । ”

 

 

ফারুক ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ” আর একটা জিনিস হলো ঘটনাগুলো কিন্তু ঠিক পরপর বিল্ডিংগুলোতে হচ্ছে। একদম এক্স্যাক্টলি পাশাপাশি বিল্ডিংয়ে একই রকম ঘটনা বহুবছর ধরে চলে আসছে। সবার আবার হার্ট এট্যাক । মুখে ভয়ের ছাপকে নাহয় উড়িয়ে দেয়া যায়, ব্যাথায় অনেকেরই মুখ কুঁচকে যায়। কিন্তু পাশাপাশি বিল্ডিং… অদ্ভুত। প্রত্যেকেই কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে এসে কিছু একটা দেখে ভয় পাচ্ছে… ” কেমন যেন চিন্তার মধ্যে ডুবে গেলেন ফারুক ভাই ।

 

আসলেই ইন্টারেস্টিং!!

 

আমি জাহিদ ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, “ভাই,পালপাড়ায় দেখার মতো কি আছে? ”

 

জাহিদ ভাই বললেন,” মফস্বল এলাকা, হাতিঘোড়া তেমন কিছু নাই আসলে । তবে একটা জিনিস বলতে পারি। সচারচর মফস্বল বলতে তোরা যা বুঝিস পালপাড়া ঠিক সেরকম নয়। শহরের একপাশে রয়েছে দোতলা-তিনতলা পাকা বাড়ি, দোকানপাট,বাজার। আবার আরেকপাশ জংগলে ভরা। প্রায় পুরো শহরটাকে ঘিরে রয়েছে কাকশিয়াল নদী। চাচার ছাদ থেকে নদীটার বেশ সুন্দর একটা ভিউ পাওয়া যায়। সূর্যাস্তের সময় লাল সূর্য নদীর মধ্যে ডুবে যায়, অসাধারণ এক দৃশ্য। চোখ জুড়িয়ে যায়। দেখে ভালো লাগবে তোদের।  “

 

– নদীর নাম কাকশিয়াল? আপনার এই পালপাড়ার সবই তো দেখি কেমন যেন আজব কিসিমের। (হাসতে হাসতে বললাম)

 

জাহিদ ভাই হাসিমুখে আমার দিকে চোখ টিপে বললেন ,” ও আচ্ছা, তোকে তো আসল কথাই বলা হয়নি।  জংগলের মধ্যে বেশ পুরানো আমলের এক পরিত্যক্ত শ্মশানঘাট আছে । তোদের যে মন্দিরের কথা বলেছিলাম, ওটার ঠিক পাশেই । ব্রিটিশ আমলে পালপাড়া গ্রামে কলেরার মহামারীতে পুরো পালপাড়া ছারখার হয়ে যায়। অনেকে গ্রাম ছেড়ে পালায় যায়। পরে অবশ্য লোকজন ফিরে আসে কিন্তু ওই শ্মশান আর কেউ ব্যবহার করে না । পাশের মন্দিরটাও আস্তে আস্তে সাপখোপের আড্ডাখানা হয়ে যায়। তখন তো মানুষজন এসব রোগ-ব্যাধিকে দেবদেবীর অভিশাপ বলে মনে করত।

এখন রাতের বেলা তো দূরের কথা, দিনের বেলাতেও ও পথ আর কেউ মাড়ায় না। আর আছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক পাগলা বাবা, শ্মশানেই থাকে। মাঝে মাঝে কই হারায় যায়, আবার উদয় হয়। অনেকের ধারণা পালপাড়ায় যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সব এই ‘পিশাচসাধক’ পাগলা বাবার কাজ । ”

 

ফারুক ভাই এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “জাহিদ, তোর চাচার ফ্যামিলিতে কারা কারা আছেন? ”

– চাচা একাই থাকেন ।

– বিয়ে করেননি?

– করেছিলেন। প্রায় ৫-৬ বছর আগে চাচী মারা যান। বাচ্চা-কাচ্চা নাই । এরপর আর চাচা বিয়েথা কিছু করেননি। ছাদে নাকি একটা বাগান করেছেন, এখন তো উনি সারাদিন ওই বাগান নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। ওনার দোকানের বেশির ভাগ ওষুধ উনি নিজেই বানান, সেখানেও সময় কাটে অনেক । অবশ্য ওনার দোকান না চললেও পৈতৃক সম্পত্তি আছে, সেটা দিয়েই বেশ চলে যাচ্ছে ।

 

আমাদের পৌছাতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল। স্টেশন থেকে পালপাড়া গ্রাম এখনো প্রায় ঘন্টাখানেক পথ। মনসুর চাচা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। লম্বা, চোখে এক ভারী চশমা, পাঞ্জাবী পরিহিত লোক। ট্রেন থেকে নামতেই তিনি এগিয়ে এসে বললেন,”আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো? ” জাহিদ ভাই উত্তরে বললেন, ” না চাচা । আপনি আবার কষ্ট করে আসতে গেলেন কেন? আমরাই তো যেতে পারতাম। ”

 

চাচা বললেন, ” কিযে বলোনা, কতোদিন পর তুমি এলে।  তোমরা তো কেউ আসোই না, চাচাকে ভুলে গিয়েছ। চলো তাহলে, রোদে না থেকে,বাড়ির দিকে রওনা দেই। বাইরে ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। ”

 

 

আমরা সকলে এক ভ্যানে উঠে রওনা দিলাম। প্যাডল ওয়ালা ভ্যান, আস্তে আস্তে চলছে।  পালপাড়া জায়গাটা বেশ সুন্দর। জংগলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, পাশ দিয়ে কাকশিয়াল নদী। প্যাডলের ধ্বনির সাথে নদীর স্রোতে মিলে খুব অপূর্ব এক আওয়াজ সৃষ্টি করেছে। শুনতে বেশ ভালোই লাগছে ।

 

হঠাৎ নীরবতা ভেঙে জাহিদ ভাই বললেন, ” জানিস ফারুক,অনেককাল আগে এই জংগলে ডাকাতের খুব উপদ্রব ছিল। কত লোক যে এই ডাকাতের হাতে প্রাণ হারিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। ”

 

মনসুর চাচা বললেন,” কয়েকদিন আগে এক মহিলার নাকি লাশ পাওয়া গিয়েছে। আমি অবশ্যি দেখিনি। গাছের ডালে দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। এই জংগল অপয়া, খালি… ”

 

মনসুর চাচা চুপ হয়ে গেলেন। আমাদের থেকে হাত দশেক দূরে জংগলের মধ্যেই জটবাধা চুল, দাড়িওয়ালা এক লোক বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটার পরনে একখন্ড কালো কাপড় কোমড়ের নিচ থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা। ওনার কাছাকাছি আসার পর হঠাৎ লোকটি তর্জনী উঁচু করে আমাদের দিকে কি যেন দেখালো। ওনার চোখদুটোতে যেন আগুল জ্বলছে। অস্ফুট স্বরে কিছু একটা বলে আবার জংগলের মধ্যেই মিশে গেল।

 

” পাগলা বাবা? “, ফারুক ভাই প্রশ্ন করলেন। মনসুর চাচা মাথা নাড়লেন, ” এই পাগল আবার এসেছে। এখানের অনেকে মনে করে , যে ঘটনাগুলো ঘটছে সবই ওই পাগলার কাহিনী। জাফর ভাই কত ভালো  মানুষ ছিলেন, ওরেও পাগলাটা ছাড়ল না । পিশাচ ! পিশাচ! ”

 

পরিবেশটা কেমন জানি ভারী হয়ে গেল। পাগলা বাবা পিশাচ কিনা জানি না, কিন্তু দেখে মোটেও সুবিধার মনে হলো না।

 

ফারুক ভাইয়ের দিকে তাকালাম, উনি এমনিতেই বেশ কম কথা বলেন, কিন্তু এখানে আসার পর আরো বেশী চুপচাপ হয়ে গিয়েছেন। কিছু একটা ভাবছেন। উনি কি এখানেও কোনো ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছেন? মাঝে মাঝে ফারুক ভাইকে বোঝা অনেক কঠিন।

 

মনসুর চাচার বাড়িটা বেশ ভালো। দোতলা পুরানো আমলের বাড়ি। জাহিদ ভাইয়ের কথামতো শেষ বিকালের দিকে ছাদে গেলাম। আসলেই এখান থেকে নদীটার বেশ সুন্দর একটা ভিউ পাওয়া যায়। এই পড়ন্ত বিকেলে আলো-ছায়ার অদ্ভুত ছায়ায় কেমন যেন এক রক্তিম আভা জমছে নদীর বুকে ।

 

“অসাধারণ ! জাহিদ চল, নদীর পাড় থেকে একটু ঘুরে আসি। আজকে পূর্ণিমাও আছে, জম্পেশ একখান আড্ডাও দেয়া যাবে।”

 

এমন সময় ছাদে মনসুর চাচা এলেন। তিনি মনে হয় আমাদের কথা শুনতে পেরেছিলেন। বেশ গম্ভীর স্বরেই বললেন,” বাবারা এই ভরসন্ধ্যায় বের হওয়ার দরকার নাই। এলাকাটা ভালো না। ”

 

” চাচা আমরা তাড়াতাড়িই চলে আসব, চিন্তা করবেন না। ”

 

মনসুর চাচা কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন , বেশ হতাশ হয়ে বললেন, ” আচ্ছা, তোমাদের জন্য চা বানায় ফ্লাক্সে রেখে দিচ্ছি। চা খেয়ে যেও কিন্তু। আর আগে আগে চলে এসো, বেশী দেরী করো না। সন্ধ্যার পরপরই জায়গাটা নীরব হয়ে যায়। আমি একটু দোকানের দিকে যাচ্ছি। ফিরতে একটু দেরী হবে । তোমরা খেয়ে নিও কিন্তু, সব রাখা আছে ।”

 

“ জ্বি চাচা “

 

 

চাচা ছাদটা বেশ সুন্দর করে সাজিয়েছেন, অনেক রকমের ফুল গাছ ছাদে। জাহিদ ভাই ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে লাগলেন । সূর্য অস্ত যাচ্ছে , কান পেতে যেন শুনছে পৃথিবীর গোপন বিষাদের সুর। হঠাৎ ফারুক ভাই একটা বেগুনী ফুল গাছের দিকে ইংগিত করে বললেন, ” এই ফুলগুলো খুব চেনা চেনা লাগছে, কোথায় যেন দেখেছি। মনে পড়ছে না। ”

 

আমাদের কারোরই ফুলের তেমন কোনো শখ নাই। বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসতে পারলে ভালো হতো, এলাকাটা দেখা হতো। জাহিদ ভাই অবশ্য চা খাওয়ার জন্য তাড়া করছিলেন, পরে উনি ছাড়া আর কেউ খেলো না । ফারুক ভাই বেশ কিছুক্ষণ ওই বেগুনী ফুল গাছ নিয়ে পড়ে রইলেন। মোবাইলে ছবি তুললেন , পরে বললেন ,” ঢাকায় গিয়ে এই গাছের একটা চারা ম্যানেজ করতে হবে, বেশ সুন্দর দেখতে ।”

 

আমরা তিনজন বেরিয়ে আসলাম। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। আজকে মনে হয় পূর্ণিমা, যদিও আকাশ মেঘে ডাকা, বেশ ফুরফুরে একটা বাতাস বইছে। হাঁটতে ভালোই লাগছে । বেরসিক জাহিদ ভাই হাই তুলতে তুলতে বললেন,” আজকে থাক, টায়ার্ড লাগছে অনেক। কালকে ভোরের দিকে যাবো না হয় ।”

 

“আরে চলেন যাই, হালকা একটু দেখে চলে আসব “, জোর করলাম আমি । সত্যি বলতে কি, আমার নিজের মধ্যেও একটু কৌতুহল ছিল এই শ্মশানঘাট আর পাগলা বাবাকে নিয়ে । অনেকটা জোর করেই জাহিদ ভাইকে ধরে নিয়ে গেলাম।

 

মিনিট বিশেক হাঁটতে হাঁটতে আমরা শহর ছেড়ে জংগলের দিকে ঢুকে পড়লাম। কিছুদূর যাওয়ার পর জাহিদ ভাই হঠাৎ বললেন, “তোরা কি কোনো হাসির আওয়াজ পাচ্ছিস? “।

 

– কই নাতো?

– আমি কেমন যেন পাচ্ছি, মনের ভুল হয়তো।

 

মিনিট খানেক পর জাহিদ ভাই কেমন যেন আতংকিত গলায় বলে উঠলেন,  “আমার পাশ থেকেই তো আসছে মনে হয়। ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ আসতেছে। ”

 

কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলাম। ঝিঝি পোকার আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই আসছে না। জাহিদ ভাই কেমন যেন কুকড়ে গিয়েছেন, প্রচন্ড ছটফট করছেন। আমি কাছে গিয়ে ওনাকে ধরলাম, ঘামে পুরা শরীর ভিজে আছে। একটু আগেও তো ভালো ছিল, হঠাৎ কি হলো ওনার? জাহিদ ভাই হঠাৎ সামনের দিকে আংগুল তুলে চিৎকার করে বললেন,” ফারুক, ফারুক, ওটা কী? কালো মতো, এদিকে আসছে.. “। জাহিদ ভাই আরো বেশী যেন অস্থির হয়ে গিয়েছেন, প্রচন্ড নড়াচড়া করছেন । বারবার কি যেন একটা দেখে ভয় পাচ্ছেন। তবে কি পাগলা বাবার কোনো অভিশাপ লাগল ?

 

ফারুক ভাই পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলেন। কি যেন একটা টাইপ করে কিছুক্ষণ দেখে বললেন, “যা ভেবেছিলাম।  শাওন চিন্তার কিছু নাই। বাড়ি চল,  জাহিদের এখন একটু ঘুমের দরকার। আমার ব্যাগে ঘুমের ওষুধ আছে।  ”

 

– মনসুর চাচাকে কি..

– চুপ! এখন কোন কথা না, তাড়াতাড়ি পা চালা।

 

ফারুক ভাই জোর দিয়ে বললেন, “জাহিদ, কিচ্ছু হয় নাই। তুই কান চাপা দিয়ে থাক। যা দেখতেসিস,শুনতেছিস সব মিথ্যা। মিথ্যা। ”

 

আমরা দ্রুত পা চালায় বাড়ি এসে জাহিদ ভাইকে শোয়ায় দিলাম। ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষটা কেমন যেন শান্ত হয়ে গেল। গুটিশুটি মেরে ঘুমাতে থাকলেন।

 

আমি ফারুক ভাইকে বললাম ” ভাই, আমি কিছুই বুঝতেছি না। সুস্থই তো ছিলেন, হঠাৎ করে কি হলো ওনার? ”

 

ফারুক ভাই কিছু বললেন না, চুপ করে থাকলেন। একটু পর বললেন,”তোকে আমি সব পরে বুঝায় বলব। আমাকে এখন একটু বের হতে হবে। তুই জাহিদের সাথে থাক।”

 

বেশ অবাক হলাম। ফারুক ভাই এখন কোথায় যাবেন? তাও আবার এই ঘটনা ঘটার পর। পালপাড়া অভিশপ্ত। আমার নিজেরই এখন কেমন যেন ভয়ভয় লাগছে।

 

কিন্তু ফারুক ভাই নাছোড়বান্দা। উনি যাবেনই। অনেক জোরাজুরি করে অগত্যা আমিও ওনার সাথে রওনা দিলাম।  আমরা হাঁটতে হাঁটতে বাজারের দিকে গেলাম। মনসুর চাচার দোকানের সামনে কয়েকজন মানুষ বেঞ্চে বসে আড্ডা মারছেন । আমরা বাজারের এক কোণায় অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে থাকলাম। মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন জমে আছে।

 

ফারুক ভাই আমার দিকে ফিরে বললেন,” আজকে বিকালে যে বেগুনী ফুলগাছটা দেখেছিলাম না, ওটার নাম Monkshood বা মিঠা জোহরা । হিমালয়ের পাদদেশে জন্মে, তবে তাপ সহ্য করতে পারে বলে আমাদের দেশেও জন্মানো যেতে পারে । মনসুর চাচা বেশ পরিচর্যা করেছে, কি বলিস ? “

 

তা না হয় বুঝলাম, তো সেটার সাথে এটার সম্পর্ক কি ?

বলছি বলছি । এই মিঠা জোহরা গাছটি বেশ বিষাক্ত । আগেরকার দিনের রাজা-বাদশাহদের গোপনে বিষ খাওয়ায় মারার বেশ চল ছিল । এই গাছের মুল কিংবা ফুল পিষে যে গুড়া হতো, তা দিয়ে একদম কার্যকরী বিষ বানানো হতো । তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই গাছ ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে । দেখিস তো, চাচা দোকান বন্ধ করছে কিনা ?

না এখনো করে নাই, তুমি বলতে থাকো ।

তো তুই গুড়া বানালি, এখন এই গুড়া যদি বুদ্ধি করে সামান্য পরিমাণে কোনো পানীয় কিংবা খাবারের মধ্যে দিয়ে মিশিয়ে দিতে পারিস , তাহলে যে খাবে তার হ্যালুসিনেশন তৈরী করা সম্ভব ,মানে ভিতরের অন্তর্নিহিত ভয়গুলো তখন তার কাছে বাস্তব বলে মনে হবে । তবে নির্দিষ্ট পরিমাণ থেকে যদি বেশী মিশিয়ে দেয়া হয়, তাহলে হার্ট বন্ধ হয়ে মারাও যেতে পারে ।

 

অবাক হয়ে গেলাম। এই এলাকায় লোকজন যেভাবে মারা যাচ্ছে, তার ধরনও অনেকটা এরকম । তার মানে কি মনসুর চাচাই ?

 

ফারুক ভাই আমার মনের কথা বুঝতে পারলেন । আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ,” আমারো তাই ধারণা । ভুলও হতে পারে । মনসুর চাচা নিজের ওষুধ অনেক সময় নিজেই বানান, তাই মিঠা জোহরার বিষ বানানো ওনার কাছে কোনো ব্যাপার না। আর তুই খেয়াল করে দেখবি, এখানে যারা মারা যায় সবাই কিন্তু কাজ শেষে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর হয়। কেউ কাজের ফাঁকে কিংবা ছুটির দিনে নয়। আর মনসুর চাচা নিজ হাতে চা বানিয়ে সবাইকে খাওয়ান । দুইয়ে দুয়ে চার মিলানো যাচ্ছে, তবুও কেমন যেন একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে।

কিন্তু আমি এখনো বুঝতে পারলাম না, উনি আমাদের চায়ে আজকে এটা মিশালেন কেন ? অবশ্যই মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে না, নিছক ভয় দেখানোই প্রধান কারণ ।কিন্তু কেন ?”

 

মনসুর চাচা দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন। এই গরমেও গায়ে চাদর জড়িয়ে আছেন।  বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তো চাদর ছিল না,  যতদূর মনে পড়ে। ওনার এক হাত চাদরের ভিতর। কিন্তু একি ! উনি বাড়ির দিকে না গিয়ে জংগলের দিকে যাচ্ছেন কেন? আমরা চুপচাপ ওনাকে ফলো করতে শুরু করলাম।

 

চাঁদের আলোয় আশপাশ বেশ ভয়ংকর সুন্দর হয়ে আছে,জোনাকির আলোয় এক অন্যরকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মাঝে মাঝেই ব্যাঙ, পেচার ডাক শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। আস্তে আস্তে জংগলের গহীনে ঢুকতে শুরু করলাম । ভাগ্যিস আজকে পূর্ণিমা, নইলে অন্ধকারে চলা কঠিন হয়ে যেত।  খুব সাবধানে শুকনো পাতা গুলো পেরিয়ে মনসুর চাচাকে ফলো করে যাচ্ছি। চাচার যেন তাড়া নেই, মৃদুস্বরে গুনগুন করতে করতে হাঁটছেন।

 

কিছুদূর যাওয়ার পর মনসুর চাচা হঠাৎ ডানদিকে মোড় নিলেন । ওইদিকে গাছপালায় ঢাকা । চাদরের নিচ থেকে একটা দা বের করে ডালপালা কাটতে কাটতে সামনের দিকে এগোতে থাকলেন। ফারুক ভাই ইশারা করায়, থেমে গেলাম। একটু আস্তে ধীরে যাই, চাচা নিজেও হালকা স্লো হয়ে গিয়েছেন । আরেকটু সামনের দিকে এগোতেই দেখলাম, সেই পুরানো মন্দির। দিনের বেলা সাধারণ ভাঙ্গা মন্দির মনে হলেও, রাতের বেলা কেমন যেন ভয়ংকর লাগছে ।মন্দিরের ভিতর থেকে আলো জ্বলছে, পাগলা বাবা আছেন হয়তো । মনসুর চাচা সেই দিকেই যাচ্ছেন ।

 

মনসুর চাচা খুব সন্তর্পণে মন্দিরের ভিতরে ঢুকলেন,হাতের দা বেশ শক্ত করে ধরে আছেন। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে আসলেন । একটু আগেও উনি বেশ নরমাল ছিলেন । কিন্তু বের হওয়ার পর কেমন যেন উত্তেজিত ভাব ওনার মধ্যে ,পাগলের মতো কি যেন খুঁজছেন। মন্দিরের পিছনে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, পরে আর গেলেন না। সাপের ভয়েই হয়তো। হালকা আলোতে ওনার চেহারা স্পষ্ট না, কিন্তু অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যাচ্ছে বেশ উত্তেজিত হয়ে আছেন। খুব সাবধানে দৌড়ে মন্দিরের পাশে এক গাছের পিছে এসে লুকোলেন।

 

বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কেটে গেল। হঠাৎ খেয়াল করলাম, পাগলা বাবা নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে হেঁটে আসছেন, সতর্কচোখে বারবার চারদিকে খেয়াল করছেন। মন্দিরের ভিতর যেই ঢুকতে যাবেন, ঠিক তখনি মনসুর চাচা দৌড়ে গিয়ে হাতের দা দিয়ে মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করলেন। পাগলা বাবা তৎক্ষনাৎ সরে যাওয়ায় দা’টা মন্দিরের গায়ে লেগে হাত থেকে ছিটকে গেল। পাগলা বাবা চিৎকার করে মনসুর চাচার উপর ঝাপিয়ে পড়লেন। ধস্তাধস্তি চলতে লাগল। পাগলা বাবা বয়স্ক মানুষ ।মনসুর চাচা পাগলা বাবাকে বেশ কাহিল করে ফেলেছিলেন।  চাচা পকেট থেকে একটা ছোট শিশি বের করলেন। তিনি সেটা খুলে পাগলা বাবার মুখে ঢুকানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু পাগলা বাবা হাত দিয়ে সরায় দিলেন, শিশিটা হাত থেকে পরে গেল । মনসুর চাচা সরে এসে এক বড় পাথর (মন্দিরের কোনো ভাঙা অংশ হবে হয়তো) দুহাতে তুললেন। কাছে এসে পাগলা বাবাকে মারতে যাবেন, ঠিক তখনি বেশ অবাক করার এক ঘটনা ঘটল।

 

পাগলা বাবা জোরেজোরে কি যেন বলতে শুরু করলেন। হঠাৎ জোরে বাতাস বইতে শুরু করল। সাথে সাথে কোথা থেকে কিছু ছায়ামূর্তি এসে মনসুর চাচাকে ঘিরে ঘুরতে শুরু করল। ছায়ামূর্তিগুলো অনেকটা ছিড়ে যাওয়া ঘুড়ির মতো দেখতে, অবয়ব স্পষ্ট না কিন্তু হাতগুলো দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তারা আস্তে আস্তে মনসুর চাচাকে উপরে তুলতে থাকল। ভয়ে ওনার হাত থেকে পাথরটা পরে গিয়েছে, আতংকে পাগলের মতো চিৎকার করছেন। ছায়ামূর্তিগুলো প্রত্যেকের হাত এখন ওনার গলায়। মনসুর চাচা প্রাণপণে চেষ্টা করছেন হাতগুলো ছাড়ানোর, কিন্তু পারছেন না।হাতগুলো যেন আরো জোরে ওনার গলা চেপে ধরেছ । ছটফট করতে করতে একটা সময় মনসুর চাচার নিথর দেহ মাটিতে পড়ে গেল।

 

চোখের নিমিষে ঘটনাগুলো ঘটে গেল। পাগলা বাবা আস্তে আস্তে উঠে দাড়ালেন। হঠাৎ জোরে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। আবারো জোরেজোরে কি যেন মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন। ছায়ামূর্তিগুলো পাগলা বাবার কাছে এসে ওনাকে আবর্ত করে ঘিরে অদৃশ্য করে ফেলল। বেশ কিছুক্ষণ ওনাকে ঘিরে ঘুরতে ঘুরতে ছায়ামূর্তিগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে গেল, পাগলা বাবা আর ওখানে নেই।

 

পরিবেশটা শান্ত হয়ে আসল । আমরা ধীরে ধীরে শ্মশানঘাটের কাছে গেলাম । মনসুর চাচার নিথর দেহ পড়ে আছে। ফারুক ভাই বললেন,” পাগলা বাবা হয়তো মনসুর চাচাকে এই মিঠা জোহরার বিষ বানাতে দেখে ফেলেছিল। তাই চাচা পাগলা বাবাকে আর বাঁচিয়ে রাখতে চাননি। ”

 

আমাদের চায়ে বিষ দেয়ার কারণ কি?

ভয় দেখানোর জন্য। মনসুর চাচা ঠিক করেছিলেন যে আজকেই পাগলা বাবাকে সরিয়ে দিবেন। আর আমরাও যেন এদিকে না আসি, তার জন্য আমাদেরকে হ্যালুসিনেট করে ভয় দেখানো চেষ্টা করেছিলেন।

কিন্তু মনসুর চাচা এই মৃত্যুগুলো কেন ঘটাতেন?

সাইকোপ্যাথ হয়ে গিয়েছিলেন! প্রকৃতি বড়ই অদ্ভুত। একটা মানুষ যে কিভাবে চেঞ্জ হয়ে যায়, কেউ বলতে পারে না।

 

 

জানি না, এই পালপাড়ায় আর আসা হবে কিনা। কিন্তু আজকে রাতের এই ঘটনাটি সবসময়ের জন্য মনে থাকবে। মন্দিরের দিকে তাকালাম। মন্দিরের আলোটাও কেমন যেন কমে কমে আসছে।

 পাঠকদের জন্য সুখবর!

অনলাইনে ডিজিটাল বাংলা  কমিক্স পড়ুন
ফ্রি-তে!

সদস্য রেজিস্ট্রেশন
close-link