দিনটা ছিল ১৩ই আগস্টরবিবার২০১৭ এতো ভালো করে কিভাবে মনে রাখলাম দিনটা তা বলছি 

প্রতিদিনের মতো সেদিনও অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। তবে একটু বেশিই দেরি হয়ে গিয়েছিল। অফিসের এক্সট্রা নাইট ডিউটি ছিল বলে এত দেরি। রাত তখন প্রায় আড়াইটা। গ্ৰাম তখনো অনেক দূরে। জঙ্গলের মাঝখানের নির্জন বড় রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। কেমন যেন গা ছমছমে পরিবেশ। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। আলোটা নিভালেই কুচকুচে অন্ধকার। রাস্তায় কোনো গাড়ি নেইতাই অগত্যা হেঁটেই যেতে হচ্ছে। একটু পর পর হালকা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। অমাবস্যার রাতবাতাসে গাছের পাতা ঝনঝন করছে। সব মিলিয়ে কেমন যেন একটা ভুতুড়ে পরিবেশ 

 

রাস্তায় আমার মোবাইলের আলোর সাথে আরও একটা আলো আমার পিছন দিকে দেখা যাচ্ছে। তবে তা আমার থেকে অনেক দূরে। হাঁটতে হাঁটতে একটু সামনে যেতেই আরো একটা দেখতে পেলাম। ওটা বাসস্ট্যান্ডের হেডলাইটের আলো। তবে ওখানে যেতে আরো আধ ঘন্টার মত লাগবে। অঘটন ঘটল তখনইমোবাইলের আলো নিভে গেছে। বোধহয় চার্জ শেষ। কুচকুচে অন্ধকারে অনুমানে পা ফেলে ফেলে বাসস্ট্যান্ডের আলোর দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম। কেমন যেন একটা অদ্ভূত শব্দ শুনতে পাচ্ছি। শব্দটা একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর হচ্ছে। অন্ধকারে অনুমানে হেঁটে কোনভাবে বাসস্ট্যান্ডে পৌছালাম।  

বাসস্ট্যান্ডের বাসে লিস্ট দেখে বুঝলাম ভোর চারটের সময় একটা বাস আছে আমাদের গ্রাম আরো ১০১২ কিলোমিটার দূরে চারটা বাজতে আধঘন্টার মত সময় তাই সিদ্ধান্ত নিলাম বাসের জন্য অপেক্ষা করার 

 

বসে বসে আমার পিছনে থাকা সেই দূরের আলোটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেটা আস্তে আস্তে কাছে আসছে। একটা সময় তা স্পষ্ট হলো। দেখে আমি চমকে গেলাম। একটা খাটিয়াতে করে চারজন লাশ নিয়ে আসছে। আমি বুঝতে পারছিলাম না কী হচ্ছে। এমনিতেও এই রাস্তা দিয়ে লাশ নিয়ে যাওয়া মানা। তারা লাশটি রাস্তার ধারে এনে রাখল। চারজনের মধ্যে একজন এসে আমার পাশে এসে বসলোআর বাকি চারজন দাঁড়িয়ে রইল। আমি তাকে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই এটা কার লাশকোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?’ লোকটি আমার দিকে কেমন করে যেন তাকালো। তবে কিছুই বলল না। হঠা একটা এম্বুলেন্স এর আওয়াজ শুনলাম। এম্বুলেন্স আসতেই চারজন আর ড্রাইভার মিলে তাতে লাশটা তুলল 

সাথে সাথেই তা হর্ণ বাজাতে বাজাতে চলে গেল। চারটে বেজে দশ মিনিট হয়ে গেছেতখনই বাসের দেখা মিলল। বাসটা মনে হয় মাত্র ছেড়েছেআমাদের গ্রাম হয়ে শহরে ঢুকবে। বাসা শুধু ড্রাইভার,হেলপার আর আমি। বাস অনেকক্ষণ যাব চলছেতবে হঠা থেমে গেল। দেখলাম ড্রাইভার আর হেল্পার চিল্লাচ্ছে। ‘এই এম্বুলেন্স কারড্রাইভার কই?’ 

 

কিছু বলতে না বলতেই ড্রাইভার আর হেলপার গাড়ি থেকে নেমে পিছন দিকে ছুটতে লাগলো। আমি জানালা দিয়ে মাথা বের করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী  হয়েছেপালাচ্ছেন কেন?’ হেল্পার শুধু বলল ‘ভূত!’ আমি দেরি না করে বাস থেকে নেমে গেলাম। আস্তে আস্তে পা ফেলে এম্বুলেন্সের কাছে গেলাম। এটা সেই এম্বুলেন্সইযেটা করে একটু আগে ওই চারজন লাশ নিয়েছিল। ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখলাম কেউ নেই। সামনে ড্রাইভারও নেইআছে শুধু রক্ত। একটা জায়গায় এমন ভাবে রক্ত পড়ে আছে যে মনে হচ্ছিল কাউকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেই রক্ত অনুসরণ করে আমি জঙ্গলে ঢুকলাম। রক্ত অনুসরণ করে দৌড়াচ্ছি এমন সময় সামনে দেখতে পারলাম কাউকে। ওটা রঞ্জশরীওর জন্যই এই রাস্তা দিয়ে লাশ নিয়ে যাওয়া মানা। গ্রামের বড়দের কাছ থেকে শুনতাম ওর কথা। সারা শরীর থেকে লাল আলো বের হচ্ছেমনে হচ্ছে যেন রক্ত ঝরছে। পরনে লাল রঙের লম্বা গাউন এর মত কিছু একটা। আর কোমড় পর্যন্ত ঘন কালো চুল। আমি শুধু দেখছিলাম পিছন দিক থেকেতাও আবার অনেক দূর থেকে। তার হাতের দিকে তাকাতেই থমকে গেলাম। যে চারজন লাশ নিয়ে যাচ্ছিল তাদের একজনের পা ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তবে সে মৃত। যখন আমি চিৎকার করে ‘থাম‘ বলার প্রস্তুতি নিচ্ছিতখনই ঠিক পিছন থেকে একজন আমার কাঁধে হাত রাখলো। তখন এত ভয় পেয়েছিলাম যে বলার মত নয়। খুব আতংকিত হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালাম 

 

তাকিয়েই হতভম্ব হয়ে গেলাম। ভয়ঙ্কর চেহারার সাধুমতো একজন। পা পর্যন্ত লম্বা কালো রঙের পাঞ্জাবি পরামাথায় নীল রঙের পাগড়ির মত কিছু একটা। হাতে অদ্ভুত ধরনের সাপের মত পেচানো একটা লাঠি। আমাকে মুখে আঙ্গুল দিয়ে চুপ থাকতে বলছে 

 

তিনি আমাকে ধরে পিছনে টেনে নিয়ে এলেন ফিসফিস করে বললেন, ‘ওকে ওর কাজ করতে দাওওর কাজে বাধা দেওয়া ঠিক নয় ওর শক্তি অনেক এখান থেকে চলে যাও!’ এটা বলে তিনি অন্যদিকে যেতে লাগলেন আমিও তার পিছন পিছন যেতে লাগলাম 

 

আমার পিছু নেওয়া বন্ধ করো 

কে এই রঞ্জশরী 

জানতে চাও? 

হুম 

আমি হাঁটছি ওনার পিছন পিছন আর উনি বলছেন রঞ্জশরীর কথা 

রঞ্জশরী হল এক পিশাচিনী তার জন্ম হয়েছিল সাধারণ মানুষের মতোই কিন্তু যত বড় হতে লাগল ততই তার আচরণ আর ক্ষমতা ভয়ঙ্কর হতে লাগল এটা দেখে তার পরিবার আজ থেকে প্রায় পনের বছর আগে তাকে এই জঙ্গলে রেখে গিয়েছিল তার অনেক বছর পর একদিন মাঝরাতে এই রাস্তা দিয়ে গ্রামের এক মৃত ব্যক্তির লাশ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এমন সময় বাধা দিল রঞ্জশরী ওই লাশ নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সে মেরে ফেললশুধুমাত্র একজন পালিয়ে বেঁচেছিল সে গ্রামে ফিরে সব কথা খুলে বলল তার দেয়া বর্ণনা অনুযায়ী ওই কিশোরীর নাম দেয়া হয় রঞ্জশরীঅর্থাৎ রঞ্জিত কিশোরী এরপর থেকে মাঝরাতে অর্থাৎরাত বারোটা থেকে ভোর পাঁচটার মধ্যে কেউই এই রাস্তা দিয়ে লাশ নিয়ে যাতায়াত করে না আজ সে অনেকদিন পর সুযোগ পেয়েছে 

ওই লাশ নিয়ে সে কি করে? 

আমি একটু আগে যতদূর দেখেছিজঙ্গলের মাঝে যে পুকুরটি আছেসেই পুকুরে নিয়ে ফেলে 

রঞ্জশরীকে আপনি সামনে থেকে দেখেছেন কখনো? 

অনেকদিন আগে একবার দেখেছিলাম এক ঝলক খুবই তেজ চেহারায়তাই তাকানো যায়না আলোর তেজে চোখ বন্ধ হয়ে যায় 

আচ্ছাআপনি কে? 

তা তোমার জানার দরকার নেই তুমি অনেক কিছুই জেনে ফেলেছে এখন তোমার উচিত এখান থেকে চলে যাওয়া 

 

কথা বলতে বলতে কখন যে জঙ্গলের বাইরে চলে এলাম টের পাইনি রাস্তায় উঠে  সাধুর দিকে তাকালামঅদ্ভুত এক ভঙ্গিতে হেঁটে হেঁটে তিনি জঙ্গলের ভিতরে চলে গেলেন 

 

এম্বুলেন্স আর বাস ওখানেই আছে। পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এল। আমি শুধু বাস থেকে নামার ঘটনা পর্যন্ত বললামবাকিটা বললাম না। বললেও হয়তো বিশ্বাস করত না। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম। রক্তের যে দাগটা অনুসরণ করে আমি জঙ্গলে ঢুকেছিলামঅদ্ভুতভাবে সেটা মুছে গেছে। পুলিশ অনেক তদন্ত করলতবে এই কাজটি কে করেছে তা বের করতে পারেনি। তারা শুধু এটুকুই বলতে পেরেছে যেওই চারজন ছেলে এই রাস্তায় মাঝরাতে লাশ নিয়ে যাওয়ায় রঞ্জশরীর আক্রমণের কথাটি মিথ্যা প্রমাণ করতে চেয়েছিল। এই জন্য গ্রামের হাসপাতালের মর্গ থেকে একটা লাশ চুরি করে অন্য হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল 

 

তবে একটা জিনিস আমাকে এখনো ভাবায়যে রঞ্জশরী ওই লাশগুলো পুকুরে ফেলে কি করেআর লাশ এবং লাশবাহীদের সাথেই বা তার কী  শত্রুতাএই রহস্যের জট আমি এখনো ভাঙতে পারিনি। হয়তো কিছু জিনিস রহস্যই থেকে যায়! 

 পাঠকদের জন্য সুখবর!

অনলাইনে ডিজিটাল বাংলা  কমিক্স পড়ুন
ফ্রি-তে!

সদস্য রেজিস্ট্রেশন
close-link