পড়ার টেবিলে মন খারাপ করে টেবিলের উপর মাথা রেখে ঝিমাচ্ছিলাম। এস এস সি শেষ কিছু করার পাচ্ছিনা। হঠাত দেখি আমার সামনে রাখা কলমদানীটা টেবিল থেকে হাল্কা উপরে উঠল। উঠে একবার ডানে হেলে একবার বামে হেলে যায়। পরে গেল টেবিলের নীচে। এই পুরো বিষয়টা ভূতুরে হতে পারে ঐ সময় তা খেয়াল ছিল না তাই ভিডিও করছিলাম।এরপর ঘুম পায় ঘুমিয়ে পরি।
সকাবেলা ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে কিছুক্ষণ নিউজফুড স্ক্রোল করার পর মনে পরল আমার বন্ধুকে নোট পাঠানোর কথা। ফোনের গ্যালারীতে ঢুকে দেখি নতুন একটা ভিডিও। কিছুক্ষন ভাবলাম যে আমি তো কোনও ভিডিও করিনি, এটা আসলো কোথা থেকে। যাই হোক, ভিডিও টা দেখার সাথে সাথে চমকে উঠলাম। গত রাতে আমি এতটাই আনমনে ছিলাম যে এই কাজটা যে ভূতুড়ে হতে পারে না ভেবেই করছিলাম। আমার বন্ধু কৃপাকে ভিডিওটি পাঠিয়ে ফোন থেকে ডিলিট করে দিলাম। কৃপা বলল “তুই এখনও এই বাসায় আছিস ক্যামনে! আমি হইলে তো থাকতাম ই না বাপরে বাপ!” দুজনই আর কাউকে কিছু জানাইনি।

তারপর স্বাভাবিক ভাবেই দিন যাচ্ছিলো। একদিন টিভি দেখছিলাম, হঠাৎ আম্মুর চিৎকার শুনলাম। যেয়ে দেখি মা মাটিতে পরে আছে। জিজ্ঞেস করছি কি হয়েছে কিন্তু মা কিছু বলতে পারছে না। এরপর ডাক্তার আসলেন, দেখে বললেন কিছু দেখে অতিরিক্ত ভয় পেয়েছেন। জ্ঞ্যান ফিরার পর বললেন রুমে একটা উদ্ভট গন্ধ ছিল আর পিছনে তাকানোর সাথে সাথে এক কদাকার আকৃতির মানুষ দেখে সে অজ্ঞ্যান হয়ে যায়। সাহস করে পরিবারে সবার সাথে আমিও ভিডিওটা শেয়ার করলাম।
পরদিন, বাসায় ওঝা এল! সে নাকি খুব ভালো ওঝা অনেকের বাড়ির ভূত তাড়িয়েছে। পুরো বাড়ি পর্যবেক্ষণ করে দেখে তারপর বলল “খুব ভয়ংকর কিছুর এই বাড়ির উপর নজর পড়েছে।“

সারাদিন আমাদের ড্রইং রমে বসে মন্ত্র পড়লেন। রাত ৯ টায় তার সামনে আমাদের বসতে বললেন। আমরা সবাই তার সামনে বসলাম। এরপর দেখি সে মন্ত্র পড়তে পড়তে এক সময় ঘেমে উঠলো তাও মন্ত্র পরা বন্ধ হলো না। এসি চালানো তাও ঘেমেই যাচ্ছেন। এর কিছুক্ষনের মধ্যেই পুরো রুমে গন্ধ ছড়িয়ে পরল আর কেমন যেন ভারী হয়ে যেতে থাকল চারপাশ। হঠাৎ দেখি তার মুখ লাল হয়ে আসতে থাকে আর অনেক জোড়ে চিৎকার দিয়ে সে মাটিতে বসে পরে। এ্যাম্বুলেন্স খবর দেয়া হলো, হসপিটালে যেতে যেতে লোকটি আর বেচে উঠলো না।

বাইরের মানুষ আর আমাদের বাড়িতে ঢোকে না, আত্মীয়রা আমাদের বাড়িতে আর আসে না। এখন সত্যিই নিজের বাড়িকে ভূতুরে বাড়ি মনে হয়। কৃপাকে বাসার সব কাহিনী বললাম, সে আমাকে এমন একজনের সন্ধান দিল যে কিনা প্যারাসাইকলোজি নিয়ে অনেক কিছু জানেন, মিঃ জামাল। ভাবলাম হয়ত ফিস বেশি চাইবেন, কিন্তু কৃপা বলল সে প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেশনে কোনো ফিস ই নেবেন না। এটা শুধুই তার নেশা।

মিঃ জামালকে ফোন করলাম, বেশ ভাড়ি কন্ঠের একজন, সব শুনার পর বললেন “ঘটনার কোনো প্রমান আছে?” তারপর ভিডিও টা তাকে পাঠিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ পর সে আমাকে ম্যাসেজ দিয়ে জানালেন তিনি সাহায্য করবেন কিন্তু সেক্ষেত্রে তিনি আমাদের বাসায় থেকেই কাজটি করতে পারবেন।

আমার পাঠানো ঠিকানা অনুযায়ী পরদিন জামাল সাহেব আমাদের বাসায় আসলেন। তার জন্য একটি রুম গুছিয়ে রাখা হয়। জামাল সাহেব আমাদের সবার সাথে কথা বলে জানতে চায় কাদের সাথে অদ্ভুত ঘটনা সবথেকে বেশি বার ঘটেছে। আমি বললাম আমি আর আমার মা। তিনি আর কিছু বললেন না। দুইদিন চলে গেল কিছু ঘটল না। তারপর দিন সকাল ১১টায় আমি আর জামাল সাহেব দুইজনই টিভি রুমে বসে ছিলাম, হঠাৎ টি টেবিল টা উলটে গেল আর বাসার সদর দরজাটা খুলে গেলো। সাথে সেই বিদ্ঘুটে গন্ধটাও ছিলো।

জামাল সাহেব আরও কিছু জানতে চাইলেন এই বাড়ি নিয়ে। আমাদের বাড়িটা নতুন বাড়ি, বাড়ির অন্য সব ফ্ল্যাট ভাড়া দেয়া। এসব জানার পর তিনি ছাদটা দেখতে চাইলেন।

ছাদে গিয়েই জামাল সাহেবের চোখ পরল ছাদের রুমটার দিকে। ছাদের এই রুমটা মূলত আমাদের স্টোর রুম। একটা ছোটো খাট, ফ্যান আর অকেজো পুরান জিনিস। আমাকে রুমটা খুলে দিতে বললেন আর এখন থেকে এই রুমটাতেই তিনি থাকবেন। তাকে কোনো জোর না করে তার কথা অনুযায়ী তার সবকিছু এই রুমে নিয়ে আসা হল।

রাতে, তার খাবার নিয়ে ছাদে উঠে দেখি ভাঙ্গা রেডিও নিয়ে জামাল সাহেব কিসব করছেন। আমি বললাম, “এটা তো অনেক আগের রেডিও। আমার দাদা এটা ব্যবহার করতেন। তাও সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে”।

সাথে সাথে জামাল সাহেব যেন চমকে উঠলেন কিন্তু মুখে শুধু বললেন,” ও, আচ্ছা”।
অনেকগুলো ফ্রেশনার দেয়ার পরও বাসার বিদ্ঘুটে গন্ধটা যাচ্ছে না কিছুতেই, বিশেষ করে টি টেবিলের এই ঘটনার পর থেকে। আর বাসাটাও কেমন যেন ভার ভার হয়ে থাকে সবসময়।

পরদিন সকালে ছাদে উঠলাম জামাল সাহেবের নাস্তা দিতে, দেখি রেডিও টা এক কোণায় ফেলে রাখা। রুমের দরজায় নক করতেই দরজা খুলে আমাকে দেখেই তিনি বললেন” রেডিওটা ফেলে দেয়া উচিৎ ছিলো” আমি তাকে বললাম “ আগে নাস্তা করেন, এসব নিয়ে পরে কথা হবে”। ছাদে অনেক গুলো ফুলের গাছ আছে। ফুলের গাছে পানি দিতে দিতে হঠাৎ ছাদের কল থেকে একাই পানি পরতে শুরু করল। আমি গিয়ে কল বন্ধ করলাম আর এর মধ্যেই জামাল সাহেব নাস্তা শেষ করে এসে বললেন” এত পুরানো জিনিস ঘরে না রাখা ভালো।“ আমি কিছু বলার আগেই রেডিও টা বেজে উঠলো” এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” জামাল সাহেব এগিয়ে গেলে রেডিওটি বন্ধ হয়ে যায়।

রেডিওটি নিয়ে আমি আর জামাল সাহেব ছাদ থেকে নেমে বাসায় আসলাম। আর রেডিওটিকে রাখা হল ডায়নিং টেবিলের উপর। আমি আর বাসার সবাই রেডিওটিকে ঘিরে বসলাম। জামাল সাহেব রেডিওটি টিউনিং করতে করতেই বাবা বলে উঠলেন

”আমি জানতাম, এই রেডিওটি বাবা ফেলেনি। রেখে দিয়েছেন”

আমি বাবা কে জিজ্ঞেস করলাম” দাদারই না রেডিও টা?”

বাবা বললেন” না। রেডিওটা মাক্সুদ চাচা বাবাকে দিয়েছিলেন, যিনি যুদ্ধে শহীদ হন”

এর মধ্যে বিদ্ঘুটে গন্ধও বেড়ে গেলো আর রেডিও থেকে একটা হাসির শব্দও আসতে লাগলো। জামাল সাহেব পকেট একটি স্পিরিট বক্স বের করলেন আর রেডিওর দিকে তাক করে বললেন” তুমি যেই হও আমাদের সাথে কথা বল। তুমি কী চাও? কোথা থেকে এলে এখানে?”
হঠাৎই স্পিরিট বক্স টা বন্ধ হয়ে বারস্ট হয়ে গেলো।
রাত ১০ টা পর্যন্ত বাড়িতে থমথমে অবস্থা ছিল।

রাত ১১টা, হঠাৎ রেডিওর ঝিরঝির শব্দ। জামাল সাহেব আর আমরা সবাই রেডিওর চারপাশে বসে থাকলাম। ১০ মিনিট পর আবার হাসির শব্দ। আবার জামাল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন”তুমি কে? কি চাও”

তখন চিৎকার করে রেডিও থেকে বিকট কন্ঠে বলে উঠল ”রেডিওওওওওওওওওও”
এরপর রেডিও টা বন্ধ হয়ে গেলো

তারপর আমরা আর কেউ ঘুমাতে পারলাম না। সবাই ড্রয়িং রুমে বসে থাকলাম। আর জামাল সাহেব রেডিও নিয়ে আবার টিউনিং করতে বসলেন।

রাত সাড়ে ৩ টা। বিকট গন্ধ টা বাড়লো। রেডিও তে ঝিরঝির শব্দ। সবাই ভয়ে আতংকিত। থমথমে পরিবেশ। হঠাৎ রেডিও থেকে চিৎকার করে মেয়েলি কন্ঠে বলে উঠলো “রেডিওওওওওওওওওও” “জামালপুউউউউউউর” “মাদারগঅঅঅঞ্জ”
আবার রেডিও বন্ধ হয়ে গেলো, বিকট গন্ধ টাও কমে গেলো।
কিন্তু হঠাৎই,

“ঠাস!!!”

টেবিলে রাখা ফুলদানী টা ভেঙ্গে গেলো। সারারাত কেউ আর ঘুমাতে পারল না।

সকালে সবাই নিজেদের মত কাজে গেলো। সারাদিন কিছু ঘটল না।

রাত ৯টা। আবার রেডিওর ঝিরঝির শব্দ। ঐ সময় আমি আর জামাল সাহেব ই রেডিওর কাছে ছিলাম। ঝিরঝির শব্দ হয়েই যাচ্ছে আর ভলিউম ততই বাড়ছে। কিন্তু না কোনো হাসির শব্দ না কোনো চিৎকার। জামাল সাহেব রেডিওর কাছে গিয়ে বলল ”আমি তোমাকে নিয়ে যাবো মাদারগঞ্জে”
এক মুহূর্তে শব্দ বন্ধ হয়ে গেলো। কিন্তু গন্ধটা গেলো না।

আমি জামাল সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তিনি বললেন “আমার এতদিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমি এইটুকু বলতে পারি যে এই রেডিও টি শুধু শোনার কাজেই ব্যবহৃত হত না। আপনার দাদা মাক্সুদ নামের লোকটির সাথে রেডিও ফ্রিকুএন্সির মাধ্যমে কথা বলতে চাইতেন, যিনি ছিলেন অন্য জগতের“

ততক্ষনে বাড়ির সবাই এসে হাজির ছিল ড্রয়িং রুমে। জামাল সাহেব বললেন” কালই রেডিওটিকে নিয়ে জামালপুর যাবো। আসা করি এরপর আর কোনো সমস্যা হবে না” তারপর বললেন” আপনারা আপনাদের রুমে যান। আমি কিছুক্ষন এখানেই বসি”
সবাই চলে গেলো,আমি জামাল সাহেবের পাশে বসলাম, বললাম “ধন্যবাদ”
তিনি শুধু হুম বলে তার ঘরে চলে গেলেন। আমি রেডিওর দিকে না তাকিয়ে আমিও রুমে চলে গেলাম।
সকালে উঠলাম, উঠে দেখি জামাল সাহেব চলে গেছেন। তাকে ফোন দিলাম। কিন্তু উত্তর আসলো “নম্বরটি আর ব্যবহৃত হয়না” কৃপাকে ফোন দিয়ে তার অন্য কোনো নাম্বার চাইলে সে জানালো এই একটি নাম্বারই আছে।
এর পর থেকে বাড়িতে না হয় কোনো উদ্ভট ঘটনা, না কোনো গন্ধ, আর না পেলাম আমি জামাল সাহেবের কোনো ঠিকানা।

 পাঠকদের জন্য সুখবর!

অনলাইনে ডিজিটাল বাংলা  কমিক্স পড়ুন
ফ্রি-তে!

সদস্য রেজিস্ট্রেশন
close-link