নিবিড়ের বিরুদ্ধে ওর দুই বন্ধুর সবসময়ই সবচেয়ে বড় কমপ্লেইন ছিল ওর টাইম মেইন্টেনেন্স নিয়ে।

দুই বছর আগে এপ্রিল মাসে আর একবারই সিলেট এসেছিলাম আমরা তিনজন। সেইবারও আমার লেট করার জন্যই রাতের ফিরতি এনা বাস ধরতে হয়েছিল আমাদের। এরপরের গল্প শুধুই বিভীষিকার।

এনা বাস নিয়ে সারাজীবন অনেক কথাই শুনে আসছি মানুষের মুখে, কিন্তু তাই বলে একটা বাস দুই ট্রাকের মাঝখান দিয়ে ১২০ কি.মি. স্পিডে টানবে সেটা কে জানত! ভয়ে আত্মা যেন মুখে চলে আসছিল বারবার, প্রথম ২ ঘণ্টা টেনশনে ঘুমই আসলো না। আড়াইটার দিকে একবার চোখ বুজে এসেছিল যা, তাও কিছুক্ষণ পরে ঠাস করে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। এমন না যে ঝাঁকুনি লাগছিল, বাস বেশ স্মুথলি চলছে। বাসের পর্দা টেনে বাইরে তাকালাম শুধু, দেখি বামের দিকে কাত হয়ে রং সাইড দিয়ে একশ’র কাছাকাছি স্পিডে এগিয়ে যাচ্ছে বাসটা, বাসের একদম গা ঘেঁষে সাই সাই করে একটার পর একটা  ট্রাক আর লরি বেড়িয়ে যাচ্ছে। ব্যস, সেই যে ঘুম একবার চাঙ্গে উঠল, এরপর  সারারাত প্যাঁচার মত বড় বড় চোখ করে জেগে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম আমি। ওইদিনই মনে মনে শপথ করেছি, টাইম মেইন্টেন করা নিয়ে আর কখনপ ভেজাল তো করবই না, পরের বার সিলেট আসলে বিকাল ৪টার বাস ছাড়া কোন কথা হবে না। এটাই লাস্ট স্ক্রু-আপ।

সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে এবার আসলেই পুরা ট্যুরে টাইমটেবিল নিয়ে কোন স্ক্রু আপ করার চান্স দেই নাই আমি। ভোরে ভোরে জাফলং গিয়ে, দুপুরের আগেই রাতারগুলসহ সব ঘুরে দেখার মতো এরিয়া কাভার করা হয়ে গেছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে সূক্ষ্ম ভাবে সাজানো সব স্ট্র্যাটেজির ভরাডুবি হবে মনে হচ্ছে।

লাঞ্চ শেষ করে বিকালের দিকে টিকিট কাটার কথা তুলতে যাবে মাত্র, কাশফি হারামি হুট করে তাগাদা দেওয়া শুরু করল— তার শাহ পরানের মাজার হয়ে যাওয়া লাগবে যেভাবেই হোক। আন্টি বলে ওখান থেকে কী তবারক কিনে আনতে বলেছিলেন, না নিয়ে গেলে ওর ভাষ্যমতে বাসায় ওকে আস্ত রাখবে না। আমি তো আবার আরেকটা জায়গা কভার দেয়ার রিস্ক নিতে একদমই ইণ্টারেস্টেড না, বাসের টিকিট কিনার জন্য অলরেডি হাত-পা নিশপিশ করা শুরু করে দিয়েছে। আগের বারের বাস জার্নির কথা বার বার ফ্ল্যাশব্যাক হচ্ছে আর মাথা যেন পাঁক দিয়ে উঠছে। কাশফি এরপর ও একটু গাঁইগুঁই করে স্বাধীন কে নিজের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, কেননা স্বাধীনের আবার এরকম অবস্থায় অসহায়ের যে তার সাইড নেওয়ার অভ্যাস আছে। কিন্তু আমি এবার বদ্ধপরিকর, সুইং ভোট যেই সাইডেই যাক আমি মাটি কামড়ে আমার ডিসিশিনে পড়ে থাকব। স্বাধীন অ্যাজ সাস্পেক্টেড বলে বসল, “ইয়ে মানে…নিবিড়, কাশফি এর মা কিন্তু আসলেই ডেঞ্জারাস হয়া যায় রাগলে। চল, আমরা তাড়াতাড়ি রওনা দেই তাইলে ব্যাকও তাড়াতাড়ি করা যাবে। আর শাহ পরান তো মামা এখান থেকে ১৫-২০ মিনিটের রাস্তা, একবারে ফেরার পর টিকিট কিনলেই হইবো। চল মামা, হুদাই প্যারা খাইস না।”

কাশফি আর স্বাধীন দুইজনই আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আমার ডিসিশন শোনার জন্য।

স্বাধীন “প্যারা নাই” কথাটা যে কনফিডেন্সের সাথে বলছিল, ওর লোকেশানের হিসাবটা যে ভুল সেইটা জানলে ওর কনফিডেন্স এতটা বেশী হত না। ও শাহজালাল মাজার আর শাহ পরান এর মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছে। জিজ্ঞেস করে জানলাম শাহ্‌জালাল ছাড়িয়ে আরও ১৫ কি.মি. এর মত রাস্তা পাড় হয়ে শাহ্‌ পরান পড়ে।

লোকেশন নিয়ে কনফিউশন তো ছিলই, শাহ্‌ পরান পর্যন্ত যেতে এক্সট্রা একবার বাস বদল করতে হল। শেষমেশ পরানের গেটে যখন নামলাম আমরা, সূর্য ডোবার আর একটুও দেরি নাই। নামার পরপরই কাশফি একটু দূরে সরে বাধ্য ছেলের মত ওর মাকে ফোন দিল তবারক বিলির লোকেশন জানার জন্য। আমি সুযোগ পেয়ে স্বাধীনকে চোখের দৃষ্টি দিয়ে ভস্ম বানানোর জন্য অনেকক্ষণ চেষ্টা করলাম একনাগাড়ে, ও এক হাত পকেটে ঢুকিয়ে বিড়বিড় করে র‍্যাপ আউড়ে যাচ্ছে। ইচ্ছা করে আই কন্ট্যাক্ট এড়ানোর এর চেয়ে পারফেক্ট টেকনিক আর হয় না। আমি নির্দ্বিধায় হার মেনে অপেক্ষা করতে থাকলাম কাশফির ফোনালাপ শেষ হবার জন্য।

“চল চল, ভিতরে ঢুকি। মা বলল মাজার শরীফ এর ভিতরেই এক হুজুর আছেন, জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে। উনিই তবারক দেন। মাগরিবের ওয়াক্ত যেহেতু হয়ে গেছে, জামাতটা পড়ে ফেলি। এরপর তবারক টা কিনে আশপাশটা দেখে রওনা দিলাম, কী বলিস?”

আমরা গেট দিয়ে ঢুকে সোজা আগাচ্ছি, এমন সময় আজান দিয়ে দিল। শাহ্‌ পরানে আমার আগে আসা হয়নি, শাহ্‌জালালের মাজারে অবশ্য একবার গিয়েছিলাম ছোটবেলায়। এই মাজার টা শাহ্‌জালাল থেকে ছোট। মেইন গেট দিয়ে ঢুকলেই সোজা চোখে পড়বে মাজার ভবন। হাতের ডান দিকে তাকালে ছোট্ট একটা পুকুর দেখা যায়। মাজারে মানুষের যত ভিড় দেখব ভেবেছিলাম তার ধারেকাছেও নাই। পরে মনে হল জামাতের সময় দেখে হয়ত এত কম লাগছে, মাজার শরীফের ভিতর মানুষ বেশী থাকতেই পারে।

মাজার প্রাঙ্গনে নজর কাড়ার মতো শুধু আছে একটা বট গাছ। বট গাছটা প্রাচীন আর বিশাল আকারের, গুড়িটা পুরো লাল ফিতা দিয়ে পেঁচানো। সন্ধ্যা বেলা হবার কারণে গা ছমছম করে উঠাই স্বাভাবিক। তারপরও আশপাশের বাকি সব স্বাভাবিক এর মধ্যে এইটাই যে কারো নজর কাড়বে, তা বলে দিতে পারি।

“কিরে, জবাব দে। আজান তো দিয়ে দিয়েছে, একেবারে দরগাতেই ঢুকে পড়তে চাচ্ছি। দেরী করিস না তাহলে, জুতা টা খুলে হাতে নিয়ে ঢুকে পর।” সামনেই মাজার শরীফে উঠার সিড়ি, জুতা খুলে এখনও কিছু মানুষ ঢুকছে।

“তুই আর স্বাধীন যা, আমি বট গাছের নিচেই আছি,” কথাটা বলেই আমি পাল্টা জবাব দেওয়ার কোন সুযোগ না দিয়ে দিকে হাঁটা দিলাম। দাঁড়িয়ে থাকলে কাশফি আবার জিজ্ঞেস করবে, কেন কী হয়েছে টাইপ কিছু। স্বাধীন পারলে আমার সাথেই যেত, কিন্তু ও মুখের উপর না বলতে পারে না। আমিও যে সবসময় মুখের উপর না বলি তা না। কিন্তু কিছু কিছু দিন যায় যখন কোন কিছুর তোয়াক্কা থাকে না আমার, আজকে সম্ভবত ওই কিছু কিছু দিন এর একটা। বট গাছের পিছনটা এখন ফাঁকা পাব বলেই বলে মনে হচ্ছে, থাকলে সেখানে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরানো লাগবে। দেখি ফাঁকা পাই কিনা।

বট গাছ টা হাতের বামে রেখে ঘুরে এর পিছনে যেতে হয়। মোড়টা ঘোরার আগে মাথায় আসছিল হয়ত ঘুরেই দেখব এক জটলা মানুষ, কিন্তু নাহ, মানুষ বলতে খালি একজন আছে। লোকটা নিশ্চয়ই পীর-ফকির কেউ হবে, গায়ে পা পর্যন্ত লুটিয়ে পড়া কালো জোব্বা, মাথায় লাল রঙের পাগড়ি, হাত ভর্তি নানা রঙের আংটি। গলায় বাদামি রঙের কী একটা বীচি দিয়ে তৈরি মালা। কত পড়েছি বই-টইয়ে এই মালাটার নাম, কিন্তু মনেই করতে পারলাম না এখন। দাড়ি না পাকলেও লোকটার বয়সও বোধহয় খারাপ না, কারন গুড়ির নিচে যেখানে আসন গেড়ে বসে আছেন ঠিক তার সামনেই একটা কাঠের ছড়ি রাখা। আর আছে বট গাছে যে ফিতা গুলা বাধা সেই ফিতার বান্ডেল। উনিই তাহলে গাছে ফিতা বাধার দায়িত্বপ্রাপ্ত। দূর থেকে উনার কড়া আতর এর ঘ্রাণও পাওয়া যাচ্ছে। সিগারেটটা ধরালে ঘ্রাণ টা কম লাগবে, কিন্তু ধরানো উচিত হবে কিনা বুঝতে পারছি না। সিগারেট ধরানো নিয়ে কড়াকড়ি কোন নিয়ম নাই তো?

“কী, বিড়ি ধরাইবেন নাকি এনো?” শুনে ভালই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিলাম, পরে খেয়াল করলাম লাইটারটা হাতে নিয়ে ফেলেছি নিজের অজান্তেই। কি বলে সম্বোধন করব সেটাও চিন্তা করছি, হুজুর নাকি চাচা? আচ্ছা, চাচাই বেটার।

“জি চাচা, সমস্যা হবে ধরালে?”

“আমার আর কী সমস্যা হইব, কও? আল্লাহ্‌ পাকের ঘরে আইলে তোমারও যে ক্ষমতা, আমার ও তো তাই। এক ক্ষমতা ছাড়া সৃষ্টি হইয়া আমি এইখানে বইয়া আরেকজনরে ভালা-মন্দ কওনের ক্যাঠা? তোমার মনে ধরলে খাও, আমার কুনো আপত্তি নাই।”

এটার প্রত্যুত্তরে কি বলা উচিত? ধন্যবাদ দিব? আমি হালকা বিব্রত হয়ে উপরে নিচে মাথা নেড়ে ফস করে বিড়িটা ধরিয়ে নিলাম। পীরবাবা আমার কৃতজ্ঞতা সুলভ মাথা নাড়ানো দেখেন নাই, উনি চোখ বন্ধ করে মাথা নামিয়ে দোয়া শুরু করেছেন বিড়বিড় করে। উনার দিক থেকে একটু সরে এসে অন্য দিকে মুখ করে বিড়িটায় টান দিচ্ছি আমি। তবে খেয়ে যেরকম শান্তি পাব ভেবেছিলাম, তার ধারেকাছেও পাচ্ছি না। কেমন যেন মনে খচখচ করছে, উনার কথাটা মনের মধ্যে দাগ কেটেছে। নাহ, এইসব চিন্তা মাথায় ঘুরলে বডি রিলাক্স হওয়ার চেয়ে আরও টেন্সড-ই হবে। তাহলে আর লাভটা কি হইল? চার নম্বর টান দিয়েই তাই বিড়িটা ফেলে পা দিয়ে আগুন নিভিয়ে দিলাম।

“তেরা দিল পে ইতনা গোস্বা কিউ হ্যাঁয়?” উর্দুতে গোস্বা মানে হল রাগ, কিন্তু পীর বাবা তুই তুই করে কার মনে রাগ জমে থাকার কথা বলছেন?

আকাশ দিয়ে বিদ্যুৎ খেলে গেল একটা। উনি আমাকে বলছেন না তো? আমি আড়চোখে সেদিকে দৃষ্টি ফিরালাম। হ্যাঁ, তিনি আমাকেই বলছেন। এখন আর বসে নাই তিনি, লাঠিতে ভর দিয়ে আমার দিকে মুখ ফিরে আছেন, আধো অন্ধকারে এটা পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে। আমি কী করলাম উনার সাথে যে উনি এই প্রশ্ন করছেন? আচ্ছা, উনি তার বসে থাকা জায়গা থেকেও কী কিছুটা সরে আসছেন না? তাই তো মনে হচ্ছে, কিন্তু ছড়ি হাতে তিনি এরকম নিঃশব্দে দুই-তিন কদম আগালেন-ই বা কীভাবে? বিদ্যুৎ খেলে যাওয়ার পর বাজ পড়েনি এখন পর্যন্ত, তাও মনে হচ্ছে আমি যেন অনন্তকাল ধরে এভাবে আটকে আছি।

“কি, উত্তর দিবা না বেটা?”  বলার সাথে সাথে বাজ পড়ার আওয়াজ পাওয়া গেল। পীর বাবা আরও এক পা এগিয়ে এসেছেন আমার দিকে। এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নাই যে আমার চরম অস্বস্তি আর ভয় লাগছে। গলাটাও যেন কাঠ হয়ে আছে শুকিয়ে, তাই একবার ঢোক গিললাম।

“নাহ চাচা, গোস্বার কী আছে? গোস্বা কেন থাকবে…” এই কথাগুলো বলে নিজের অজান্তেই এক কদম পিছিয়ে গেলাম।

পীর বাবা আর আগাচ্ছেন না, কিন্তু এই সদ্য সন্ধ্যার অন্ধকারের মধ্যে তিনি যে আমার চোখে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, তা অনুভব করছি। উনার আতরের গন্ধ সোজা আমার নাকে এসে লাগছে। দরগা থেকে সিজদায় যাওয়ার আহবান শুনা যাচ্ছে।

“যত কিছুই হইয়া যাক, হিম্মত হারাইবা না বাবা। দিল গোস্বা দিয়া ভইরা রাখলে হিম্মতরে জায়গা দেওন পারবা না। খারাপ দিনে হিম্মতরে বুকে ঠাই দেওয়াই কিন্তুক আসল জিহাদ। এই ফিতাটা সাথে রাখ বাবা, যেদিন দিলে হিম্মত পাইবা ওইদিন এই ফিতার কাজ শেষ হইব, এর আগে ভুলেও ফেলবা না এটা।” কথা বলতে বলতে কেউ কিছু হাতে ধরিয়ে দিলে মানুষ নিজের অজান্তে সেইটা নিয়ে ফেলে শুনেছিলাম, আজকে প্রমাণ পেলাম। আবার বিদ্যুৎ চমকাল, সেই আলোতে পীর বাবার চেহারা দেখা গেল এক ঝলকের জন্য। উনার চোখের মণিটা আর সবার মত না। মনি টা অস্বাভাবিক রকম বড়, যেন পুরো চোখটাই কালো মণি দিয়ে ভরা।  বিদ্যুৎ চমকালে এক ঝলকের বেশী দেখার সময় পাওয়া যায় না, সেইটার জন্যও আজকের মত কৃতজ্ঞ বোধ করিনি কখনো। পীর বাবা ছড়ি দিয়ে খট খট আওয়াজ করে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কাঁধে স্পর্শ করলেন আমার।

চোখ খুলার পর অন্ধকার দেখে ঘাবড়ে গেলাম। ওয়েট, আমি এখানে আসলাম কী করে?

 

আমি মনে হয় সিলেট থেকে ঢাকাগামী কোন এক নন-এসি বাসে বসে আছি। আরও বিস্তারিত বললে, আমি সেই বাসটার সবচেয়ে পিছনের সারি থেকে তিন সারি সামনে হাতের ডানদিকে যে সারিটা পড়ে, তার একটা সিটে বসে আছি। আমার পাশে জানলার দিকের সিটে স্বাধীন মুখ হা করে ঘুমাচ্ছে। বাইরে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নেমেছে যেন, রাস্তার উল্টোদিক থেকে হেডলাইট অন করে চলে যাওয়া এক-দুইটা দূর পাল্লার বাস আর ট্রাকের আলো দেখে বোঝা যাচ্ছে বাইরে কতটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমার ঘোর এখনও কাটেনি। এতক্ষণ যা দেখলাম তার সবই স্বপ্ন ছিল তাহলে? এত বাস্তব মনে হতে পারে কখনো স্বপ্ন? বাইরের অবস্থা দেখে সময় বোঝারও কোন উপায় নেই। আমার ফোন টা বের করলাম সময় দেখার জন্য। কয়েকবার আনলক বাটন চাপার পর বুঝলাম ফোনের ব্যাটারি ডেড। স্বাধীন কে উঠাতে হবে।

“অ্যাই স্বাধীন! স্বাধীন! অ্যাই মামা, উঠ। কথা আছে তোর লগে।” কাঁধ ঝাকায়ে ডাকলাম দুইবার।

লাভ হবে না মনে হয়। স্বাধীনের ঘুম সবসময়ই গাঢ় ছিল। কাশফি কই আছে? পাশের রো-তে তো দেখছি না। নিশ্চয়ই শেষের দিকের টিকিট দেখে একসাথে সিট পাই নাই। এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিক হল আমার টিকিট কাটার কথা কিছুই মনে নাই। বলতেও পারব না আমি কোন বাসে করে যাচ্ছি। এটা নিয়ে প্রেশার দিব না আপাতত নিজেকে, সারাদিনের ক্লান্তির পরে ঘুম দিয়েছি তাই এরকম হতেই পারে। কাশফিকে খুঁজে বের করি আগে।

কাশফি আর আমার সম্পর্কে যে একটু ভাটা পড়েছে সেটা অস্বীকার করার কিছু নাই। কাশফি আমার এলাকার বন্ধু আগে, অ্যাকাডেমিক বন্ধু পরে। যখন মহল্লার আর কাউকে চিনতাম না, তখনও শুধু ও আর আমি দুইজন মিলেই ক্রিকেট খেলেছি। হে হে, দুইজন মিলে ক্রিকেট! ভাবলেই হাসি পায়। কাশফি মনে হয় আদিকাল থেকেই চরম ভদ্র আর অমায়িক একটা ছেলে ছিল। ওর দুইটা জিনিস যেটা প্রথম দেখাতেই সবাই টের পেয়ে যাবে সেটার একটা হল ও চূড়ান্ত লেভেলের ভদ্র। দ্বিতীয়টা হল ও “খেয়েছি-পড়েছি” টাইপ প্রমিত বাংলা ছাড়া কথা বলতে পারে না। ওর মত ছেলের জন্যই শ্বশুরমহলে আপনার বাজার-দর তলানির দিকে থাকবে। সে যাই হোক, কাশফির সাথে ক্রিকেট খেলায় ব্যাটিং করার সুযোগ আমিই বেশী পেতাম সেটা বলাই বাহুল্য। ও কে রান আউট হয়েছে বললে সঙ্গেসঙ্গে মেনে নিত, আর আমি গলাবাজি করে নিজের আউট স্বীকার না করতে চাইলে সেইটা নিয়েও সে ঝামেলায় জড়াত না। মাগরিব হলে বাসায় ব্যাট-বল রেখে আমরা একসাথে নামাজ পড়তে যেতাম। ও যে শুধু আগ্রহের সাথে ধর্ম পালন করত তা না, ধর্ম নিয়ে ওই বয়সেই ওর নিজে থেকে জানার যে আগ্রহ তা আমাকে বেশ মুগ্ধ করত। আমার মনে ধর্মের বিভিন্ন বিষয়ে যেসব প্রশ্ন জাগত সেগুলো নিয়ে আমি ওর কাছে যেতাম, ও প্রচন্ড আগ্রহের সাথে আলাপ করত সেসব নিয়ে। এসব নিয়ে কথা বলার সময় যেন ওর ব্যক্তিত্বই সম্পূর্ণ বদলে যেত, যেন ঠিকরে বের হয়ে আসত কনফিডেন্স। কতবার যে মসজিদের গলির মাথায় বরই গাছটার তলার বেঞ্চে বসে আমরা এরকম গল্প করেছি তা হিসাবের বাইরে। ইমাম সাহেব, মসজিদের কেয়ারটেকার দিনের বেলা আমাদের যেকোন একজন কে রাস্তায় দেখলেই জিজ্ঞেস করত তোমার আরেক বন্ধু কেমন আছে।

এটা খুবই আশ্চর্যজনক যে মানুষ যাদেরকে জীবনের একটা পর্যায়ে সবচেয়ে সমীহ করে, তাদের প্রতিই জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কারণে অরুচি হওয়া শুরু করে দেয়। আর সেই বিতৃষ্ণা বা অরুচি যদি একপাক্ষিক হয়, এরচেয়ে কষ্টকর বুঝি আর কিছু হতে পারে না।

আমি কখনোই খুব আশাবাদী মানুষ ছিলাম না, জীবনের প্রত্যেকটা বিষয় আমি খুব সন্দেহের চোখে দেখতাম। বড় হওয়ার সাথে সাথে এই সন্দেহটার রেঞ্জও ক্রমেই বাড়ছিল। জীবনের কিছু বাজে অভিজ্ঞতার দরুন আমি যখন নিজের জীবনের অর্থ নিয়ে দোটানায়, সেই সময় কাশফির যে আত্মবিশ্বাস আগে আমাকে আকৃষ্ট করত সেটাই অসহনীয় লাগা শুরু করে আমার। ধীরে ধীরে আমি অনুভব করি আমার জীবনের সমস্যাগুলো নিয়ে আর আগের মত কাশফির সাথে আলাপ করে সমাধান পাওয়া সম্ভব হবে না। এরপর থেকেই আমি প্রসঙ্গক্রমে ধর্ম বিষয়ক কোন কথা উঠলেই ওকে ওর বিশ্বাসের জায়গাগুলো নিয়ে অপমান করা শুরু করি। যে ছেলের সাথে ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলা নিয়ে ঝামেলা লাগাতে পারি নাই, তার সাথে বড় হয়েও যে ঝগড়া আমার একমুখী ভাবেই চালিয়ে যেতে হবে সেটা আমি জানতাম। কিন্তু সব মানুষেরই ধৈর্যের বাঁধ থাকে। কাশফি আমার সাথে কখনোই ঝগড়া করে নি, কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমাদের সম্পর্কের দেয়ালে যে ফাটল ধরেছে তা আমি টের পাই।

 

আমি কাশফিকে খোঁজার জন্য সিট থেকে উঠব ভাবছি ঠিক তখনই বাসটা দুইবার ঝাঁকি দিয়ে থেমে গেল। আশেপাশে কোন ফিলিং ষ্টেশনও দেখছি না, তাহলে কি গাড়ির কোন সমস্যা হল নাকী? বাসটা এখন সম্ভবত মেইন শহর থেকে কিছুটা বাইরে আছে, কেননা আশেপাশে বাড়িঘর নাই বললেই চলে। আর যা হাতে গোনা দুই-তিনটা বাসা আছে সবই একতলা পুরানো ইটের বাড়ি। কোন বাসাতেই আলোর কোন চিহ্ন নাই; বাতি জ্বলতে দেখছি না কোথাও। তাহলে ধরে নেয়া যায় এই এলাকায় কারেন্টও নাই। এরকম জনশূন্য একটা জায়গায় বাস পার্ক করার কোন যুক্তি দেখছি না, কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হল বাসের আর কেউই এটা নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত না। লোকাল বাস হিসেবে পুরা বাসটা যেন মাত্রাতিরক্ত ঠাণ্ডা। আমি সিটে দাঁড়িয়ে একবার সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করব কিনা ভাবতে ভাবতেই পিছন থেকে কাশফির গলার ডাক শুনলাম “অ্যাই নিবিড়।”

এখন অন্ধকারে আগের থেকে চোখ বেশ সয়ে গেছে, তাই কাশফিকে দূর থেকে দেখে চিনতে খুব বেশি সময় লাগল না। বাসের সবচেয়ে বাম কোণায় যে সিট সেটাতে বসে আছে সে, মুখটা জানলার দিকে ফেরানো। পিছনের পুরো সারিটাই ফাঁকা, এরপরও সে সবচেয়ে চিপার সিটটা কেন নিল কে জানে। আমি গিয়ে কাশফি থেকে এক সিট ফাঁকা দিয়ে বসলাম। ও এখনো বাইরের দিকেই ফিরে রয়েছে, নিজে থেকে আর কিছু জিজ্ঞেস ও করছে না। আমার যে বাসে উঠা নিয়ে কিছু মনে পড়ছে না এইটা নিয়ে এমনিতেই বিপাকে আছি, তাই মনে মনে চাচ্ছিলাম ও যেন কথা বলার সুযোগ করে দিক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে আমাকেই শুরু করতে হবে।

“কীরে, একা একা এরকম চিপায় বসে আসোস কেন, ছ্যাকা খাইছিস নাকি?” কাশফি নিশ্চুপ, ওর দৃষ্টি এখনও বাইরে।

 

“আরে বল না, কার কথা চিন্তা করতেসিস এই নিরালায় বসে, হু হু? রাবা খানের কথা নাকি মাম্মা?” এরকম বিরক্তিকর প্রশ্নের বানে জর্জরিত করে ছাড়ব ওকে মুখ না খোলা পর্যন্ত, মনে মনে শপথ নিলাম।

“তোর কথা।” গলায় বিন্দুমাত্র কৌতুকের ছিটেফোঁটা নাই কাশফির। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবলাম এটার উত্তর কীভাবে দিব।

“কী ভাবলি?” সোজাসাপ্টা প্রশ্নটা করার লোভ থামাতে পারলাম না আর।

“মনে আছে, ছোট বেলায় তুই আর আমি বাসার নিচে ক্রিকেট খেলতাম যে?” কাশফির গলা যেন দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে। আকাশ চিড়ে বিদ্যুৎ চমকে উঠল।

“আমরা একদিন কথা উঠিয়েছিলাম মানুষ মারা যাওয়ার পর কী হয়, তুই বলেছিলি সৃষ্টিকর্তা থেকে থাকলে তিনি কিছু মানুষ কে অনন্তকাল ধরে শাস্তি দিবেন সেটা তুই কোনভাবেই বিশ্বাস করিস না।”

বাজের আওয়াজ শোনার জন্য অপেক্ষাটাও অনন্তকালের জন্য করছি বলে মনে হচ্ছে আমার, কিন্তু বাজের আওয়াজ পাচ্ছি না কোন।

“আমার সেদিন তোর কথা শুনে প্রথমে খুব অবাক লেগেছিল, তুই এমন জিনিসকে সন্দেহ করছিস যেটাকে সন্দেহ করার কোন কারণ আমি কখনোই দেখি নাই। আমি শিওর ছিলাম তুইও মজা নিচ্ছিস। কিন্তু তোর মুখে কৌতুক করার ছিটেফোঁটাও যখন পেলাম না, আমার রাগের দমকে গা হাত-পা কেঁপে কেঁপে উঠছিল।” আমি আর কাশফির দিকে তাকাতে পারছি না, তীব্র অস্বস্তিতে আমার কপাল ঘামে ভিজে গেছে। এখনও বাজের আওয়াজ শুনতে পাই নি। আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে কান পেতে আছি, কিন্তু কী শোনার জন্য তা জানি না।

“সেদিন প্রথমে তোকে আমার তীব্র ভাবে অপমান করার ইচ্ছা জেগেছিল। আমি কিন্তু ততদিনে জানতাম তুই ইচ্ছা করে প্রায়ই আমার সাথে ঝামেলা বাঁধাতে চেষ্টা করতি। সেগুলা দিয়ে খুব একটা লাভ হত না অবশ্য, তোর অভিনয় খুবই কাঁচা। কিন্তু ওইদিন ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল। তুই যেন ওইদিন বরফের মত ঠান্ডা ছিলি, তোর কথাবার্তায় এত আত্মবিশ্বাস আমি কখনোই আগে দেখি নাই। তোর কথা শুনে মনে হচ্ছিল যেন তুই উত্তর নিয়ে নিশ্চিত হয়েই আসছিস, এখন তুই যাস্ট চাচ্ছিস আমি তোর উত্তর মেনে নেই।”

ড্রাইভার কখন যেন সিটে এসে বসে পড়েছে টের পাইনি, ঝাঁকুনি দিয়ে বাস চালু হয়ে গেল।

“আমার শরীর রাগে রি রি করে জ্বলে উঠছিল, এতদিন তোর সাথে ধর্ম নিয়ে এত কথা হওয়ার পর তুই এরকম ধারনা নিয়ে বসে আছিস এটা আমি ভাবতেও পারি নাই। কিন্তু আমি তোকে বুঝতেও দিতে চাচ্ছিলাম না আমি কতটা রেগে আছি। নাহলে আমি হেরে যাব।”

কাশফি হঠাৎ চুপ হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য, কেউ কোন কথা বলছি না, একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়েও নাই।

“তোর কি মনে আছে এরপর তুই কী বলেছিলি?” আমি স্রেফ ডানে বাঁয়ে মাথা নাড়লাম। পুরো বাস একটা কড়া গন্ধে ভরে গেছে, গন্ধটা কোথায় যেন আগেও পেয়েছি।

“তোর দাদীর কাছে থাকার কারণে তুই মাঝেমাঝেই মনের অজান্তে দুই-একটা উর্দু বাক্য বলে ফেলিস। ওইদিনও তুই এই কাজ করেছিলি, এখন কী মনে পড়েছে তোর?”

আমি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠলাম, আমার মনে পড়তে বাকি নেই। প্যান্টের পকেটে হাত দিলাম, মনে মনে চাচ্ছিলাম কিছু যেন হাতে না পড়ে। এসব কী হচ্ছে আমার সাথে? কেন হচ্ছে?

“তুই আমার চোখে চোখ রেখে বলেছিলি- “তেরা দিল পে ইতনা গোস্বা কিউ হ্যাঁয়?”

গন্ধটা এখন একদম আমার পাশে চলে এসেছে, এই গন্ধ মাজারের ওই পীরের। আমি চোখ খুলব না, কোনভাবেই না। হে খোদা, আমাকে রক্ষা কর।

কাশফি এখনও বলে যাচ্ছে, “নিবিড়, তুই সবসময় ভেবে আসছিস আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট করার পিছনে তুই একাই দায়ী। তুই ভুল ভাবিস, সেইদিনের পর থেকে আমিও তোর সাথে দূরত্ব তৈরি করেছি। আমি সেইদিন ভয় পেয়েছিলাম, প্রচন্ড ভয়। তুই আমার বিশ্বাসকে প্রশ্ন করেছিলি আর আমার কাছে তোকে বুঝানোর মতো ক্ষমতা ছিল না। আমি তাই আর তোকে কখনো তোর বিশ্বাসের জায়গা নিয়ে প্রশ্ন করিনি।

তোকে তোর বিশ্বাস নিয়ে থাকতে দিয়েছি আর আমার নিজের বিশ্বাসকে আমি রক্ষা করেছি। কিন্তু তুই এখনো নিজেকে আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট করার জন্য একা দায়ী ভাবিস, আমি সেটা হতে দিতে পারি না। আমার মৃত্যুর আগে আমি তোকে এটাই বলতে চেয়েছিলাম।”

একটা হাত এসে আমার কাঁধের উপর পড়ল, আমি জানি এটা কাশফির হাত না। ওর হাতের ছোঁয়া আমি চিনি। আর ওর হাতে আংটিও নাই।

বাসটা যেন বিশেষ কোন একজনের আবির্ভাবের অপেক্ষায় ছিল। তার উপস্থিতিতে পুরা বাস যেন হঠাৎ করে অনেক জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সামনে যাত্রীদের থেকে যিকির করার মত তালে তালে শ্বাস-প্রশ্বাস এর আওয়াজ আসছে। “আল্লাহু আল্লাহু” আওয়াজ ও পাওয়া যাচ্ছে, কখনো জোরে কখনো আস্তে। ঠিক আমার সামনের সিটের যাত্রীরা মনে হয় দাঁড়িয়ে যিকির করছে। সীট টা যেন নিজের জীবন পেয়েছে, ছন্দে ছন্দে কম্পন আমি চোখ বন্ধ অবস্থায়ও টের পাচ্ছি।

“নিবিড়, তুই পকেটে হাত দিয়ে কি সুতাটা পেয়েছিলি?”

আমার মুখ থেকে স্রেফ জান্তব একটা আওয়াজ বের হল।

“তুই হাতে সুতা টা ধরে সোজা দরজার দিকে এগিয়ে যাবি। ড্রাইভারের সিটের সামনে আদেশ করবি জোর গলায় দরজা খুলে দিতে। সুতাটা ভুলেও হাত থেকে ফেলবি না, আর পিছনে তাকাবি না ভুলেও। স্বাধীনকে ও ডাকতে যাস না, বুঝতেই পারছিস ও আর উঠবে না। আশেপাশের সবাই তোকে ডাকবে, তুই কাউকে বাঁচাতে পারবি না। তুই তোর বিশ্বাসে ওইদিন এর মত অটল থাকিস।”

কাশফির কন্ঠ এখন একদম কানের কাছে, আতরের গন্ধ আর আলাদা করা যাচ্ছে না অন্য কিছু থেকে।

“বিশ্বাসীরা হিম্মত হারায় না কখনো।” এই কন্ঠটা আর কাশফির না।

পকেটে হাত দিয়ে সুতাটা মুঠি করে আমি সটান দাঁড়িয়ে পড়লাম। এক মুহুর্তে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। প্রথম কদম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই আর্তনাদ করে উঠল সব যাত্রী।

“আমারে বাঁচাও, আমার ছাওটা বাসায় একা পড়ে আছে।” বামপাশ থেকে এক মহিলার আর্তনাদ ভেসে আসলো।

আমি বিড়বিড় করে মহিলার আর তার ছেলের জন্য জন্য দোয়া করলাম। মহিলার কন্ঠ কি আর শোনা যাচ্ছে না? তাই তো।

প্রতিটা আর্তনাদ করা কন্ঠের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি বিড়বিড় করে কথা বলতে বলতে আগাচ্ছি। বাসে আর্তনাদ এর প্রকম্পন ক্রমেই কমে আসছে।

“নিবিড় দোস্ত, আমাকে রেখে যাইস না। মাকে বলা হয় নাই, আমি তিন সেকশন মিলায়ে হায়েস্ট মার্ক পাইসি যে। পরশু মা এর জন্মদিনে বলতাম। প্লিজ নিবিড়, প্লিজ।”

নিবিড়ের পা যেন থেমে যেতে চাচ্ছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে থামিয়ে ও বিড়বিড় করে বলল, “আন্টি তোকে নিয়ে সবসময় প্রাউড ছিল স্বাধীন। আমি থাকতে আন্টি কখনো একা থাকবে না। আর সামিয়া এই বয়সেই তোর চেয়েও বেশী সমঝদার হইসে। ও তোর চেয়ে ভাল স্টুডেন্ট হবে, টেনশন নিস না মামা।“

আমি জানি স্বাধীন হেসে দিয়েছে। হি অলওয়েজ ফাউণ্ড মাই সারকাজম টু বি ফানি।

ড্রাইভারের সামনে এসে আমি বললাম, “গাড়ি থামান, আমি নামব।”

“নামার অনুমতি নাই।”

“আপনি বাস থামান, আমার অনুমতি আছে।”

“আমি থামাতে পারব না, আজরাইল আমাকে……”

“দরজা খুলে দাও”, আমার ঠিক পিছন থেকে পীরের গমগমে কন্ঠ শুনা গেল।

গাড়ির গতি থেমে আসছে, ধীরে ধীরে। দরজা খুলে গেল সশব্দে। আমি নামার জন্য পা বাড়াতে গিয়ে থেমে গেলাম।

“আমি কাশফিকে আরেকবার দেখতে চাই। ও কে কিছু বলার আছে।”

“দেখতে পারবে না, ও শুনছে।”

 

“কাশফি?”

“বল নিবিড়।”

“আমি জানি আমরা শাহ্‌ পরানে যাই নাই। আমি যে তোকে তবারক না নিয়েই ফেরত আসতে বাধ্য করসি, তুই কী আমার উপর রাগ করছিস?”

“না রে, আমি বুঝেছি তুই ভয়ের চোটে করেছিলি ওইটা। তুই ভয়ের চোটে সবাই কে নিজের থেকে দূরে সরায় রাখিস, কিন্তু তোর মনটা ভর্তি অনেক মায়া। তোর কাছের সবাই আমরা বুঝি তোকে।”

“কাশফি?”

“হ্যাঁ দোস্ত।”

“আমি আর ভয় পাব না।”

“আমি সেইটাও জানি।”

বাস থেকে নামার আগেই নিবিড় হাত থেকে সুতাটা ফেলে দিল।

 পাঠকদের জন্য সুখবর!

অনলাইনে ডিজিটাল বাংলা  কমিক্স পড়ুন
ফ্রি-তে!

সদস্য রেজিস্ট্রেশন
close-link