আমানের শরীর আর চলছিল না, মনে হচ্ছিল অন্ততকাল ধরে এই গুহার মাঝে বসে তিনি পাথর ভাঙছেন। কিন্তু থামার কোন উপায় নেই, ক্লান্তির কারণে এর আগে যারাই এক মুহূর্তের জন্যেও বিশ্রাম নেয়ার কথা ভেবেছে, তারা আর কোন দিন ফেরত আসেনি।

এজন্যই যখন আমান সাহেবের ডাক পড়ল কন্ট্রোল রুমে, তিনি হতবাক হয়ে গেলেন। দেরি না করে হাতুড়ি হাতে কন্ট্রোল রুমের দিকে হাঁটা দিলেন।

-“কোন কাজে গত এক মাসে ফাঁকি দিয়েছি বলে মনে হয় না। প্রতিদিন সকালে উঠে বাকিদের সাথে হল ঘরে স্পেস জেড বন্দনায় অংশ নিয়েছি এবং মঙ্গল গ্রহের উন্নতির জন্য প্রার্থনা করেছি। এরপর কাজে গিয়েছি। সারাদিন মনোযোগ দিয়ে গুহায় কাজ করেছি। প্রয়োজন ছাড়া কারো সাথে একটি কথাও বলিনি। তাহলে কন্ট্রোল রুমে আমার ডাক পড়লো কেন?”, হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলেন আমান সাহেব।

কন্ট্রোল রুমে গিয়ে নিবন্ধন ডেস্কের ট্যাবলেটে আঙ্গুলের ছাপ দিলেন আমান সাহেব। ট্যাবলেটের পর্দায় ভেসে উঠলো যে তাকে চার নম্বর রুমে যেতে হবে। তিনি চার নম্বর রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। দরজার সামনের ক্যামেরা তার দিকে ঘুরে তাকে স্ক্যান করলো। দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে গেল। আমান সাহেব ভেতরে ঢুকে দেখলেন একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা তার সামনে বসে আছেন।

মহিলার বয়স ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ, গায়ের রঙ কালো, মাথার কোঁকড়ানো চুল শক্ত করে ঝুঁটি বাঁধা, চোখে চারকোণা চিকন ফ্রেমের চশমা, পরনে স্যুট-প্যান্ট। পুরুষের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, গায়ের রঙ ধবধবে ফর্সা, সম্ভবত আইরিশ, মাথার চুল লাল, চোখ নীলাভ, পুরু গোঁফ, পরনে স্যুট-প্যান্ট।

-“বসুন, আমান সাহেব।”, পুরুষজন বললেন।

আমান সাহেব দুজনের সামনে রাখা চেয়ারে বসলেন।

-“আমার নাম কেভিন ও’ব্রায়ান, আমি স্পেস জেড কোরের কমপ্লায়েন্স অফিসার, ও আমার সহকর্মী এলিসিয়া কিং, স্পেস জেড কোরের এসিস্ট্যান্ট কমপ্লায়েন্স অফিসার।”

এলিসিয়া কিং তীক্ষ্ণদৃষ্টি দিয়ে আমান সাহেবকে লক্ষ্য করলেন। ভদ্রলোকের চুল-দাড়ি প্রায় সবই পেকে গেছে, হাতে-মুখে কালি, পরনে সংশোধন কেন্দ্রের কমলা পোশাক। উনাকে দেখে মনে হয় উনার বয়স ষাট-পঁয়ষট্টি বছরের কাছাকাছি, তবে সংশোধন কেন্দ্রে এসে সকলের চেহারায় বয়সের ছাপ রাতারাতি এসে পড়ে।

এলিসিয়া বললেন, “আজ আমরা এই সংশোধন কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের মাঝে দৈবক্রমে বাছাইকৃত শিক্ষার্থীদের সংবেদনশীলতা পরীক্ষা করতে এসেছি।”

আমান হকচকিয়ে গেলেন, “কিন্তু সংবেদনশীলতার পরীক্ষা তো আরো তিন মাস পরে হবার কথা।”

“যারা প্রকৃতপক্ষেই সংবেদনশীল, তাদের জন্য পরীক্ষা তো কোন সমস্যাই হবার কথা নয়। কোন পূর্ব ঘোষণা ছাড়া এই পরীক্ষা নেয়ার একমাত্র কারণ হল, আনফিট শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করা। আপনি কী আনফিটদের দলে, আমান সাহেব?”, মুখে ক্রুর হাসি দিয়ে বললেন ও’ব্রায়ান।

“না, না, আমি কেন আনফিট হতে যাব?”

এলিসিয়াঃ “আমরা তাহলে শুরু করতে পারি?”

-“জ্বী, অবশ্যই।”

এলিসিয়া উঠে দাঁড়িয়ে আমানের আঙুলে একটা সেন্সর লাগিয়ে দিল।

-“আমরা আপনাকে কিছু লেখা এবং ক্লিপ দেখাব, আপনাকে বলতে হবে যে সেখানে কী কী সমস্যা রয়েছে।”

-“বুঝতে পেরেছি।”

প্রথমে স্ক্রিনে আসলো একটা সংবাদ শিরোনামঃ “জেড কয়েন মার্কেট ধ্বসের পেছনে পিটার হুকের ইন্ধন”

আমান বলে উঠলঃ “এটি পিটার হুকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার”

ও’ব্রায়ানঃ “অসাধারণ।”

এরপরে পর্দায় ভেসে উঠলো একটি সিনেমার ক্লিপ। সিনেমাটি তিনি আগেও দেখেছেন, সিনেমাটি বানিয়েছিল তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইসহাক। দৃশ্যটি এরকমঃ

একজন স্পেস জেড কমপ্লায়েন্স অফিসারের পা ধরে এক পাগলপ্রায় মহিলা অনুনয় বিনয় করছেন, “আমার ছেলে আনফিট নয়, সে সংবেদনশীল। আমার কথা বিশ্বাস করুন।”

-“আহ, ছাড়ুন, পা ছাড়ুন। আমরা প্রমাণ ছাড়া কোন কাজ করি না।”

-“বিশ্বাস করেন স্যার! আমার ছেলে ওখানে বাঁচবে না!”

-“আনফিটদের বাঁচার প্রয়োজন নেই।”

-“এমন কথা বলবেন না, স্যার! ও ছাড়া আমার কেউ নেই!”

-“ছেলেকে বাঁচাতে আপনি কী কী করতে পারেন?”

-“আপনি যা বলবেন, আমি তাই করবো, স্যার।”

-“আমার ওয়ালেটে দশ মিলিয়ন জেড কয়েন ট্র্যান্সফার করুন, আমি দেখছি কী করা যায়।”

 

আমান সাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন, “স্যার, স্যার! আমি জানি এখানে কী সমস্যা আছে!”

ও’ব্রায়ান ভিডিও থামিয়ে বললেন, “কী সমস্যা আছে?”

-“এখানে স্পেস জেড কোরের অবমাননা করা হয়েছে, স্যার!”

এলিসিয়া বললঃ “বাহ! আপনি তো আগের থেকে অনেক সংবেদনশীল হয়ে উঠেছেন!”

-“ধন্যবাদ, ধন্যবাদ!”

এলিসিয়াঃ “আপনার শেষ পরীক্ষা, এবার আপনাকে আমরা দেখাব একটি ছবি।”

স্ক্রিনে একটা ছবি ভেসে উঠলো,

ইলেক্ট্রনিক বোর্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে একজন তরুণী, বোর্ডে লেখাঃ

“রকেট নয়, রুটি চাই!”

আমান বলল, “এই মেয়েটি মঙ্গল গ্রহের বিরুদ্ধে! গ্রহের উন্নতির জন্য প্রয়োজন আধুনিক রকেট! সে গ্রহের উন্নতি চায় না!”

দুজনে এক সঙ্গে বলে উঠল, “অসাধারণ!”

এরপর এলিসিয়া তার সামনে রাখা ল্যাপটপের একটা বাটনে চাপ দিল, সাথে সাথে দুজন স্পেস জেড সিকিউরিটি গার্ড রুমে ঢুকে আমানকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগল।

-“কিন্তু স্যার, আমি তো সবগুলো প্রশ্নের ঠিক জবাব দিয়েছি, আমি এখন সংবেদনশীল।”

-“না, তুমি সংবেদনশীল নও। তুমি মন থেকে বিশ্বাস করে এই জবাব দাওনি। তুমি মিথ্যা বলেছ। তোমার আরো সংশোধিত হতে হবে।”

-“না, স্যার, বিশ্বাস করুন, আমি সত্যি বলেছি! স্যার, স্যার!!!”

 

আমান সাহেবকে ধরে নিয়ে এক নিকষ কালো অন্ধকার ঘরে ছুঁড়ে ফেলা হল।

আমান সাহেব গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছেন, “স্যার, আমি আনফিট নই! আমি সংবেদনশীল! স্যার! স্যার!”

অন্ধকার থেকে কে যেন বলে উঠলো, “উফ, এত চেঁচাবেন না তো! আমি গত বিশ বছর ধরে এই সেলে আছি, কেউ আপনার চিৎকার শুনতে আসবে না।”

-“কিন্তু আমি আনফিট নই!”

-“আপনি অবশ্যই আনফিট, নাহলে আপনাকে এখানে পাঠাত না।”, ম্যাচের কাঠি জ্বালাতে জ্বালাতে কণ্ঠস্বর বলে উঠলো।

ম্যাচের নিভুনিভু আলো আমানের মুখের কাছে নিয়ে আসলেন আগন্তুক, আমানকে এক পলক দেখে হা হা করে হাসতে শুরু করলেন।

আমান চমকে গেল, “আপনি হাসছেন কেন?”

-“নিয়তির পরিহাস দেখে হাসছি।”

-“মানে???”

-“আমার দিকে ভালো করে তাকাও, চিনতে পারছো?”

আমান ভালো করে রক্তাক্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে মানুষটাকে চেনার চেষ্টা করলেন, লোকটার একটা দাঁতও অবশিষ্ট নেই, নাক ভাঙ্গা, গালে কাটা দাগ, মাথার চুল জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে। কিন্তু তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে আমান চমকে উঠলেন। এই অগ্নিদৃষ্টি তিনি গত পঁচিশ বছরে দেখেননি।

-“ইসহাক?!”

-“যাক, বন্ধুকে চিনতে পেরেছিস তাহলে। আমাকে যেদিন আনফিট হওয়ার দায়ে ধরিয়ে দিয়েছিলি, তখন কী ভেবেছিলি যে একদিন এমন রিইউনিয়ন হবে?”, বলেই হা হা করে হাসতে শুরু করলেন ইসহাক।

আমান বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে ইসহাকের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

 পাঠকদের জন্য সুখবর!

অনলাইনে ডিজিটাল বাংলা  কমিক্স পড়ুন
ফ্রি-তে!

সদস্য রেজিস্ট্রেশন
close-link